Advertisement Placeholder

কুমিল্লার শান্তি সুনীতি ফয়জুন্নেসা ও মীরা

নঈম নিজাম   |   রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ৮৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কুমিল্লার শান্তি সুনীতি ফয়জুন্নেসা ও মীরা

কুমিল্লার কাগজ-এর সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয়। কুমিল্লা শহরে বাস করা অনুজ এই সাংবাদিক ব্র্যান্ড কুমিল্লাকে এগিয়ে নিচ্ছেন অনেক বছর ধরে। কাজ করছেন কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দুই নারী কর্মী সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষকে নিয়েও কাজ করছেন তিনি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য এ দুই নারীর অসাধারণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের সেই সাহসিকতার কথা সেভাবে সামনে আসেনি। মুম্বাইয়ের সিনেমাপাড়া এ নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র তৈরি করেনি। ইতিহাস খুঁড়ে কঠিন সত্য সামনে আনতে চায় না। শান্তি আর সুনীতির কাহিনি নিয়ে হলিউডে চলচ্চিত্র হতে পারে। সেই যুগে সেই সময়ে কুমিল্লা শহরের দুটি স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ভারতবর্ষ কাঁপিয়েছিলেন। ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশরাজের। ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল স্বস্তি নিয়ে বিশাল ভারতবর্ষ দখলে রাখার সুযোগ নেই। কুমিল্লার বিপ্লবী তৎপরতা শুধু ত্রিপুরায় থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে ভারতজুড়ে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছিল। সুনীতি-শান্তি ঘোষদের বিপ্লব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কীভাবে দুই কিশোরী কুমিল্লা শহরে গুলি করে হত্যা করেছিলেন তখনকার ত্রিপুরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে? সবকিছু অপার বিস্ময়। সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষ পরিবারের বাস ছিল কুমিল্লা শহরে। তাঁরা পড়াশোনা করতেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা স্কুলে। সময়টা ১৯৩০ সাল। ব্রিটিশ শাসকদের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল ভারতজুড়ে। তখনকার ত্রিপুরা এখনকার কুমিল্লার বাইরে ছিল না। ১৯৩০ সালে কুমিল্লায় সমবেত বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। আহত হন আন্দোলনে অনেক অংশগ্রহণকারী। ফয়জুন্নেসা স্কুলের হোস্টেলের ছাত্রীরা প্রধান শিক্ষিকার নির্দেশে আহতদের পাশে দাঁড়ান। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি প্রশাসন। এ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার ঘটনার রেশ ধরে পদত্যাগ করেন ফয়জুন্নেসা স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রীমতী লাবণ্যলতা। বিষয়টি স্কুলছাত্রীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তাঁরা ক্ষুব্ধ হন। ব্যথিত হন। ফয়জুন্নেসা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিপ্লবীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ছাত্রী সংঘ সংগঠনের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁদের কর্মতৎপরতা। সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষ উঠে আসেন ছাত্রী সংঘের নেতৃত্বে। এ সময় কুমিল্লার দিকে চোখ পড়ে ব্রিটিশ শাসকদের। পুলিশ নানাভাবে দমননীতি চালাতে শুরু করে। দেশসেবকদের প্রতি নিপীড়নে কুমিল্লার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকারীরা থামেননি। বরং বিপ্লবীরা কুমিল্লায় কাজ শুরু করেন নতুনভাবে। আন্দোলনের ধরন নিয়ে নিজেদের মাঝে বিভক্তি থাকলেও তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন কুমিল্লার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করবেন। এমন কিছু করবেন যা কাঁপিয়ে দেবে সমগ্র ভারতকে। ইংরেজরা চিন্তা করবে ভারত ছাড়ার। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। বিপ্লবী প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্ম, অখিল নন্দী, হেমেন্দ্র ভট্টাচার্য, বঙ্কিম চক্রবর্তী আন্দোলন উজ্জীবিত করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরও দুই নারী বিমলা প্রতিভা ও ইন্দুমতী। তাঁরা মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ছাত্রী সংঘ প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লার মেয়েদের সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়। তাঁরা জড়িয়ে পড়েন বিপ্লবী আন্দোলনে।

