Advertisement Placeholder
অন-ক্যাম্পাস, সিপিটিতে কাজ করেই খরচ পুষিয়ে নেয়া সম্ভব

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছেন অকারণে

বিশেষ সংবাদদাতা   |   শুক্রবার, ০৩ মার্চ ২০২৩   |   প্রিন্ট   |   ৮১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছেন অকারণে

চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপ। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।

স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশ, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ ঝরে পড়ছে। অর্থ সংকট এর মূল কারণ। ফলে বিরাটসংখ্যক এই উদ্যমী তরুণ-তরূণীর মেধা ব্যয় হচ্ছে অডজবে। কেউ রেস্টুরেন্ট, আবার কেউ গ্রোসারি কিংবা খুচরা স্টোরে কাজ নিচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী পারিশ্রমিক তারা পাচ্ছেন না ওয়ার্ক পারমিট না থাকায়। এ অবস্থায় তারা কলেজ/ভার্সিটি থেকে ঝরে পড়ছেন। ভিসার নিয়ম লংঘন করায় বহিষ্কারের ঝুঁকিতে যাচ্ছেন।

ইতিমধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এক বাংলাদেশীসহ কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর সরাসরি ফ্লাইটে উঠিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষার জন্যে বিশ্বে সবচেয়ে বেশী সমাদৃত শিক্ষা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করে নিজ নিজ মেধাকে মানবতার কল্যাণের পরিবর্তে হুমকিতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রতি বছর ৫ লাখের অধিক ছাত্র-ছাত্রী বিদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশী হচ্ছেন চীন ও ভারতীয়। গত বছর বাংলাদেশ থেকেও এসেছেন ১০৫৯৭ জন। অপরদিকে ভারতীয় এসেছেন এক লাখ ২৫ হাজার। স্টুডেন্ট ভিসাপ্রাপ্তরা বিবাহিত হলে সাথে তার স্বামী/স্ত্রী এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানও আসতে পারেন। তারা ভিসার আবেদনের সময় নিজের আর্থিক সক্ষমতার পক্ষে ডক্যুমেন্ট সাবমিট করেন। অনেকে আসার সময় মোটা অংকের অর্থও সাথে আনেন। পরবর্তীতে তারা অভিভাবককে বিব্রত করতে চান না বলে অনেকেই পরিচিতজনের মাধ্যমে কাজে লিপ্ত হন।

অভিভাবককে দেখাতে চান যে নিজে অর্জিত অর্থে লেখাপড়া করছেন। এটি বাস্তবে সম্ভব হলেও কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারে যে বেআইনীভাবে ছাত্রটি কাজ করছে, তাহলে সাথে সাথে তার ভিসা বাতিল হয়ে যায়। ভিসা বাতিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ছাত্র/ছাত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠে। তবে যারা ভিসা বহাল থাকাবস্থায় সিটিজেনকে বিয়ের মাধ্যমে কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা অথবা নির্যাতিত হিসেবে স্ট্যটাস এডজাস্টের সুযোগ পান-তাদের কথা আলাদা। অন্যথায় ভিসা লংঘনকারিরা কখনোই স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পান না। উদ্ভ’ত পরিস্থিতির আলোকে ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি’র চ্যান্সেলর ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ইউএস গভর্ণমেন্ট বিশ্বের বহুদেশে স্টুডেন্ট ভিসা দিয়ে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হলো-আমেরিকার হাই স্টান্ডার্ড এডুকেশন নিয়ে তারা নিজ দেশে ফিরে দেশের কল্যাণে ব্যয় করুক। এটি হচ্ছে অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ইউএস গভর্ণমেন্টের। এ আহবানে সাড়া দিয়ে যারা দূতাবাসে ভিসার আবেদন করেন তাদের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দূতাবাস নিশ্চিত হতে চায় যে, শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী কিনা, দ্বিতীয়ত: তার ফাইন্যান্সিয়াল ক্যাপাসিটি আছে কিনা, তৃতীয়ত: সে আমেরিকায় এসে কোন কাজ না করে পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে কিনা, চতুর্থত: সে লেখাপড়া শেষে নিজ দেশে ফিরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবদান রাখবে কিনা। এরপর রীতি অনুযায়ী ভিসা নিয়ে শিক্ষার্থী যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন- এ প্রসঙ্গে চ্যান্সেলর হানিপ বলেন, সেই রীতির বরখেলাপ করে অনেকে বেআইনী পন্থায় কাজে লিপ্ত হবার চেষ্টা করেন।

