Advertisement Placeholder
এফবিআইর তদন্তে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি দুর্বৃত্তচক্র

অপহরণ-যৌণ নির্যাতন-মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর তথ্য : গ্রেফতার ২ যুবতীসহ ৬

বিশেষ সংবাদদাতা   |   শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ৩১২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

অপহরণ-যৌণ নির্যাতন-মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর তথ্য : গ্রেফতার ২ যুবতীসহ ৬

এফবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার (বাম থেকে) আঞ্জু খান, সৈয়দ রুবেল, আবু চৌধুরী এবং সাহেদ আলম। ছবি-সংগ্রহ।

ধাক্কা ব্যবসা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, রিয়েল এস্টেট প্রতারণা, অন্যের গোপন তথ্য চুরি করে ব্যাংক-বীমার সাথে প্রতারণা, রিয়েল এস্টেট ব্রোকারের টোপ দিয়ে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেয়া, মাদক ব্যবসা এবং মাদকাসক্ত করে প্রতিপক্ষকে মৃত্যুর মুখে পতিত করা, কাগজপত্রহীন প্রবাসীদের গ্রীণকার্ডের টোপ দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদির পর নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিরুদ্ধে অপহরণ, ধর্ষণ, যৌণ হামলা, মুক্তিপণ আদায়ে লিপ্ত থাকার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। গতবছর একজনকে অপহরণের মামলায় জামিনে থাকা স্বামী-স্ত্রী আরেক প্রবাসীকে অপহরণের মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। এরা হলেন জ্যামাইকার আবু চৌধুরী (৩৪) এবং তার স্ত্রী ইফফাত লুবনা (২৪)। ১১ জানুয়ারি ব্রুকলীন ফেডারেল কোর্টে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, অপহৃতদের নির্যাতন, যৌন হামলার অভিযোগ গঠনের সময় এই দম্পতির পূর্বেকার জামিনের আদেশ বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে। একইদিন এসব গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয় সুলতানা রাজিয়া, সৈয়দ রুবেল আহমেদ (৪৩), সাহেদ আলম (২৯) এবং আঞ্জু খান (২৮)কে। এরমধ্যে ৫০ হাজার ডলার বন্ডে সুলতানা রাজিয়া, লাখ ডলার বন্ডে সৈয়দ রুবেল আহমেদ জামিনে মুক্তি পেলেও সাহেদ আলম এবং আঞ্জু খানকে ডিটেনশনে রাখা হয়েছে। ব্রুকলীনে অবস্থিত ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট ইউএস এটর্নী ব্রিয়ন পিস, নিউইয়র্কস্থ এফবিআইয়ের সহকারি পরিচালক জেমস স্মীথ, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কমিশনার এডোয়ার্ড এ ক্যাবানের অফিস থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গ্রেফতারকৃতদের ব্রুকলীন ফেডারেল কোর্টে বিচারপতি যোসেফ এ মারোটুলোর এজলাশে হাজির করা হয়েছিল। এই চক্রের অপর সদস্যকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তারপরই সকলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হবে বলে আদালত সূত্রে ১৭ জানুয়ারি জানা গেছে। আরো জানা গেছে, এই দুর্বৃত্ত চক্র উপরোক্ত ক্রাইমের পাশাপাশি নিজ নিজ ব্যবসা (?)র আড়ালে জালিয়াতি-প্রতারণার ফাঁদও পেতেছেন বেশ ক’বছর যাবত। নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকায় উদিয়মান কম্যুনিটি হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি লাভের অধ্যায়ে এফবিআই কর্তৃক এই চক্রের হদিস উদঘাটিত হওয়ায় অনেকে হতভম্ব এবং ক্ষুব্ধ।
মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপনকালে ইউএস এটর্নী পিস বলেন, অভিযোগ অনুসারে গ্রেফতারকৃতরা অপহরনের পর ভিকটিমকে নির্মমভাবে শারীরিক ও যৌণ নির্যাতন করেছে। আরো কেই যদি এই দুর্বৃত্ত চক্রের ভিকটিম হয়ে থাকেন, তাহলে স্টেট এটর্নী অফিসের ওয়েবসাইটে (https://www.justice.gov/usao-edny/report-crime ) গিয়ে অভিযোগ সাবমিটের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, গত বছরের ২৭ মার্চ কুইন্সের জ্যামাইকা থেকে এক প্রবাসীকে অপহরণের পর প্রায় ১৪ ঘন্টা অকথ্যভাবে নির্যাতন করেছে। জ্যামাইকার ১৮১ স্ট্রিট এবং হিলসাইড এভিনিউ এলাকায় এক ব্যক্তি হাটাহাটি করার সময় আবু চৌধুরী তাকে তার হোন্ডা মিনিভ্যানে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। মিনিভ্যানে অপহৃতকে প্রহার করে। এক পর্যায়ে ভিকটিমকে মিনিভ্যান থেকে নেমে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়াতে বাধ্য করে এবং সেই ছবি উঠায় আইফোনে। এমন অসভ্য আচরণের সাথে জড়িত ছিল আহমেদ, আলম, খান এবং রাজিয়া। তারা সেলফোনে আবু চৌধুরীর সাথে কানেক্ট থেকে ভিকটিমকে নির্যাতনের মজা শেয়ার করেছে। এক পর্যায়ে তারা মিনিভ্যানেও উঠেছে। আর এমন বর্বরতা চলে রাতভর মিনিভ্যান চালানো অবস্থায়। নির্দয় আচরণে অতীষ্ঠ ভিকটিম পানি পান করতে চাইলে এই দুর্বৃত্ত চক্র তাকে চেতনানাশক মিশ্রিত পানি দেয় এবং তা পানের পর ভিকটিম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এর পরদিন জ্ঞান ফিরলে ভিকটিম নিজেকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে দেখতে পান। অপহরণের আরেকটি ঘটনা গত বছর ১১ মে কুইন্সেরই উডসাইড এলাকায় ঘটেছে। উডসাইডে ৭২ স্ট্রিট এবং ব্রডওয়ে এলাকায় ভিকটিম গিয়েছিলেন লুবনার সাথে সাক্ষাতের জন্যে। এমনি অবস্থায় আবু চৌধুরী তাকে জোরপূর্বক একটি মিনিভ্যানে তুলে মারধোর শুরু করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাকে একটি হোটেলে নেয়া হয়। হোটেল কক্ষে ভিকটিমকে আবু চৌধুরী যৌণ হয়রানি করে। সে সময় ভিকটিমের বাবাকে ফোন করে ২০ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করে আবু চৌধুরী। এ সময় ভিকটিমের বাবাকে সতর্ক করা হয় যে, ঘটনাটি পুলিশকে জানানো হলে ছেলেকে তো পাবেই না, তাকেও হত্যা করা হবে। এরপর অবশ্য মুক্তিপণের জন্যে আর ফোন করা হয়নি। অপহরনের তিনদিন পর ভিকটিমকে বেঁধে জ্যামাইকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেলে দেয়া হয়। মৃত্যুপথযাত্রী ভিকটিম দাঁত দিয়ে দড়ি কেটে হাত মুক্ত করার পর জানালা ভেঙ্গে এবং পাশের বাসিন্দাদের ৯১১ এ কল করতে বলে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কম্যুনিটি সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ, নির্যাতন, যৌণ হামলা এবং মুক্তিপণ আদায়ের সংঘবদ্ধ এই চক্রের ব্যাপারে আরো তদন্ত হলে গত কয়েক বছরে কুইন্স এলাকায় মাদকাসক্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারি (যারা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে প্রচার করা হয়েছে) বেশ কজন যুবকের ব্যাপারেও চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হতে পারে। অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার অর্থ হবে আরো যুবকের সর্বনাশের পথ সুগম রাখা। মৃত্যুবরণকারি যুবকদের অভিভাবকেরাও সমাজ-চক্ষুর লজ্জায় প্রকৃত সত্য গোপন রেখেছেন বলে সে সময়ে গণমাধ্যমেও মতামত প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট এটর্নীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ/আবেদন না জানানোর ফলে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গৃহিত হয়নি। শুধু তাই নয়, করোনাকালিন নানা সুবিধা প্রতারণামূলকভাবে গ্রহণ করে কেউ কেউ কম্যুনিটিতে দাপট দেখাচ্ছেন। এমনও ঘটনা আছে, বেসমেন্টের একটি কক্ষে ১৯/২০টি কর্পোরেশন দেখিয়েও লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, গুরুতর অপরাধের মামলায় জেল খাটান ব্যক্তিরাও এখন কম্যুনিটির সর্দার সেজে নানা অনুষ্ঠানে অতিথির আসন গ্রহণেও দ্বিধা করছে না। এমনকি, স্টেট গভর্ণর, সিটি মেয়র, সিনেটর-কংগ্রেসম্যানদের তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানেও তাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ পুরনো অপরাধ ঢেকে নয়া ফন্দি এঁটে আরো বড় ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। যেমন জ্যামাইকার গ্যাং লিডার হিসেবে পরিচিত আবু চৌধুরীর ক্ষেত্রে দেখা গেল। একটি মামলায় জামিনে থাকাবস্থায় আরেকটি অপহরণ পরিক্রমায় লিপ্ত হয়েছে বলে উপরোক্ত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার