Advertisement Placeholder

বিচিত্র উত্তর-পূর্ব আমেরিকা

এম আবুল কাসেম   |   বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ১৫৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বিচিত্র উত্তর-পূর্ব আমেরিকা

(তিন)

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আজ দিনটি অতি চমৎকার। চারদিকে ফকফকা রোদ। আকাশপানে চেয়ে দেখি মেঘমুক্ত নীলাকাশ। এমনি সুন্দর দিনে আমরা মেইন অঙ্গরাজ্যের গুচস সি বিচে যাই। পোর্টল্যান্ড শহর থেকে গুচস সি বিচের দূরত্ব ত্রিশ মাইল। বাসে ঘন্টা খানেকের পথ। বাস সকালবেলার মনোরম আবহাওয়ায় সেদিকে এগিয়ে যায়। পথিমধ্যে যেতে মেইন অঙ্গরাজ্যের সেই শোভাময় প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করি। আমরা সকাল ১১টায় গুচস সি বিচে পৌঁছাই। সি বিচে পৌঁছেই মনটা আনন্দে ভরে যায়। আহা আটলান্টিক মহাসাগরের সেকি অপরূপ দৃশ্য! সেই অপরূপ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়াই। আমি সি বিচের পানির কিনারায় গিয়ে বালুর ওপর তোয়ালে বিছিয়ে বসি। আটলান্টিক মহাসাগরের শীতল হাওয়ায় শরীরটা জুড়ে যায়। গুচস সি বিচে তখন অসংখ্য নর-নারী তরুণ-তরুণীর সমাগম ছিল। কিছু নারী ও তরুণী সুইমিং কস্টিউম ও চোখে গগলস পরে রৌদ্রস্নান করছিল। আমরা ঘন্টা দুয়েক সি বিচে কাটাই। এরপর বাসে কেনোবাংকপোর্ট শহর ঘুরে দেখি। কেনোবাংকপোর্ট মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি রিসোর্ট শহর। লোকসংখ্যা হাজার চারেক। এই শহর জাহাজ নির্মাণ ও মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য বিখ্যাত। আটলান্টিক পাড়ের এই শহরটি একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন অবকাশকেন্দ্র। এটি পর্যটকদের এক প্রিয় গন্তব্যস্থলও বটে। আমরা বাসে শহরের এদিক-সেদিক ঘুরে এখানকার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করি। এখানে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের সিফুড রেস্টুরেন্ট আছে। বোটহাউস রেস্টুরেন্ট তার মধ্যে একটি। আমরা সেখানে লাঞ্চ সারি। এরপর বিকালবেলা কেনোবাংকপোর্ট শহর থেকে আবার হোটেলে ফিরে যাই।

আজ আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। তাই ঘুম থেকে একটু দেরিতেই ওঠি। এরপর হাতমুখ ধুয়ে হোটেল হলিডে ইনের ডাইনিংরুমে ব্রেকফাস্ট খেতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি মি. সেনও নাস্তা খেতে এসেছেন। আমরা দুজন এক টেবিলে নাস্তা খেতে বসি। আমি টোস্ট ব্রেড উইথ বাটার, এগ অমলেট ও গ্রিল পটেটো দিয়ে নাস্তা সারি। মি. সেন একটা প্যানকেক ও এগ অমলেট দিয়ে তার নাস্তা সারেন। এরপর আমরা দুজন দুধ মেশানো কফি খেতে খেতে আলাপ শুরু করি।

মি. সেন বলেন, আজকাল ইন্টারনেটের কল্যাণে দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকা পড়া যায়। আমি মাঝে মাঝে বাংলাদেশের অনলাইন পত্রিকায় চোখ বুলাই। এমনি একদিন অনলাইনে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকা পড়তে গিয়ে একটা খবরে আমার চোখ পড়ে। এতে দেখতে পাই বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে। এটা কি ঠিক?
‘হ্যাঁ ঠিক ।‘
‘কীভাবে?’

‘দেখুন দাদা, একটা দেশের আয়তন নানাভাবে বাড়তে পারে। কখনো কোনো দেশ যুদ্ধে জয়ী হয়ে, আবার বলপূর্বক অন্যের ভূমি দখল করে বা ক্রয়সূত্রে মালিক হয়ে একটা দেশের আয়তন বাড়তে পারে। এই যেমন, ইসরায়েল আরব ও ফিলিস্তিনিদের ভূমি জোরপূর্বক দখল করে তার দেশের আয়তন বাড়ায় । আমেরিকা মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধে জয়ী হয়ে বিপুল পরিমাণ মেক্সিকোর জায়গা দখল করে আমেরিকার আয়তন বাড়ায়। আবার ১৮৬৭ সালে আমেরিকা রাশিয়ার কাছ থেকে ৭.২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা অঙ্গরাজ্য ক্রয় করে তার আয়তন বাড়ায়। তবে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ায় এখানে যুদ্ধবিগ্রহের কোনো অবদান নেই। এটা একেবারে মা প্রকৃতির দান। আপনি জানেন বাংলাদেশ একটি নদীর দেশ। এই দেশের তিনটি বড় নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় নিত্য ভাঙাগড়ার খেলা চলে। প্রমত্ত এসব নদীর একূল ভাঙে তো আবার ওকূল গড়ে নতুন বসতি গড়ে ওঠে । এখন আবার চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ভোলা জেলার উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গোপসাগরের বুকে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। নতুন জেগে ওঠা চরের মধ্যে আছে নিঝুম দ্বীপ, উড়ির চর, ভাসান চরসহ আরও অসংখ্য চর। এসব নতুন জেগে ওঠা চরই বাংলাদেশের আয়তন বাড়াচ্ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা এই নতুন ভূমির পরিমাণ কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এই নতুন ভূমির ফলে বাংলাদেশের মানচিত্রও অচিরেই বদলে যাবে।’

মি. সেন বলেন, এটা একটা আশার কথা। সত্যি বঙ্গোপসাগর আজ আপনাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, তাই না?
আমি বলি, আপনি ঠিকই বলেছেন। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একান্ত সমুদ্র এলাকায় প্রচুর গ্যাসের মজুত আছে যার পরিমাণ ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। তাছাড়া সেখানে ঝিনুক, কাঁকড়া, লবস্টার ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছসহ বিপুল পরিমাণ উদ্ভিদজাত এবং প্রাণীজ সম্পদের সন্ধানও পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগরের এই ব্লু ইকোনমিকে কাজে লাগাতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে।

মি. সেন বলেন, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসম্পদের ফলে বাংলাদেশ আরও সম্পদশালী হবে এবং আপনাদের দেশের আয়তন বাড়ার ফলে দেশের জনসংখ্যার ঘনত্বও আরও অনেক কমে যাবে।

আপনি ঠিক বলেছেন এই বলে আমি তার সাথে সহমত প্রকাশ করি। এরপর প্রসঙ্গ পাল্টে মি. সেনকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা দাদা, আপনি একজন ভারতীয় বাংলাভাষী লোক। বাংলাভাষী বাংলাদেশিদের কষ্ট আপনি ভালোই বুঝবেন। আপনারা প্রতিবছর বর্ষাকালে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ খুলে দেন। এর ফলে পাহাড়িয়া ঢলে ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। আর এতে ওই অঞ্চলের বানভাসি মানুষ অনেক দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হয়। বাংলাদেশের সাথে আপনারা এমন বিমাতাসুলভ আচরণ করেন কেন?
মি. সেন খানিক চুপ থাকেন। এরপর বলেন, দেখুন, বাংলাদেশ আমাদের এক পরম প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র। বাংলাদেশিদের আমরা আমাদের খুব কাছের লোক মনে করি। আমরা সব সময় আপনাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধি চাই। গোমতী নদী ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারত ত্রিপুরায় গোমতী নদীর উজানে ডুম্বুর নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে এই বাঁধের দূরত্ব ১২০ কি.মি.। এই বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় এবং সেই বিদ্যুৎ বাংলাদেশেও যায়। বর্ষাকালে প্রবল বর্ষণে জল যখন বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন কর্তৃপক্ষ বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বাধ্য হয়। এর ফলে বাঁধের নিম্নাঞ্চল তখন প্লাবিত হয়। এটা ইচ্ছাকৃত নয়। এখানে ভারত সরকারের কোনো কারসাজি নেই।

আমি এবার প্রসঙ্গ পাল্টে বলি, দেখুন দাদা, আপনারা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে গজলডোবায় গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেন। এই বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের প্রকৃতি আজ বিপন্ন। এই বাঁধকে ‘বাংলাদেশের দুঃখ’ বলা হয়। কারণ শুকনা মৌসুমে পানির অভাবে বাংলাদেশের খালবিল, নদীনালা, পুকুর-জলাশয় সব শুকিয়ে যায়। আবার বর্ষাকালে প্রবল বর্ষণ শুরু হলে আপনারা মরণফাঁদ ফারাক্কার গেট খুলে দেন। ফলে ফি বছর বৃহত্তর রাজশাহীসহ বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। এতে পানিবন্দি মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কোনো সীমা থাকে না।

