
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | ৭৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

হেনরি এ. কিসিঞ্জার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম রূপকার হেনরি এ. কিসিঞ্জার ২৯ নভেম্বর ১০০ বছর বয়সে কানেকটিকাট স্টেটে নিজ বাসায় মারা গেছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা নিশ্চিত করেছেন। বার্ধক্যজনিত না কি অন্য কোন জটিল রোগে মারা গেছেন তা উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জেরাল্ড ফোর্ড প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি-নির্ধারণে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তার। দুই প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর গত কয়েক দশক তিনি মার্কিন প্রশাসনের উপদেষ্টার পাশাপাশি সমসাময়িক নানা ইস্যুতে লেখালেখি করেছেন। আন্তর্জাতিক মুরব্বি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ঊর্ধ্বে রাখতে তার চেষ্টা সব সময় সরব ছিল।
নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা একজন ইহুদি অভিবাসী হিসেবে ডক্টর কিসিঞ্জার ১৯৩৮ সালে কিশোর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় খুব কম ইংরেজি বলতেন। কিন্তু হার্ভার্ড থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চতর ডিগ্রি পেতে তার কোনো কষ্ট হয়নি। নিজের প্রখর মেধাবলেই তিনি ইতিহাসে দক্ষতা প্রদর্শনে সক্ষম হন। হার্ভার্ড ফ্যাকাল্টি মেম্বারও হয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায়ই ওয়াশিংটন প্রশাসনের দৃষ্টি কাড়েন। উল্লেখ্য, একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া একমাত্র ব্যক্তি হিসাবে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর একটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা খুব কমই অন্য কারও ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রপতি না হয়েও হোয়াইট হাউসে ছিল তার বলিষ্ঠ প্রভাব। তিনি এবং ভিয়েতনামের লে ডুক থো গোপন আলোচনার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছিলেন যা ১৯৭৩ সালের প্যারিস চুক্তি তৈরি করেছিল এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের অবসান ঘটায়। ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর তার বিখ্যাত ‘শাটল কূটনীতি’ ইসরায়েল এবং তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছিল। চীনে নিক্সনের ঐতিহাসিক সফর এবং তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ডিটেনটের তাত্ত্বিক হিসেবে, ডক্টর কিসিঞ্জার সিসমিক নীতি পরিবর্তনের জন্য অনেক কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন যা বিশ্ব পরিমন্ডলের গতিপথকে পুনঃনির্দেশিত করেছিল। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নিক্সন প্রশাসনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সম্পর্কেও উদ্ভট মন্তব্য করেছিলেন। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে অভিহিত করার মন্তব্যটি এখনো ইতিহাসের পরতে পরতে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। কথায় কথায় তা ধ্বনিত হয় বাঙালি সমাজের সীমানা ছাড়িয়ে সুধীজনের সমাবেশেও। চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতির সুরে এখনো কিসিঞ্জারের নীতি অনুরণিত হয়। বলা হয়, আনোয়ার সাদাত, মাও সে তং, রিচার্ড নিক্সন আর বাদশাহ ফয়সালের পররাষ্ট্র নীতিতেও তার প্রভাব ছিল। তুখোড় রাজনৈতিক মেধা আর ক‚টনৈতিক সাফল্যের জন্য নিজের দেশে কিসিঞ্জার যতটা সমাদৃত, বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ-সংঘাতের ‘কারিগর’ হিসেবে ছিলেন ততটাই নিন্দিত। কিসিঞ্জারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছেন, পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ‘সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বকে’ হারালো যুক্তরাষ্ট্র।