প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্ম ছিলেন চূড়ান্ত পথকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে। তিনি শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীকে বেছে নেন বিশেষ মিশন সফল করতে। কোটবাড়ী পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁরা শিখে নেন কীভাবে পিস্তল, রিভলবার চালাতে হয়। বাড়ি থেকে কৌশলে বের হতেন সুনীতি চৌধুরী। তাঁর দুই ভাই জানতেন। বোনকে তাঁরা সহায়তা করেন গোপনে। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রিটিশ সরকারকে ভীত করতে বড় ধরনের কিছু শুরু করবেন। সময় এলো সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষের মাধ্যমে বড় অপারেশন চালানোর। এ দুই বান্ধবীর বাসা ছিল কুমিল্লা শহরের ফয়জুন্নেসা স্কুলের পাশে দিগম্বরীতলায়। শান্তি ঘোষের বাড়ির নাম ছিল শান্তি কুটির। প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্ম দুটি অস্ত্র দেন দুজনকে। কীভাবে অস্ত্র চালাতে হয় সে প্রশিক্ষণ আগেই দেওয়া হয়েছিল। ছাত্রী সংঘের এ দুই কিশোরী অপারেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সিদ্ধান্ত আসে তাঁরাই শেষ করবেন ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে। স্কুলপড়ুয়া সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষের কোনো ভয়ডর নেই। দেশের টানে মাঠে নেমেছেন, ভয় করে কী হবে? ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করেন সুনীতি ও শান্তি। কেঁপে ওঠে ব্রিটিশরাজের দরবার। অন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত হন। নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা চিঠি পাঠান ব্রিটিশরাজের দরবারে। জানান কঠিন বাস্তবতা।
ভিতরে ক্ষরণ নিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা আরও কঠোরতার দিকে যায়। শুরু হয় কুমিল্লায় দমনপীড়ন। গ্রেফতার হন সুনীতি ও শান্তি ঘোষ। হত্যায় ব্যবহার করা দুটি রিভলবারসহ আটক করা হয় গোপাল দেবকে। দুই কিশোরী জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোনো কিছু স্বীকার করেননি। তবে শান্তি ঘোষের মা সালিলা বালা ঘোষ গোপনে পুলিশের কাছে তিন পৃষ্ঠার লিখিত জবানবন্দি দেন। মেয়েকে বাঁচাতে তিনি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের নাম উল্লেখ করেন। বিপ্লবী অখিল নন্দী, প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্মকে দায়ী করেন তিনি। অন্য সবার নামও তাঁর জবানবন্দিতে নিয়ে আসেন। ব্রিটিশরা এ জবানবন্দি ও জব্দ করা অস্ত্র এবং অন্যান্য আলামত বিচারে উপস্থাপন করে। বিচারে বয়সের কথা বিবেচনায় রেখে শান্তি ও সুনীতিকে দ্বীপান্তর দন্ড দেওয়া হয়। তাঁদের আইনজীবী দাবি করেন, দুজনই নাবালিকা। মেদিনীপুর জেলে তাঁদের তৃতীয় শ্রেণির কয়েদি হিসেবে রাখা হয়। গান্ধীজির চেষ্টায় ১৯৩৯ সালে শান্তি ও সুনীতি মুক্তি পান। হিজলি বন্দিনিবাসে ছিলেন। রায় মেনে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিচারক আন্দামানে দ্বীপান্তরের রায় দেন অন্যদেরও। আটক থাকাকালে সুনীতির পরিবারের ওপর নির্যাতন নেমে আসে ভয়াবহভাবে। তাঁর পিতার পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভাইদের আটক করে নির্যাতন চালানো হয়। ব্রিটিশরা চেয়েছিলেন সুনীতি ও শান্তি ঘোষকে শেষ করতে। তা হয়নি। কুমিল্লার আগুনের ঢেউ চট্টগ্রামে জ্বলে ওঠে। সুনীতি-শান্তির পথ ধরে চট্টগ্রামে বিপ্লবে অংশ নেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এ ঘটনার এক বছর পর ১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়ে ক্লাবে হামলা চালান প্রীতিলতা।

জেল থেকে বের হয়ে সুনীতি-শান্তি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। সুনীতি এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসক হন। শান্তি এইচএসসি পাস করে সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় মন দেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন। বিয়ে করেন চট্টগ্রামের চিত্তরঞ্জন দাসকে। সুনীতি বিয়ে করেন শ্রমিক আন্দোলনের নেতা প্রদ্যুত কুমার ঘোষকে। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সুনীতি মারা যান। শান্তি ঘোষ মারা যান ১৯৮৯ সালের ২৭ মার্চ।