মি. সেন এ ব্যাপারে তার দুঃখ প্রকাশ করেন। এরপর বলেন, দেখুন, ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র। বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা থাকতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেসব সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

আমি বুঝি মি. সেন একজন খুব চালাক লোক। তিনি আসল কথা এড়িয়ে নানা কথা বলে আমাকে প্রবোদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার মিষ্টি কথায় আমি কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারিনি। তবে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হতে পারে ভেবে আমি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বাড়াইনি।

মেইন অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যে আমাদের ভ্রমণের বেশ কয়েক দিন কেটে যায়। আমরা আজ বাসে পোর্টল্যান্ড শহরের আশপাশের জনপদ ঘুরে দেখি। পোর্টল্যান্ড শহরের সাকোসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সেসব জনপদের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করি। বিকালবেলা আমরা নুনানস লবস্টার হাটে ডিনার খেতে যাই। হোটেল হলিডে ইন থেকে নুনানস লবস্টার হাটের দূরত্ব ত্রিশ মাইল। বাসে ঘন্টা খানেকের পথ। বিকালবেলার চমৎকার আবহাওয়ায় আমরা সেদিকে যাই। পথিমধ্যে যেতে মেইন অঙ্গরাজ্যের সেই মনকাড়া দৃশ্য উপভোগ করি। নুনানস লবস্টার হাটে পৌঁছে চারদিকের মায়াবী দৃশ্য দেখে খুব খুশি হই। হাইওয়ের পাশেই নুনানস লবস্টার হাট রেস্টুরেন্ট। সেখানে গিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে বসি। এখানে সবাই যে যার পছন্দানুযায়ী লবস্টার দিয়ে ডিনার খায়। আমি হট বয়েল্ড পাউন্ড লবস্টার, ভেজি বার্গার ও কফি খেয়ে আমার ডিনার সারি। মেইন অঙ্গরাজ্যের লবস্টারের সত্যিকারের স্বাদ এখানে পাই। আমরা রেস্টুরেন্টে ঘন্টা তিনেক সময় কাটাই। এরপর রাতে হোটেলে ফিরে যে যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

পরদিন ভোরে পুবের সূর্যের হালকা আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে রুমে ঢুকে। আর এতে আমার ঘুম ভাঙে। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। আটলান্টিক মহাসাগরের জলের রূপ দেখে এবং ঢেউয়ের কলকল গর্জন শুনে শিহরিত হই। আহা সে কী অভূতপূর্ব দৃশ্য! দেখে চোখ জুড়াই। আজ আমাদের সফরের শেষ দিন। আমি গোসল সেরে নাস্তা খাই। এরপর রেডি হয়ে ট্যুর বাসে গিয়ে বসি। সবাই এক এক করে ট্যুর বাসে এসে বসেন। এবার আমাদের ফেরার পালা। আমি চারদিকে তাকাই। সকালবেলার ফকফকা রোদে চারদিক তখন ঝকমক করছিল। গাড়িচালক ইতোমধ্যে গাড়ির স্টিয়ার হুইলে হাত রাখেন। এরপর গাইডের নির্দেশ পেয়ে সকাল নয়টায় বাস ছাড়েন। পথিমধ্যে আমরা একবার যাত্রাবিরতি করি। সেখানে সবাই লাঞ্চ সারেন। এরপর আবার আমাদের পথচলা শুরু হয়। ট্যুর বাস ঘন্টা তিনেক একটানা চলে। এরপর বিকাল চারটায় নিউইয়র্ক সিটি এসে পোঁছায়। গাইড মাইক্রোফোন হাতে নেয়। সে ভ্রমণ সফল করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নেয়। আমি মি. সেনের সাথে করমর্দন করে তার কাছ থেকে বিদায় নিই। তখন পড়ন্ত বিকাল। দিনের এমনি মনোরম সময়ে ট্যাক্সিতে চাপি। এরপর মেইন অঙ্গরাজ্য ভ্রমণের এক সুখকর অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরি। (সমাপ্ত)

Facebook Comments Box
আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার