
বিশেষ সংবাদদাতা | শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | প্রিন্ট | ৭৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বক্তব্য দিচ্ছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ডেনিস ফ্রান্সিস। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে গভীর উদ্বেগের সাথে চলতি সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং মহাসচিবের প্রতিনিধি হিসেবে একজন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলসহ ভারত, রোমানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউনেস্কো এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগের সাথে বিবৃত করলেন যে, আজ বিশ্বের ৪০% মানুষ এমন ভাষায় কথা বলছেন যা তাদের মাতৃভাষা নয়। না বুঝে তারা সে শিক্ষা নিতে বাধ্য হচ্ছেন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। কোন কোন দেশে এমন পরিস্থিতিতে নিপতিত মানুষের সংখ্যা ৯০% এরও বেশী। এতদসত্বেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্কুলে নিজস্ব ভাষা শেখার কার্যক্রমটি আত্মসম্মান পুনরুদ্ধার ও সমালোচনামূলক চিন্তা শক্তির দক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং আন্ত:প্রজন্মীয় শিক্ষা, ভাষা পুনরুজ্জীবনসহ নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণের দরজাও খুলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের আরেকটি প্রত্যাশা হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৪ অর্জনের জন্য একটি স্তম্ভ হিসেবে বহুভাষিক শিক্ষা নীতি এবং অনুশীলনগুলো বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরা।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে টানা অস্টম বারের মত যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপনের এ অনুষ্ঠান হলো বাংলাদেশ, অস্ট্রিয়া, বাহরাইন, বলিভিয়া, রোমানিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী মিশন, জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ইউনেস্কোর যৌথ অংশিদারিত্বে ৪ নম্বর কনফারেন্স রুমে। এবারের স্লোগান “বহু ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞান চর্চার স্তম্ভ”-র উপর আলোচনা করেন সকলে। জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষার পাশাপাশি বাংলা, হিন্দি ও রোমানিয়ান ভাষায় প্রদত্ত বক্তব্য ভাষান্তর করা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় উদ্বোধনী সঙ্গীত “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি” পরিবেশন করেন শ্রীচিন্ময় সেন্টারের শিল্পীরা। জাতিসংঘ চেম্বার মিউজিক সোসাইটি কর্তৃক পরিবেশিত যন্ত্রসংগীত এবং অভিবাসীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীবৃন্দের পরিবেশিত গান অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘের ওয়েব টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। গ্যালারিতে বিভিন্ন দেশের ক’টনীতিক ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিত্বকারি বিশিষ্টজনেরা। বিভিন্ন ভাষার প্রজন্মের উপস্থিতিও ছিল লক্ষনীয়। ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারাও।
প্রধান অতিথি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ডেনিস ফ্রান্সিস বলেন, আসুন আমরা একটি বহু-সাংস্কৃতিক এবং বহুভাষিক বিশ্ব রচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই-যাকে আমাদের বৈচিত্র-গর্ব এবং প্রকৃতপক্ষে শক্তির উৎস হিসাবে ব্যবহার করতে পারি। আমি জোরদিয়ে বলতে চাই যে, মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মধ্যদিয়ে আমরা কেবল মানব সভ্যতার সমৃদ্ধ মোজাইককে স্বীকার করিনা, প্রকৃত অর্থে সম্মান করছি মানুষের বৈচিত্র এবং পরিচয়ের একটি ঐতিহ্যকে। আমরা আমাদের বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য দিক যে বৈচিত্রময় মানব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং সংস্কৃতির জন্য আরো অর্থপূর্ণ উপলব্ধি তা অনুধাবনে সক্ষম হই ভাষার প্রতি মমত্ববোধ লালন করে। তাই এবারের মাতৃভাষা দিবসে সকলের প্রতি আহবান রাখছি, আসুন মানবতার সমৃদ্ধ সভ্যতা এবং ভাষাগত ঐতিহ্য উদযাপনে সকলে সংকল্পবদ্ধ হই।

বক্তব্য দিচ্ছেন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদগণ এবং ভাষা আন্দোলনের পথিকৃত জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। রাষ্ট্রদূত মুহিত বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই জাতির পিতার নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রাম, যার চূড়ান্ত পরিণতি পায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের মাধ্যমে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশির উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পূর্ণ স্বীকৃতি আদায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃতের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত মুহিত। তিনি শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে মাতৃভাষা ভিত্তিক পাঠদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত মুহিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবটি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ মিশনের মিনিস্টার শাহানারা মনিকার সঞ্চালনায় এ আলোচনায় আরো অংশ নেন মহাসচিবের প্রতিনিধি হিসেবে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (জিএসিএম) মোভসেস আবেলিয়ান, বাহরাইনের স্থায়ী প্রতিনিধি জামাল ফারেস আলরোয়াইয়ি, রোমানিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি কর্নেল ফারোতা, বলিভিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি দিয়েগো প্যারি রডরিগুয়েজ, দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ম্যাথিউ জয়িনি, অস্ট্রিয়ার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি স্টিফেন প্রেটারহোপার, ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রুচিরা ক্যাম্বোজ, ইউনেস্কোর নিউইয়র্ক অফিসের পরিচালক ইলিয়ট মিনেচেনবার্গ, নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের আন্তর্জাতিক পরিচালক দিলিপ চৌহান প্রমুখ।
বক্তাগণ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে বাংলাদেশের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকার প্রশংসা করেন। মাতৃভাষার জন্য বিশেষ একটি দিন নির্ধারণে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য তাঁরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষায় শিক্ষা প্রদানকে জ্ঞানার্জন ও মেধা বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে, তাঁরা এর উপর গুরুত্বারোপ করেন।
উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শুরুতেই নিউইয়র্কস্থ শ্রীচিন্সময় সেন্টারের শিল্পীরা ‘বাঙালির গান অবাঙালিরা পরম আনন্দে গাহিছে’ পরিবেশন করেন। উল্লেখ্য, বিশ্বমানবতার কল্যাণে সারাটি জীবন নিয়োজিত রেখেছিলেন চট্টগ্রামের সন্তান শ্রীচিন্ময়। তাকে জাতিসংঘের শান্তির দূত হিসেবেও নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনিই নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকায় স্থাপন করেছেন ‘শ্রীচিন্ময় সেন্টার’। সেখানে শতাধিক দেশের ভিন্ন ভাষার মানুষেরা তাঁর লেখা বাংলা গান শিখেছে এবং সুযোগ পেলেই তা তারা পরিবেশন করেন পরম আনন্দে।