কুমিল্লা শহর একসময় প্রগতিশীলদের ঠিকানা ছিল। নওয়াব ফয়জুন্নেসা স্কুলের ছাত্রী ছিলেন বিপ্লবী সুনীতি ও শান্তি। ভারতবর্ষের প্রথম নারী, যিনি উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, নারী জাগরণের জন্য পেয়েছিলেন নওয়াব খেতাব, সেই ফয়জুন্নেসার মূল্যায়নটা সঠিকভাবে হয়নি। ধন্যবাদ সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ফয়জুন্নেসার স্মৃতিবিজড়িত লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ের নওয়াববাড়িকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঠাঁই দেওয়ায়। ফয়জুন্নেসার বাড়িটি সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এখন সারা দুনিয়া থেকে মানুষ আসবে এ বাড়ি দেখতে। ফয়জুন্নেসাকে জানতে। ফয়জুন বাংলাদেশের নারী জাগরণের প্রথম ইতিহাস। বেগম রোকেয়া ও অন্যরা তাঁর অনেক পরের কথা। সে যুগে সব বাধা অতিক্রম করে ফয়জুন্নেসা পেরেছিলেন সফলতার সঙ্গে জমিদারি চালাতে। পুরো ভারতবর্ষে নতুন ইতিহাস গড়তে। আলাদা ব্যক্তিত্বের এই নারী জমিদার সে যুগে সাহিত্যচর্চাও করতেন। তাঁর লেখা ‘রূপজালাল’-এ উঠে এসেছে সে সময়ের একজন নারীর অন্তঃক্ষরণ। ফয়জুন্নেসার ইতিহাস আজকের প্রজন্মকে জানাতে হবে। ফয়জুন্নেসা সবকিছুতে ছিলেন আলাদা। তিনি রবীন্দ্রনাথের বোনদের সংগঠন ‘সখিসংঘ’-এর পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। মানবতার বিকাশে কুমিল্লায় গড়েছেন হাসপাতাল। মক্কা শরিফে হজ করতে গিয়ে খেয়াল করলেন নারীদের দুর্ভোগ। তিনি হজ শেষে ফিরলেন না। টানা পড়ে থাকলেন মক্কায়। নারীদের বিশ্রাম ও অজুর আলাদা ব্যবস্থা করলেন। ফয়জুন্নেসা শিক্ষার প্রসারে স্কুল করেছেন। কলেজ গড়েছেন। তিনি বুঝতেন নারী-পুরুষকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে যেতে হবে। সে কারণে নারী শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রেখেছেন। ১৮৭২ সালে কুমিল্লা শহরে ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নির্মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা এখনো স্মৃতি বহন করে চলেছে। সাহসী এই নারী সে যুগে সতীনের সঙ্গে ঘর করবেন না বলে ছেড়েছিলেন স্বামীর সংসার। ভাইদের সংসারে বোনের জমিদারির দায়িত্ব নেওয়া এত সহজ ছিল না। তার পরও ভাইদের চেয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে জমিদারির দায়িত্ব নেন। প্রজাদের মাঝে ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়। সবাই ডাকতেন ‘বেগম সাহেবা’। জনহিতৈষী কাজ করতেন। পানি সংকট নিরসনে বড় দিঘি খনন করেছেন নিজের জমিদারি এলাকায়। রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। তাঁর নির্মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক।

