
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২ | প্রিন্ট | ১৬৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বিশ্বব্যাংক যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোন সংস্থা নয়, তাই পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের কাছে কোন তথ্য নেই। একইভাবে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা, ইসলামি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কী পরিমাণের অর্থ সহায়তা দিয়েছে অথবা দিয়েছে কিনা সেটিও জানা নেই। এমন বক্তব্য দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ ও তা উদ্বোধনের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাংক অভিনন্দনও জানিয়েছে বাংলাদেশ তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এমন স্ববিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যেও দাবি উঠেছে ঐ ষড়যন্ত্রের হোতাদের মুখোশ উম্মোচনের। তাহলেই বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারণায় লিপ্তদেরকেও বাঙালিরা নতুন করে চিনতে সক্ষম হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধি শক্তি এবং নব্য রাজাকার গোষ্ঠি আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বসে অহর্নিশ মিথ্যাচার করছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ বিপন্ন করতে। পদ্মা সেতু নিয়েও তারাই নেপথ্যে অর্থ ঢেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ডিজাইন চূড়ান্ত হবার পর বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাথে ঋণ চুক্তি করেছিল ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে। এরপরই নির্মাণ কাজের তদারকির জন্যে বাংলাদেশের কন্সালট্যান্ট নিয়োগে দুর্নীতির অজুহাত দাঁড় করিয়ে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। একেরপর এক অন্য সংস্থাগুলোও ঋণ প্রদানে অনীহা প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতির জন্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই তদানিন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের হস্তক্ষেপকে দায়ী করে আসছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদে স্থায়ীভাবে থাকতে না পারায় ক্ষুব্ধ ড. মুহম্মদ ইউনূস হিলারিকে দিয়ে পদ্মা সেতুতে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক-কে সরে দাড়াতে বাধ্য করেছেন-এমন অভিযোগ শেখ হাসিনা ছাড়াও তার মন্ত্রী পরিষদের অনেক সদস্য করে আসছেন। যদিও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস তা অস্বীকার করেছেন।
বিশ্বব্যাংকের এহেন সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেটি সম্পন্ন করেছেন এবং সেতুর উদ্বোধনী ভাষণের সময়েও ড. ইউনূসের নামোল্লেখ না করলেও একই ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। জাতীয়ভাবেও দাবি উঠেছে দুর্নীতির মিথ্যা অপবাদ এবং ঋণ প্রদান থেকে সরে দাঁড়াতে বিশ্বব্যাংক-কে প্রভাব খাটানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত এবং যথাযথ শাস্তি প্রদানের। সে আলোকেই বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্য চাওয়া হয়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে প্রসঙ্গটি রেফার করে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে। সেখান থেকে দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন,‘ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা অথবা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ফার্ন্ডি ডিসিশন সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনই তথ্য নেই। কারণ তারা কোনটিই ইউএস সরকারের অধীনস্থ নয়। তাই, এ সম্পর্কে জানতে ঐসব সংস্থার সাথে যোগাযোগের জন্যে রেফার করছি ।
উল্লেখ্য যে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রারম্ভে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস এবং বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘জনসাধারণ এবং পণ্য সামগ্রির মধ্যে সম্পর্ক চমৎকার করার ক্ষেত্রে টেকসই পরিবহন পরিকাঠামো তৈরী করা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘পদ্মা সেতু অভ্যন্তরীণ নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরী করবে, বাণিজ্যের গতি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানও উন্নত করবে’-উল্লেখ করা হয় অভিনন্দন বার্তায়। আরো বলা হয়েছে, সেতুটি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে যোগাযোগের উন্নয়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের আরেকটি উদাহরণ।
নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু যথাযথভাবে নির্মিত হওয়ায় বিশ্বব্যাংক অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে। অর্থাৎ, ঋণ চুক্তি থেকে সরে দাড়ানোর কথাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে এখন তারা বাংলাদেশের এগিয়ে চলার সহযাত্রিতে পরিণত হতে চাচ্ছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক বলে মনে করছেন বাংলাদেশ নিয়ে কর্মরত প্রবাসীরা। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অনুযায়ী যে অন্যায় যুক্তরাষ্ট্র অথবা বিশ্বব্যাংক করেছে তার দায় নিতে হবে। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘দুর্নীতির মিথ্যা গল্প’ বানানোর নেপথ্যে থাকা ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ খুঁজে বের করতে সরকারকে কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। হাই কোর্টের এই নির্দেশকেও সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশপ্রেমিক প্রবাসীরা।
উল্লেখ্য, পাঁচ বছর আগে জারি করা রুলের শুনানির পর মঙ্গলবার (উদ্বোধনের দুদিন পর) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাই কোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। আদালত আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই কমিশন গঠন করতে বলেছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। এর আগে সোমবার এ রুলের শুনানির সময় আদালত ‘ষড়যন্ত্র না থাকলে পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ কেন হল’, এমন প্রশ্নও করেছিল।
সেদিন বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “পদ্মা সেতু আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটা আমাদের অহংকার। এ ধরনের জাতীয় স্বার্থ উন্নয়নের বিরুদ্ধে যারা থাকেন, তারা জাতির শত্রু, দেশের শত্রু, তাদের চিহ্নিত করা দরকার। ষড়যন্ত্রকারীরা দেশবিরোধী, এদের খুঁজে বের করতে হবে।”
২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘দুর্নীতির মিথ্যা গল্প’ সংক্রান্ত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেছিল বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাই কোর্ট বেঞ্চ। ওই রুলে ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ খুঁজে বের করতে ১৯৫৬ সালের ‘ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’র তৃতীয় অনুচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন অনুযায়ী কমিটি বা কমিশন গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে ‘প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের’ কেন বিচারের মুখোমুখি করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। এছাড়া কমিটি বা কমিশন গঠনে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জানিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। পরে ওই কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালির পর এই বিষয়ে গত পাঁচ বছরে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে রুল জারি করা হাই কোর্টের ওই বেঞ্চের পরিবর্তন হওয়ার পর এই সময়ে মামলাটি আর কোনো বেঞ্চে উঠেনি। পাঁচ বছর আগে স্বতঃপ্রণোদিত যেসব প্রতিবেদন আমলে নিয়ে এই রুল আদালত দিয়েছিল, তার মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল-‘ইউনূসের বিচার দাবি’।
পদ্মায় বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আটকাতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের ‘ষড়যন্ত্র’ ছিল বলে সব সময় বলে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তবে ইউনূস সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। ওই রুল জারির পাঁচ বছর পর গত শনিবার পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। এরপর এ সংক্রান্ত রুল শুনানি চেয়ে হাই কোর্টে গত রোববার বিষয়টি উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিন উদ্দিন মানিক। পরে সোমবার ও মঙ্গলবার রুলের বিষয়ে শুনানি নিয়ে কমিশন গঠনের আদেশ দিল হাই কোর্ট।
প্রবাসের বিশিষ্টজনেরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ড. ইউনূসের কান কথায় হিলারি ক্লিন্টন যদি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন সেটিও নির্ণিত হওয়া জরুরী। ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ব্যক্তি-সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি জাতির আশা-আকাঙ্খাকে ধুলিস্যাৎ করতে দুর্নীতির মিথ্যা অপবাদ দেয়াটা গুরুতর একটি অপরাধের সামিল। কারণ, হিলারি ক্লিন্টন তখোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। একইভাবে, বিশ্বব্যাংকের আজগুবি অভিযোগে মন্ত্রীত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া ব্যক্তিবর্গকেও এখন পুরস্কৃত করা জরুরী। অন্যথায় দুষ্টলোকেরা আবুল হোসেনকে সুযোগ পেলেই অপবাদ দিয়ে যাবে।
পদ্মা সেতু যেভাবে দৃশ্যমান হয়েছে-একইভাবে ঐ ষড়যন্ত্রের সকল নেপথ্য শক্তির মুখোশ উম্মোচন এখন সময়ের দাবি বলেও অভিমত পোষণ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।



