
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩ | প্রিন্ট | ৫৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

(বাম থেকে) প্যানেল আলোচনার সঞ্চালক নাদিয়া হোসাইন, কৌতুক অভিনেতা আলাউদ্দিন উল্লাহ, অধ্যাপক বিবেক বাল্ড, কম্যুনিটির অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পরিচিত নাহার আলম, নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিলওম্যান শাহানা হানিফ, নাদিয়া আহমদ ও নেসার ভূঁইয়া। ছবি-এএএআরআই’র সৌজন্যে।
বহুজাতিক মার্কিন সমাজে বাঙালিদের বসতি শুরুর দিনগুলোতে কঠিন এক অধ্যায়ের সন্ধানে নেমে সে সময়কার অজানা অধ্যায়ের ধারাবিবরনীতে তৈরী করা হয়েছে ‘ইন সার্চ অব বেঙ্গলি হারলেম’ নামক ফিচার ডক্যুমেন্টারি। সম্ভবত: যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়া প্রথম বাঙালির পুত্র খ্যাতনামা কৌতুক অভিনেতা আলাউদ্দিন উল্লাহ’র এই অভিযাত্রায় সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন এমআইটি’র ভারতীয় বংশোদ্ভূত গবেষক ও লেখক অধ্যাপক বিবেক বাল্ড। ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় ডাউনটাউন ম্যানহাটানে বিএমসিসির ট্রাইবেকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি-আমেরিকানকে স্বাগত জানান ম্যানহাটান কমিউনিটি কলেজের ছাত্র নাবিল শাহ ও কিউনির এশিয়ান-আমেরিকান বিষয়ক অস্থায়ী পরিচালক সোনিয়া মুন্সি। তাদের বক্তব্যেই দৃশ্যমান হয় নতুন প্রজন্মের শেকড়ের সন্ধানের আকুতি। এরপরই ৮৪ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় পিনপতন নিরবতায়। এরপর প্যানেল আলোচনার সঞ্চালনা করেন নাদিয়া হোসাইন। প্যানেলিস্টরা ছিলেন বাঙালিদের কলম্বাস হিসেবে পরিচিত হাবিব উল্লাহর পুত্র আলাউদ্দিন উল্লাহ, অধ্যাপক বিবেক বাল্ড, কম্যুনিটির অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পরিচিত নাহার আলম, নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিলওম্যান শাহানা হানিফ, নাদিয়া আহমদ ও নেসার ভূঁইয়া।
মা-বাবার জীবন-কাহিনী সন্ধানের প্রসঙ্গ টেনে তথ্যচিত্রটির সহকারি পরিচালক আলাউদ্দিন উল্লাহ এ সময় বলেন, অনুষ্ঠানের ব্যাপক উপস্থিতি আমাকে অভিভূত করেছে। মনে করছি গোটা বাংলাদেশ এখানে। বিএমসিসির বি কে আমি বাংলাদেশ হিসেবে বিবৃত করতে চাই। নব্বইয়ের দশকে সিটির একটি অডিটরিয়ামের সামনে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সে সময় দেখি একজন নারী ফ্লায়ার বিতরণ করছেন। জানতে চাচ্ছেন আশে পাশে কোন নির্যাতিত নারীর তথ্য জানলে তা যেন সেই নারীকে জানানো হয়। এরপর আমি চলে যাই লসএঞ্জেলেসে। সেখানে অনেকে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করতে চায়। ক্ষেপে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করি, তোমার সাথে আমি কি কোন বাজে আচরণ করেছি? তাহলে এধরনের মনোভাব দেখাচ্ছো কেন? অভিনয়ের চরিত্রটিই নাকি ছিল সন্ত্রাসীর। আমি হলিউডের সেই পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি তা নিশ্চিত করেন। কিন্তু আমার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। কারণ আমি একজন মুসলিম আমেরিকান। ৯/১১ এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই সকল মুসলমানকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। উল্লাহ বলেন, সে সব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমি ভাবছিলাম বাংলাদেশী আমেরিকানদের নিয়ে একটি মুভি তৈরী করবো। সে সময়েই নিউইয়র্ক টাইমসে বিকের বাল্ডের আর্টিক্যাল দেখে তার সহযোগিতা চাই। কিন্তু মুভির জন্যে বিপুল অংকের ফান্ড ফাবো কোথায়? এ অবস্থায়ও থেমে থাকিনি। মার্কিন মুল্লুকে বাঙালির বসতির আদিকথাকে প্রাধান্য দিয়ে বহুজাতিক এ সমাজের বৈশিষ্টকে আরো মহিমান্বিত করতে বাঙালিরা কীভাবে শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ ঘটাচ্ছেন তাও উপস্থাপনের প্রয়াস রয়েছে এই তথ্যচিত্রে। উল্লাহ বলেন, আমার চেষ্টা ছিল বাবার ব্যপারে, কীভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন, তা সন্ধানের সময়েই মায়ের অস্তিত্ব আবিস্কৃত হয়। পরিচালক বিবেক বাল্ড বলেন, নব্বইয়ের দশকে আমি লন্ডনে বাঙালিসহ দক্ষিণ এশিয়ানদের জীবন-যাপন আলোকে ‘ট্যাক্সিওয়ালা’ মুভি তৈরী করি। দ্বিতীয় মুভি ছিল ব্রিটেনে বাংলাদেশি, পাকিস্তানী, ভারতীয় যুব সমাজের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ওপর। উল্লাহ ও সাথে এই তৃতীয় মুভি নির্মাণেও অর্থ সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে। নিজেরাই সংগ্রহ করেছি সব অর্থ। এ ধরনের জীবনধর্মী মুভি বানাতে সহজে কেউ ফাইন্যান্স করতে চান না। ‘ইন সার্চ অব বেঙ্গলি হারলেম’ মুভির প্রয়োজনে উল্লাহ বাংলাদেশে তার বাবার স্মৃতি বিজড়িত এলাকা ঘুরে এসেছেন।
মুভি নির্মাণের নেপথ্যে যে চেতনা কাজ করেছে তা সত্যি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন নিউইয়র্ক কম্যুনিটির নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী নাহার আলম। তিনি বলেন, হারলেমের মত একটি জায়গার জরাজীর্ণ ভবন থেকে বাবার বিবাহের সার্টিফিকেট উদ্ধার করেছেন আলাউদ্দিন উল্লাহ। তার মধ্যদিয়েই মায়ের অস্তিত্ব উদঘাটিত হয়েছে। নাহার আলম বলেন, একেবারেই বৈরি ও অপরিচিত সমাজেও হাবিব উল্লাহ সমাজবদ্ধ ছিলেন। ঐক্যবদ্ধ থেকেছেন গুটিকতোক সদস্য নিয়েও। এখন লাখো বাঙালির বসতি সত্বেও আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারছি না। এই মুভি থেকে সে প্রশ্ন আমার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে। তবে আলাউদ্দিন উল্লাহ মা শেষ জীবনে একেবারেই নি:সঙ্গ ছিলেন। কথা বলার কাউকে পাশে পাননি। তার শেষ জীবনের ১৬/১৭ বছর পাশে ছিলাম আমি। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী হিসেবে সেটি আমার দায়িত্ব হলেও স্বদেশীর ব্যাপারটি আমাকে তাড়িয়ে ফিরেছে তার জন্যে সর্বাত্মক সহযোগিতায়। একইসাথে আমাকে আলাউদ্দিন ও তার ভাই করিমের জন্যে কাউন্সেলিংও করতে হয়েছে। নাহার আলম বলেন, এ ধরনের মুভির মাধ্যমে বাঙালি কম্যুনিটি অনেক কিছু শিখতে পারবে বলে মনে করছি।
নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী এবং প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভ’ত কাউন্সিলওম্যান শাহানা হানিফ ধন্যবাদ জানিয়েছেন পরিচালক বিবক বাল্ড এবং আলাউদ্দিন উল্লাহকে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিকে বাঙালি কম্যুনিটির জন্যে এই মুভি নির্র্মাণের প্রয়াসটি সত্যি প্রশংসনীয়। কম্যুনিটিকে আজকের পর্যায়ে আসতে কতটা কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে-সেটিও মুভির দর্শকেরা অনুধাবনে সক্ষম হবেন এবং সেই আলোকে তারা ঐক্যবদ্ধ হবেন নিজের অধিকার আর মর্যাদার প্রশ্নে-এমন আশা পোষণ করেন শাহানা। তিনি বলেন, বাঙালিদের এগিয়ে চলার চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে অনেক বেশী মুভি, পুস্তক লেখা উচিত, যেগুলো পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এজন্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব রয়েছে-তা অস্বীকারের উপায় নেই। তবে সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ উঠাতে পারি তাহলে সব সমস্যার সমাধানের পথ সুগম হয়ে যাবে। শাহানা বলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করে আমেরিকায় বাঙালি সমাজের বসতির ধারাবিবরণীর ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে প্রথম একটি মভি। এজন্যে নির্মাতা-উদ্যোক্তাগণকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। কারণ, ইতিহাসের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত রাখতে এ ধরনের মুভির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।



