
বিশেষ সংবাদদাতা | বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | প্রিন্ট | ৭৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

জাতিসংঘ সদর দফতরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন চলতি সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি কাসাবা কোরোসি (বাম থেকে দ্বিতীয়)। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা ভাষাসমূহ রক্ষায় সকলকে একযোগে কাজের আহবান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি কাসাবা কোরোসি বলেন, মাতৃভাষার ব্যবহার সবসময়ই সহনশীলতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করে। আজকের ইন্টারলকিং চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলার সাথে রুপান্তরমূলক সমাধানের পথও বাতলে দেয় মাতৃভাষার ব্যাপক প্রয়োগ সম্ভব হলে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার অপরাহ্নে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যকালে চলতি ৭৭তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি কোরোসি আরো উল্লেখ করেন, আমাদের মাতৃভাষা আমাদের শৈশবের সাউন্ডট্রেক। বিশ্ব সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা হচ্ছে সকলের প্রাথমিক অবলম্বন। তা আমাদেরকে পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তৈরী করে। এবং জ্ঞান, স্মৃতি, ইতিহাসকে ভাগাভাগি করার ক্ষমতা দেয়। কোরোসি উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন, এতদসত্বেও কিছু মাতৃভাষা আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বিশ্বায়ন এবং আমাদের ক্রমবর্ধমান অনলাইন সংস্কৃতির কারণে তা হুমকির মুখে। যখন এহেন হুমকির ব্যাপারটি নি:শেষ হয়ে যাবে তখোনই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার পথ সুগম হবে।
বাংলাদেশ, ভারত, ডেনমার্ক, গুয়েতেমালা, হাঙ্গেরী, মরক্কো এবং পূর্ব তিমোরের সম্মিলিত উদ্যোগে ৪ নম্বর কনফারেন্স কক্ষে এ অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ, বাঙালি জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালনের মধ্যদিয়ে। এরপরই শ্রীচিন্ময় সেন্টারের শিল্পীরা দিবসের থিমসঙ পরিবেশন করেন। ১৭ শিল্পীর একজন ছিলেন বাঙালি। ভিনদেশীদের কন্ঠে একুশের অমর সঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি-আমি কী ভুলিতে পারি’ পরিবেশনের সময় পুরো কনফারেন্স কক্ষে ভিন্ন এক আবহ তৈরী হয়। শ্রীচিন্ময় সেন্টারের শিল্পী দলের প্রধান এ সময় গানের রচয়িতা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রতিও সম্মান জানিয়েছেন। এরপর অনুষ্ঠানের অতিথিগণ আসন গ্রহন করলে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত। বাংলায় প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি মায়ের ভাষার জন্যে বাঙালির রক্তদানের দিনটি কীভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত হয়েছে-তা বিবৃত করেন। রাষ্ট্রদূত মুহিত ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদগণ এবং ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। মুহিত বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই জাতির পিতার নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রাম, যার চূড়ান্ত পরিণতি পায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের মাধ্যমে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশীর উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পূর্ণ স্বীকৃতি আদায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত মুহিত। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিউটের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও অবদানের কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত মুহিত। এবারের আর্জান্তিতক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাকে সম্মান জানিয়ে নতুন বাংলা ইউনিকোড ফন্ট প্রকাশ করার জন্য ইউএনডিপিকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন স্থায়ী প্রতিনিধি। তাছাড়া, বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম একটি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও অব্যাহত রেখে যাবেন বলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মুহিত।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এটি ছিল টানা সপ্তম বারের মত যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপনের ঘটনা। বিগত বছরের ন্যায় এ বছরও জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষায় গোটা অনুষ্ঠানটি অনুবাদের সুব্যবস্থা রাখা হয়।
আলোচনা পর্বে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রুচিরা ক্যাম্বোজ, ডেনমার্কের স্থায়ী প্রতিনিধি মারটিন বিালি হারমেন, গুয়াতেমালার স্থায়ী প্রতিনিধি কার্লা মারিয়া রডরিগুয়েজ, মরক্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি ওমর হিলালী, পূর্ব তিমোরের স্থায়ী প্রতিনিধি কার্লিটো নূনেস, হাঙ্গেরীর উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি অনিতা কোকাই, জাতিসংঘের জেনারেল এ্যাসেম্বলি ও কনফারেন্স ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মোভসেস আবেলিয়ান, নীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল গাই রাইডার, নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের প্রতিনিধি দিলীপ চৌহান, ইউনেস্কোর নিউইয়র্ক অফিসের প্রতিনিধি মাতৃভাষার জন্যে বাঙালিদের আত্মত্যাগের প্রশংসা করেন এবং সকল জাতিগোষ্ঠির মধ্যে একই চেতনা প্রবাহিত রাখার অভিপ্রায়েই ২১ ফেব্রæয়ারিকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন। বক্তাগণ জাতিসংঘে বহুভাষাবাদ ও মাতৃভাষার প্রচারে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। এ বছরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘বহুভাষায় শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা’। মাতৃভাষাকে ভিত্তি করে বহুভাষায় শিক্ষা প্রদান করা হলে তা সারা বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
স্প্যানিশ ভাষাভাষী ফ্রেন্ডস্ গ্রুপের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে নিযুক্ত কিউবার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ভাষা বিষয়ক এনজিও কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ফ্রান্সেস এম হাল্ট-ও বক্তব্য রাখেন। আলোচনা শেষে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘ চেম্বার মিউজিক সোসাইটি, শ্রী চিন্ময় গ্রুপ এবং ভারতের স্নেহ্ আর্ট নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এতে অংশগ্রহণ করে।
আমন্ত্রিত সম্মানীত অতিথি হিসেবে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আকবর রীচি, বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার, বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার চুন্নু, বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশিদ আনোয়ার বাবলু, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম।
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি, অন্যান্য কূটনীতিক, জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল ড. মনিরুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান-সহ নিউইয়র্কে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল অনুষ্ঠানটি। জাতিসংঘ ওয়েবটিভিতে এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।



