
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | ৩০৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দুবাই : শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদানের জন্যে বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির চ্যান্সেলর ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ এবং ট্রেজারার ফারহানা হানিপকে। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
১২ দেশের এনআরবি বিজনেসম্যানদের নিয়ে দুবাইতে তিনদিনের গ্লোবাল বিজনেস কনফারেন্স’ সম্পন্ন হলো রবিবার ২৪ ডিসেম্বর। ডাউনটাউনে মিলেনিয়াম প্লাজা হোটেলে আলো ঝলমল বলরুমে এই কনফারেন্সে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণ, উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, স্মার্ট বাংলাদেশ গঠন ও সরকারের ২০৪১ সালের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বাংলাদেশের শিক্ষাখাত, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্কিল ডেভেলপ বিষয়ে একাধিক মতবিনিময় হওয়ার কথা থাকলেও অংশগ্রহণকারীর প্রায় সবাই ‘শেখ হাসিনার উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় খুশি নন’-এমন রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন হওয়ায় আয়োজকদের অভিসন্ধি পূরণ হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
এতে বক্তব্য-বিবৃতি আর ক্রেস্ট প্রদানের পাশাপাশি নৌ-বিলাসের ব্যাপারটিও ছিল। নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত/সমালোচিত কয়েকজন ছিলেন। এর মধ্যে ফেডারেল ক্রিমিনাল হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত একজনকেও দেখা গেছে। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দুবাইয়ের শেখ ড. জুমা মাদানি। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি বিজনেস আইকনদের এই মহাসম্মেলনে দেখে আমি সত্যিই অভিভ‚ত। তিনি বাংলাদেশি বিজনেসম্যানদের দুবাইতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। তিনি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সাহায্য করবেন বলেও ঘোষণা দেন। উদ্বোধনী দিবসের প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুবাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মুহাম্মদ আবু জাফর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা যদি দেশে বিনিয়োগে বেশি বেশি আগ্রহ দেখান, তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের টাকার ভারসাম্যকে কমিয়ে আনতে স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিকল্প নেই। এনআরবিরা এগিয়ে এলে এই ভারসাম্য অনেক কমে আসবে।
বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে জর্জিয়া স্টেটের সিনেটর শেখ রহমান বলেন, এটি বিজয়ের মাস। বাংলাদেশ জন্ম না হলে আমিও আজকে ইউএসএ’র সিনেটর হতে পারতাম না। তিনি আরও বলেন, আমাদের উচিত আমাদের নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া। তবে তারা আমাদের সবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক ফয়সাল চৌধুরী বলেন, স্বপ্নটাকে বড় করে দেখতে হবে, তবেই তা আমাদের ধরা দেবে। আমাদের দেশের রাজনীতি প্রবাসে আমাদের বিভক্ত করেছে। আমাদের উচিত আমরা যেখানে বসবাস করি, সেই দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া, তবেই দেশ উপকৃত হবে। কোডাস্ট ট্রাস্টের কর্ণধার আজিজ আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের মাতৃভ‚মির সঙ্গে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। সবাই এগিয়ে আসলেই এই সংগঠনটি এগিয়ে যাবে। সেক্রেটারি জেনারেল (এনআরবি ওয়ার্ল্ড) মোহাম্মদ আইয়ুব আলী তার বক্তব্যে সরকারের কাছে বৈধ পথে টাকা পাঠাতে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে একটি সুষ্ঠু চ্যানেল তৈরি করার অনুরোধ জানান। দুবাই সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ড. ইসমাঈল বোয়ালহাউস বলেন, দুবাই হচ্ছে পৃথিবীর ইনভেস্টমেন্ট রাজধানী। আমাদের সরকার দুবাইতে সবাইকে বিজনেস করতে সহযোগিতা করে থাকে। যে কেউ ইচ্ছা করলেই কম খরচে দুবাইতে বিজনেস শুরু করতে পারেন। এই কনফারেন্সের অন্যতম সহযোগিতায় ছিল জিএফবি এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার গোলাম ফারুক ভূইয়া এবং ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন কনফারেন্সে। তারা প্রবাসীদের আন্তরিক অর্থে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এবং সেই পরিবেশ অবারিত করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সম্মেলনে নিজের উদ্ভাবন-অভিজ্ঞতার আলোকে বক্তব্যকালে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সিইও এবং চ্যান্সেলর ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ বলেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার স্থলে আমার ইউনিভার্সিটিতে কোর্স দেয়া হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতাকেও পরিপুষ্ট করতে। এর ফলে ডিগ্রি গ্রহণের পরই তারা সিনিয়র স্কেলে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। এই ব্যবস্থা অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করলে সকলেই উপকৃত হবেন। দীর্ঘ দুই দশকের অধিক সময় মার্কিন আইটি সেক্টরে ফাইভ ডিজিটের বেতনের চাকরি পাইয়ে দেয়ার মত কোর্স প্রদানকারি ‘পিপল অ্যান্ড টেক ইন্সটিটিউটে’র প্রতিষ্ঠাতা এই চ্যান্সেলর হানিপ উল্লেখ করেন, আমরা শিক্ষা দিচ্ছি ট্রিপল মডেলে। এগুলো হচ্ছে ডিগ্রি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং জব। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সকল বিশ্ববিদালয় থেকে ডিগ্রি গ্রহণের পর চাকরিতে ঢুকতে হচ্ছে এ্যান্ট্রি লেবেলে। ফলে তাদেরকে সিনিয়রিটি অর্জনের জন্যে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। আমার ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা চাকরিতে নিয়োগের সময়েই তা অর্জন করছেন। ইঞ্জিনিয়ার হানিপ বাংলাদেশের ভার্সিটিসমূহেও এমন ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে আমার ইউনিভার্সিটি সর্বাত্মক সহায়তা দেবে। উল্লেখ্য, অভিনব এই পন্থার অন্যতম সহযোগী হিসেবে এই সামিটে চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপের সাথে ট্রেজারার ফারহানা হানিপকেও বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয় বিপুল করতালির মধ্যে।
দ্বিতীয় দিন প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন গ্লোবাল এনআরবি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যবসায়ী ড. কালি প্রদীপ চোধুরী। অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ডাইরেক্টর জেনারেল আবুল হায়াত নুরুজজামান, আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (এবিসিসিআই) সভাপতি বিএনপি নেতা গিয়াস আহমেদ, সিঙ্গাপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাহিদুজজামান, এম ডি এস ইসলাম নান্নু (জাপান), ব্রিটিশ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (সামারসেট) সভাপতি করিম মিয়া শামিম, অ্যাকাউন্ট্যাট নোমান রোহিদ, জাপান চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের ডা. শেখ আলীমুজ্জামান, অস্ট্রেলিয়া চেম্বার অব কমার্সের জাফর হায়দার, বাংলাদেশ ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী।
সমাপনী দিবসের প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কালী প্রদীপ চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে গ্লোবাল এনআরবি বাংলাদেশি বিজনেসম্যানদের দেখে আমি সত্যিই আনন্দিত হয়েছি। আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান থাকলে সারা বিশ্বেই আমরা ব্যবসা করতে পারব। তিনি অরগানাইজারদের ধন্যবাদ জানান। আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, বহির্বিশ্বে আমাদের অর্জন অনেক। আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরাও ভালো ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে, ভালো চাকরি এবং বিজনেস করছে। কিন্তু বাংলাদেশের হিউম্যান রাইটস লংঘন, বিরোধী রাজনীতিকদের হত্যা, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাবে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দুর্নাম প্রবাসীদের মানসম্মান ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। গিয়াস আহমেদ সরকারের সমালোচনা করে আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই। গ্লোবাল বিজনেস কনফারেন্সে এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ শাহিদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পরিবেশ নেই। সম্মেলনের অতিথিদের আতিথেয়তায় ছিলেন আল হারমাইন পারফিউম গ্রুপ-এর এমডি মাহতাবুর রহমান নাসের। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিলেন আল মাতিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান জুমা মাদানি, গোল্ডেন এইজ হোমকেয়ারের মালিক শাহ নেওয়াজ, এনআরবি ওয়ার্ল্ডের সেক্রেটারি আইয়ুব আলী বাবুল, বিজনেস আমেরিকার এডিটর এনামুল হক এনাম। এতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী ও কূটনীতিকসহ বিভিন্ন সেক্টরের ১২০ জনকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় দিন জনপ্রিয় শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। সম্মেলন শেষে মাহতাবুর রহমানের বাসভবনে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। শেষ দিনে সমুদ্র ভ্রমণের মাধ্যমে সম্মেলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।