অথচ কাজ করার জন্যে তার কোন অনুমতি নেই। এভাবে অনেকে তার স্টুডেন্ট ভিসা হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ তিনি অবৈধ হয়ে গেলেন। অথচ শিক্ষার্থী যদি মাস্টার্স করতে এসে থাকেন তাহলে দেড় থেকে দু’বছর যদি কষ্ট স্বীকার করেন তাহলে পৃথিবীর যে কোন স্থানে তিনি কাজের যোগ্য হলেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রেও ওপিটি (অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং)’র মাধ্যমে সে কর্পোরেট/বড় সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। এর মেয়াদ এক বছর হয়ে থাকে। অপরদিকে,স্টেমের আওতাধীন বিষয়ে যদি তিনি লেখাপড়া করেন তাহলে ওপিটির মেয়াদ ৩ বছর হয়ে যায় অর্থাৎ তিনি ৩ বছরের ওয়ার্ক পারমিট পান। এই সময় যদি কোম্পানীকে সন্তুষ্ট করতে পারেন তাহলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীই তাকে এইচওয়ান-বি-তে স্পন্সর করতে পারেন। এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে কম্যুনিটিতে। এই এইচ-ওয়ান বি ভিসার সংখ্যা বছরে ৮৫ হাজার। যার মধ্যে ২০ হাজার হচ্ছে মাস্টার্স ডিগ্রিধারিদের জন্যে বরাদ্দ। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে লেখাপড়া করলে যে কেউ নিজেকে উন্নত জীবনে ধাবিত করার পথ পেয়ে যান। তারা উচ্চ শিক্ষা এবং ওপিটির অভিজ্ঞতায় নিজ দেশে ফিরেও উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারেন। চ্যান্সেলর হানিপ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যারা নেহায়েতই অর্থ সংকটে পড়েন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করতে পারেন, তাহলে সপ্তাহে ২০ ঘন্টা করে কাজের সুযোগ পেয়ে থাকেন ভার্সিটি কাম্পাসে। এ আয় দিয়েও টিউশন ফি চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। সিপিটি (কারিক্যুলার প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং)’র মাধ্যমে ফুল টাইম কাজের সুযোগও রয়েছে পড়াশোনা করা অবস্থাতেই। তবে তা হতে হবে তার পড়ার বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। এধরনের কাজ করলে প্রতি সেমিস্টারের জন্যে ১ ক্রেডিট আওয়ার করে পাবেন ছাত্রটি। নিজে যদি সক্ষম হন তাহলে কোন শিক্ষার্থীকেই বেআইনী পথে অডজব করার দরকার হবে না। অর্থাৎ আন্তরিক আগ্রহ থাকলে রীতির মধ্যেই কাঙ্খিত উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব। সহজভাষায় বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারটি হলো রিয়েল লাইফের নামান্তর।
চ্যান্সেলর হানিপ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাচেলর/মাস্টার্স করতে আসা শিক্ষার্থীর অনেকেই ইএসএল (ইংলিশ অ্যাজ এ সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ) কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন। অথচ সে ভিসার আবেদনের আগেই তো ইংলিশ শিখে এসেছে। ইংরেজিতে পারদর্শী সেটি প্রমাণ করেই ভিসা নিয়েছেন। এতদসত্বেও কেউ কেউ স্টুডেন্ট ভিসা কন্টিনিউ করার অভিপ্রায়ে ইএসএল কোর্সে ভর্তি হয়ে অডজব শুরু করেন। এটা না করাই শ্রেয় নিজের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে।

কারণ, ইএসএল-এ ভর্তি হলেও ওয়ার্ক পারমিট পান না। আবার অনেকে নগদ অর্থে ইবি-থ্রি (আ-স্কীল্ড) ভিসার জন্যে কন্ট্রাক্ট করেন। ঝরে পড়ার কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে টিউশন প্রদানে অক্ষমতা, অনেক সিটিতে (মিনেসোটার মত) প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করায় বাংলাদেশে থেকে শিক্ষার্থীর পক্ষে টেকা কঠিন হয়ে পড়ে, আবার অনেক ভার্সিটি রয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামে সেখানেও এডজাস্ট করা সম্ভব হয় না। এহেন পরিস্থিতির সম্মুখীন যাতে না হতে হয় এজন্যে আগেই খোঁজ-খবর নিয়ে আসা উচিত বলে উল্লেখ করেন চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপ।
তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে (ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি)অধ্যায়ন করতে টিউশন ফি বেশী লাগে না। যেমন, মাস্টার্স কোর্স সম্পন্নের ফি হলো ২২ হাজার ডলার। এরমধ্যে স্কলারশিপ বাদ দিলে মোট ১৫ হাজার ডলার লাগে দু’বছরে। ব্যাচেলরের ৪ বছরের কোর্স সম্পন্নে লাগে ৫৬ হাজার ডলার। আর যদি স্কলারশিপের অর্থ ১২ হাজার ডলার মাইনাস করি তাহলে মোট ব্যয় হয় ৪৪ হাজার ডলার অর্থাৎ বছরে লাগে ১১ হাজার ডলার। এরপরও এটি হবে স্কীল্ড বেজ এডুকেশন অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে হাতে-কলমে শেখানোও হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর যে কোন স্থানে তিনি কাজের সুযোগ পাবেন। চ্যান্সেলর হানিপ জানান, আমরা একাডেমিক নলেজ এবং ডিগ্রির পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রি নলেজ এবং স্কীলকেও সমন্বয় করে দেই। ফলে কোন শিক্ষার্থীকেই এন্টি লেবেলে জব খুঁজতে হয় না। সে মিড লেবেলে জব করতে সক্ষম। হানিপ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আমাদের ফ্যাকাল্টিগুলো একদিকে স্কলার অপরদিকে প্র্যাকটিশনারও। অর্থাৎ তারা যে বিষয়ে পড়াচ্ছেন তার ওপর ৪ থেকে ৩০ বছরের ইন্ডাস্ট্রি-অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেমন, আপনি ডাক্তারি পাশ করেছেন কিন্তু প্র্যাকটিস করেন না। অর্থাৎ চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার পুরোপুরি কর্ম-অভিজ্ঞতা নেই। এ কারণে কাজের জায়গার পরিপূর্ণ পরিবেশ আমরা ক্লাস রুমে তৈরী করছি। এভাবেই শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে উঠছেন।
চ্যান্সেলর হানিপ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমেও দক্ষ হয়ে উঠায় আমার ইউনিভার্সিটির জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। নামকরা অনেক ভার্সিটি থেকে শিক্ষার্থীরা ট্র্যান্সফার হচ্ছেন আমাদের এখানে। বাংলাদেশ থেকেও গত দু’বছররেচার শতাধিক ছেলে-মেয়ে এসেছেন আমাদের ভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্যে।
ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত এই ভার্সিটিতে অধ্যয়নরতদের অনেকেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পার্টটাইম জব করছেন খরচ পুষিয়ে নেয়ার জন্যে।
উল্লেখ্য, আমেরিকান গ্রীণকার্ড ও সিটিজেনশিপ গ্রহণকারি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্লাস করছেন অনলাইনে। যারা নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, আটলান্টা, টেক্সাস, মিশিগান অথবা লসএঞ্জেলেস বাস করছেন, তারাও অনলাইনে ক্লাসের সুযোগ নিতে পারেন। আরো উল্লেখ্য, সিটিজেন এবং গ্রীণকার্ডধারীদের পুরো ব্যাচেলর এবং মাস্টার্সের জন্যে ৫০% স্কলারশিপ রয়েছে এই ভার্সিটিতে অনলাইনে ক্লাস গ্রহণকারিদের জন্যে।
ইতিমধ্যেই ব্রুকলীন, ম্যানহাটান এবং ফ্লোরিডাস্থ একটি কলেজ (এএসএ কলেজ) ইতিমধেই তাদের এ্যাক্রিডিটেশন হারিয়েছে নানাবিধ অনিয়মের জন্যে। এই কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্যে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী এখন মহাবিপাকে। এমন পরিস্থিতির ভিকটিম শিক্ষার্থীদের জন্যে চ্যান্সেলর হানিপ বলেন, তাদেরকে এহেন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রেও নানাবিধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে। সুতরাং হতাশ না হয়ে অবিলম্বে যেন সংশ্লিষ্টরা www.wust.edu এই ওয়েব সাইটে অথবা ই-মেল iso@wust.edu তে যোগাযোগ করেন।
নিউইয়র্ক সিটির অলি-গলিতে দেখা মেলে অগণিত তরুণ-তরুণী। জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর মেলে তারা স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছেন। ইতিমধ্যেই রেস্টুরেন্ট,গ্রোসারীতে কাজও পেয়েছেন অনেকে। তবে তারা তৃপ্ত নন। আমেরিকায় ডলার বাতাসে উড়ে বলে জেনেছেন, বাস্তবে তার মিল নেই। কাজ করছেন দৈনিক ১২/১৩ ঘন্টা। বিনিময়ে যা পাচ্ছেন তা দিয়ে থাকা এবং খাওয়ার খরচও হচ্ছে না। অপরদিকে, স্টুডেন্ট ভিসার স্ট্যাটাসও টিকিয়ে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার