
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | প্রিন্ট | ১৬৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ভাষা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কের সমাবেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি-নৃত্যে বাফার শিল্পীরা। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
বাঙালি সংস্কৃতির ফল্গুধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জাগ্রত রাখার অভিপ্রায়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরব থাকার সংকল্পে আমেরিকায় মহান একুশে তথা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উদযাপন করলেন প্রবাসী বাঙালিরা। বাংলাদেশে একুশের প্রথম প্রহরে সাথে মিলিয়ে জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে মঙ্গলবার বেলা ঠিক একটা এক মিনিটে মুক্তধারা নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্যদিয়ে শহীদ দিবস উদযাপনের কর্মসূচি শুরু হয়। গত ৩৩ বছর ধরে নিউইয়র্কস্থ মুক্তধারা ও বাঙালি চেতনামঞ্চ যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালন করছে। এবারও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল নাজমুল হুদা, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা এম ফজলুর রহমানসহ বিশিষ্টজনেরা ভাষা আন্দোলনের আলোকে বক্তব্য দেন।
সন্ধ্যা থেকে একুশের প্রথম প্রহর পর্যন্ত নিউইয়র্কস্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে অর্ধ শতাধিক সংগঠনের অংশগ্রহণে কুইন্স প্যালেস, বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্বে শ’খানেক সংগঠনের অংশগ্রহণে তিব্বত কম্যুনিটি সেন্টার, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের উদ্যোগে জ্যাকসন হাইটসে নবান্ন পার্টি সেন্টারে, জেবিবিএর উদ্যোগে ডাইভার্সিটি প্লাজা এবং ব্রঙ্কসের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু সংগঠনের ব্যানারে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে একুশের গানসহ ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। প্রতিটি কর্মসূচিতেই নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মত।
একুশের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণকারি সংগঠনের অন্যতম ছিল আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখা, জেবিবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন, ইউএসএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন, বিপা, বাফা, বহ্নিশিখা সঙ্গীত নিকেতন, বাপা, অনুপদাস ড্যান্স একাডেমি, বাংলাদেশ বেদান্ত সোসাইটি, বাংলাদেশ ল’ এসোসিয়েশন, শ্রীকৃষ্ণ ভক্তসংঘ, ইউনাইটেড হিন্দুজ অব ইউএসএ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি, রবীন্দ্র একাডেমি, নীলা ড্যান্স একাডেমি, কুমিল্লা সোসাইটি, জাসদ, বঙ্গমাতা পরিষদ, মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর এসোসিয়েশন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, জালালাবাদ এসোসিয়েশন, কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সোসাইটি, গ্রীণটাচ, বরিশাল বিভাগীয় সোসাইটি প্রভৃতি সংগঠন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত কুইন্স প্যালেস এবং জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের সমাবেশে বক্তব্যকালে বলেছেন, বায়ান্নর একুশে ফেব্রæয়ারির আগেও আমরা ভাষা দিবস পালন করতাম। সেটি ছিল ১১ মার্চ। ১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, তখোন থেকেই কিন্তু পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠি সরব হয়েছিলেন যে, পাকিস্তানের প্রধান ভাষা কোনটি হবে, রাষ্ট্রভাষা কী হবে। তখোন ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস পার্টি থেকে গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের প্রস্তাব আনলেন যে, উর্দূ এবং ইংরেজী ছাড়াও পাকিস্তানের প্রধান আরেকটি ভাষা যেন বাংলা হয়। এই প্রস্তাব নিয়ে তুমুল হট্টগোল হয় জাতীয় পরিষদে। কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে তমদ্দুন মজলিস, পূর্ববাংলা মুসলিম ছাত্রলীগসহ কয়েকটি সংগঠন মিলে একটি হরতাল ডাকে। সেই হরতালের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও গ্রেফতার হন এবং কারাগারে রাখা হয়। সেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনে তথা রাজনৈতিক জীবনের প্রথম কারাবরণ। পরবর্তীতে ১৯৪৯, ১৯৫০ এবং ১৯৫১-এই তিন বছরই ১১ মার্চে হরতাল পালিত হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত মুহিত বলেন, আমাদের সূর্যসন্তান, আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেন ভাষার জন্যে আত্মত্যাগ করেছেন। এটা কী শুধুই আত্মগরিমার জন্য, অহংবোধের জন্য? এটা হয়তো সত্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের স্কীয়তা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র রক্ষার জন্য। এক্ষেত্রে আমি ভাষাকে তুলনা করতে চাই উর্বর মাটির সাথে। মাটিতে একটি গাছ হয়, সেই মাটি থেকে গাছটি পুষ্টি সংগ্রহ করে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দেয়, এবং ফুল-ফল ফলায়।
আমাদের ভাষাও তেমনি একটি বিষয়, যা পূর্বপুরুষেরা অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিলেন। একটি জাতিকে অথবা জাতিস্বত্তাকে হত্যার জন্যে তার যে মূল বাহন সেই ভাষাকে নি:শেষ করতে হবে। সেটি ওনারা হতে দেননি। এবং একুশে ফেব্রুয়ারি একটা বহুমাত্রিক অধ্যায়। আমাদের ইতিহাসে, বাঙালির ইতিহাসে অন্যতম প্রধান শ্রেষ্ঠ ঘটনাকে যদি আমাদের স্বাধীনতা দিবসকে বলি, তাহলে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারির কাছে যেতেই হবে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্ম মর্যাদার অধিকারের সংগ্রামের সূচনা ছিল। এবং একুশে ফেব্রুয়ারি থেকেই বস্তুত মানসিকভাবে আমরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই একুশে ফেব্রুয়ারির বহুমাত্রিক অভিধা রয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে।
মুক্তধারা ও বাঙালি চেতনামঞ্চের অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এম ফজলুর রহমান বলেন, ভাষা শহীদদের রক্তদানের সগ্রামের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুচিন্তিত নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছি বাঙালিরা। তবে সেই স্বাধীনতার বিরোধীরা এখনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত থেকেই সকল ষড়যন্ত্র নস্যাত করতে হবে।