ফয়জুন্নেসার ব্যক্তিত্ব দেখতে পেয়েছিলেন তখনকার ত্রিপুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস। একবার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন ডগলাস। ব্রিটিশ সরকার থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ আসতে বিলম্বের কারণে এই প্রশাসক প্রশাসন চালানো নিয়ে সংকটে ছিলেন। ভাবলেন সংকট কাটাতে স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে ধার নেবেন ১ লাখ টাকা। ১০ জন জমিদারের কাছ থেকে ১০ হাজার করে নিতে পারলে ১ লাখ হবে। অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করলেন বেশ কয়েকজন। খুশিমনে তিনি গেলেন নওয়াব ফয়জুন্নেসার কাছে। সব শুনলেন ফয়জুন্নেসা। তারপর বললেন, পুরো টাকাটা তিনি একাই দিতে চান। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিস্মিত হলেন। এতটা তিনি আশা করেননি। তারপর বললেন, একসঙ্গে পাওয়া গেলে খুবই ভালো হয়। শোধ করতে সুবিধা হবে। ফয়জুন্নেসা জানতে চান এ টাকা কোন খাতে ব্যয় হবে। জবাবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস বললেন, শিক্ষা, সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কারে। ফয়জুন্নেসা বললেন, টাকাটা ব্যয় হবে দেশের প্রজাদের উন্নয়নে। এ টাকা সঠিকভাবে ব্যয় করুন। পুরো ১ লাখ দেব। মনে রাখবেন টাকা ফেরত দিতে হবে না। ফয়জুন্নেসা যা দান করে তা ফেরত নেয় না। উন্নয়নের দান হিসেবে টাকাটা দিলাম। সে সময় বিশাল অর্থ একসঙ্গে দান হিসেবে পেয়ে হতবাক হয়ে যান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বিষয়টি চিঠি লিখে জানালেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহারানি ভিক্টোরিয়াকে। রাজদরবার বিস্মিত হলো ভারতীয় একজন নারী জমিদারের বিশালত্বে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন ফয়জুন্নেসাকে ‘বেগম’ খেতাব দেবেন। বেগম খেতাবের চিঠি পেয়ে ফয়জুন্নেসা রাজদরবারে চিঠি লিখে প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন, প্রজারা তাঁকে এমনিতে বেগম সাহেবা ডাকে। আলাদা খেতাবের প্রয়োজন নেই। বিশাল ইংরেজ সাম্রাজ্যের রানি বিস্মিত হলেন এ প্রত্যাখ্যানের খবরে। রাজসহচরদের কাছে রানি জানতে চান ভারতবর্ষে জমিদারদের জন্য সর্বোচ্চ খেতাব কী? জবাবে জানলেন ‘নওয়াব’। রানি নির্দেশ দিলেন বাংলার এই মহীয়সী নারীকে নওয়াব খেতাব দেওয়ার জন্য। রাজদরবারে তিনি এ খেতাব নিজ হাতে তুলে দেবেন।

এবার আসি কুমিল্লার আরেকজন মহীয়সী নারীর কথায়। তাঁর নাম মীরা দেববর্মণ। শচীন দেববর্মণের স্ত্রী এবং রাহুল দেববর্মণের মা হিসেবে খ্যাত। এ দুই পরিচয়ের ভারে আড়াল হয়ে যায় তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান। অথচ মীরা নিজেই ছিলেন বিশাল গীতিকার। তাঁর লেখা অনেক গানই শচীনকর্তার কণ্ঠে এ উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মীরা ছিলেন সাদামাটা। স্বামী-সন্তানের মৃত্যু তাঁকে শেষ জীবনে ভেঙে দিয়েছিল। পুত্রবধূ বিখ্যাত শিল্পী আশা ভোঁসলের অবহেলায় তাঁর শেষজীবন কেটেছিল বৃদ্ধাশ্রমে। পরে ত্রিপুরা সরকার তাঁকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মীরা তাঁর উত্তাল সময়ে লিখেছিলেন, ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া…।’ আহা! অসাধারণ এই সুর এখনো কানে বাজে। তাঁর লেখা আরও কিছু গান-‘বর্ণে গন্ধে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছে দোলা…’ অথবা ‘নিটল পায়ে রিনিক ঝিনিক পায়েলখানি বাজে…’ আমাদের ভিতরটাকে নাড়িয়ে দেয়। মনের ভিতরে দোলা লাগে ‘তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল…’ শুনে। কুমিল্লার সন্তান শচীনকর্তার সঙ্গে মীরার পরিচয় ১৯৩৭ সালে এলাহাবাদ সংগীত সম্মেলনে। তারপর দুজনের একসঙ্গে পথচলা। বিয়ে করলেন ১৯৩৮ সালে। সন্তান এলো রাহুল দেববর্মণ। স্বামী ও পুত্রের মৃত্যু মীরাকে তছনছ করে দেয়। বৃদ্ধাশ্রম ও হাসপাতালের কষ্টভোগ নিয়েই মারা যান ২০০৭ সালের অক্টোবরে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার