বুধবার ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. রেজা কিবরিয়া

এখনো সময় আছে অর্থনীতির বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০২২ | প্রিন্ট  

এখনো সময় আছে অর্থনীতির বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার

ড. রেজা কিবরিয়া।

বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড থেকে প্রথম শ্রেণিতে ব্যাচলর করার পর কানাডার কুইন্স থেকে এমএ ও অর্থনীতিতে এমফিল, এরপর আবারো অক্সফোর্ড থেকে অর্থনীতিতে ডিফিল সম্পন্নকারী ড. রেজা কিবরিয়া ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত আইএমএফে অর্থনীতিবিদ হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত এই চাকরির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করেছিলেন। একইসঙ্গে জাতিসংঘ, এডিবি, বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতি-গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সুশাসনের ওপর বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সমন্বয়কারী এবং প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। এ ধরনের বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষপদে ৩২ বছরের কর্মাভিজ্ঞতায় সিক্ত রেজা কিবরিয়া বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল ‘গণঅধিকার পরিষদ’র আহবায়ক। যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন অত্যন্ত নীরবে। সাংগঠনিক কাঠামো থাকা সত্বেও কর্মীদের নিয়ে কোনো বৈঠকে মিলিত না হওয়ায় সুধীজনে তাঁর এই সফর নিয়ে কৌতূহলের অন্তত নেই। বস্টনের উদ্দেশ্যে বাল্টিমোর ত্যাগের প্রাক্কালে ১৫ জুলাই দুপুরে টেলিফোনে নেওয়া হয় এ সাক্ষাৎকার। এখানে তা প্রশ্নোত্তর আকারে উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন: কবে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রে?
উত্তর : ২৯ জুন নিউইয়র্কে এসেছি। শিগগিরই ফিরে যাবো।
প্রশ্ন : এবারের সফর কি সাংগঠনিক?
উত্তর: না, এবার ব্যক্তিগত কারণে এসেছি। চিকিৎসার ব্যাপারটিও রয়েছে।
প্রশ্ন : সামনের বছর বাংলাদেশে নির্বাচন। তা নিয়ে কারো সঙ্গে কি কোনো বৈঠক হয়েছে বা হবার সম্ভাবনা রয়েছে? যেহেতু দীর্ঘদিন আপনি আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন, সেই সুবাদে মার্কিন রাজনীতিক অথবা বাইডেন প্রশাসনে সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে কি?
উত্তর : না, এবার ঠিক ওই ধরনের বৈঠক হয়নি। তবে কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমি যেখানে যেখানে গত কদিন ছিলাম। একটি লাঞ্চেও গেছি। সেটিও আনুষ্ঠানিক ছিল না।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিও উঠেছে কোনো কোনো মহল থেকে। তা নিয়ে আপনি কী পুরনো মার্কিন বন্ধু, পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলেছেন? অথবা আরো যে কদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন, সে সময়ে কোনো কথাবার্তার সম্ভাবনা আছে কি?
উত্তর : যার বা যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি বা আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠকেও যাইনি।
প্রশ্ন : যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা কোনো পর্যায়ের? ক্যাপিটল হিল, স্টেট ডিপার্টমেন্ট অথবা হোয়াইট হাউস কানেকটেড?
উত্তর : না, এবার ওই ধরনের মিটিংয়ের অ্যারেঞ্জ করতে পারিনি। আগে তাদের কারোর কাছে রিচ করতেও পারিনি। যুক্তরাষ্ট্রে এসে দেখছি যে, সবাই ছুটিতে আছেন। সাধারণত যাদের সঙ্গে আগে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে বা করেছি, তার অধিকাংশই এখন ছুটিতে।
প্রশ্ন : আপনি গণফোরামে ছিলেন। তারপর গণঅধিকার পরিষদ গঠন করে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন।
উত্তর : আমার আব্বাকে গ্রেনেড হামলায় হত্যার পর অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। দু’বছর বিএনপি, তারপর আরো দু’বছর কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতায় ছিল। টানা প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাবার হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে সঠিক তদন্ত করতে চাইছে না। আব্বাকে হত্যার পর ওই আসনে আমি যদি চাইতাম তাহলে খুব সহজেই এমপি হতে পারতাম। স্বতন্ত্র অথবা অন্য কোনো দল থেকে চেষ্টা করলেও জিততে পারতাম। ওই সময়ে আমাকে হারানোর মত কারো অধিকার ছিল না।
প্রশ্ন : আপনার কেন মনে হয় যে, আওয়ামী লীগ আপনার বাবার হত্যাকারীদের শনাক্ত এবং বিচারে সোপর্দ করতে চাইছে না?
উত্তর : বিএনপি আর কেয়ারটেকার সরকারের চার বছর আব্বাকে হত্যার মোটিভ উদঘাটন করতে পারেনি। তারপর টানা ১৪ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আমি পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করেছি, জেনেছি যে, রাজনৈতিক প্রভাবে তারা তাদের তদন্ত সীমিত করেছেন। আওয়ামী লীগ কেন এ তদন্ত ব্লক করবে-তা চিন্তা করতে হবে। এটা জটিল কোনো জিনিস নয় কিংবা কঠিন কোনো হিসাবও নয়।
প্রশ্ন : এখন তো আপনি নিজেই একটি সংগঠনের প্রধান। সামনের বছরের নির্বাচনে আপনার সংগঠন অংশগ্রহণের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
উত্তর : হ্যাঁ, আমরা অংশগ্রহণ করবো। ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব। কিন্তু শেখ হাসিনা ওয়াজেদের অধীনে আমরা কোনো নির্বাচনে যাবো না। আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবো না। কারণ এটা প্রমাণিত যে, তারা ভোট চোর। তাই তাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
প্রশ্ন : তাহলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে চান নির্বাচনে যাবার পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে।
উত্তর : একটি আন্দোলনের মাধ্যমে সেই দাবিটা মানুষের সামনে তুলতে হবে। যেভাবে সব আন্দোলন হয় সেভাবেই এ দাবি আদায়ের আন্দোলনও হবে।
প্রশ্ন : আন্দোলন কী এককভাবে করার পরিকল্পনা নিয়েছেন, নাকি সমমনা দলগুলো জোট বেঁধে আন্দোলনে যেতে চাইছেন? যদি জোটবদ্ধ হয়েই আন্দোলনের আগ্রহ থাকে, তাহলে ঐসব দলের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে কিনা।
উত্তর : আওয়ামী লীগ ছাড়া সব দলের সঙ্গেই আমার কথাবার্তা হয়। যারা গণতন্ত্র চায় এবং যারা এই অসৎ, খুনি এবং ভোটচোর সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সঙ্গেই আমরা যোগাযোগ রাখি এবং আমি বলবো যে, আমরা যুগপৎভাবে আন্দোলন করবো। এক প্ল্যাটফর্মে না হলেও আমরা একইসঙ্গে আন্দোলন রচনা করবো। একইমঞ্চে আন্দোলন হবে-এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবো-এই একটি দাবিতে আন্দোলন হবে। এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না-এজন্যে নির্বাচনে যেতে চাই না।
প্রশ্ন : ঐক্যবদ্ধ অথবা যুগপৎ-যাই বলুন, সেই আন্দোলনের জন্যে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা কী শীঘ্রই হচ্ছে?
উত্তর : ২০১৮ সালের মত নকল নির্বাচন আমরা চাই না। তাই পরিস্থিতি নিশ্চয়ই পাল্টাবে সময়ের সঙ্গে। আসল নির্বাচনের পরিস্থিতি হলেই আমরা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করবো। এখন প্রি-ম্যাচুরড।
প্রশ্ন : অনানুষ্ঠানিকভাবে এ যাবৎ যাদের সঙ্গেই দেখা-সাক্ষাৎ অথবা কথা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের মনোভাব কেমন?
উত্তর : আমার মনে হয় যে, আপনি যদি খেয়াল করেন, একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসম্যান জেমি রাস্কিন (হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির সদস্য এবং সিভিল রাইটস ও সিভিল লিবার্টিজ সাব কমিটির চেয়ারম্যান) কংগ্রেসে বাংলাদেশ সম্পর্কে ক্রিটিক্যাল স্টেটমেন্ট করেছেন গণতন্ত্রের পক্ষে। আমি মনে করি আমেরিকান সরকার, জনপ্রতিনিধি যারা আছেন তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরত আসার জন্যে তারা তাদের মতামত জানিয়েছেন। তারা কী চায় সেটিই উপস্থাপিত হয়েছে রাস্কিনের বিবৃতিতে। অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকার আর চাচ্ছে না। এটা কিন্তু এখন ক্লিয়ার।
প্রশ্ন : ওনার সঙ্গে তো নিশ্চয়ই আপনার দেখা হয়নি।
উত্তর : না।
প্রশ্ন : যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের অবস্থানটা কি। তারা কংগ্রেসের, নাকি স্টেট ডিপার্টমেন্টের অথবা হোয়াইট হাউসের? তাদের মনোভাব কেমন?
উত্তর : তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। আমাদের দেশের গণতন্ত্র উদ্ধার করার দায়িত্ব তো তাদের নয়, এটা মনে করাও উচিত নয়। এ দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের দেশের জনগণের। তবে তারা এটা চায় এবং সাপোর্ট করে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হলে, তা পুরো রিজিয়নের জন্যেই একটি ইতিবাচক হবে বলে তারা মনে করেন। সব দেশই চায় তাদের মত গণতান্ত্রিক সরকার সব দেশে থাকুক-এটাকে তারা স্বাগত জানাতে চায়। চীন চায় তাদের মত একটি ডিকটেটরশিপ থাকুক, রাশিয়া চায় তার অনুগত একটি ডিকটেটরশিপ থাকুক। আমেরিকা চায়, তার মত একটি গণতান্ত্রিক অবকাঠামো থাকুক, যেন রাজনীতিটা সহজ হয়।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অবকাঠামো তৈরির জন্যে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে কোনো দলকে সবচেয়ে যোগ্য বলে মনে হয় আপনার কাছে। যেহেতু আপনার নিজের দলের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও তেমন শক্তিশালী নয়।
উত্তর : আমাদের (গণঅধিকার পরিষদ) হয়তো এখনও তেমন কাঠামো তৈরি হয়নি, সাংগঠনিক নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হয়নি। তবে একটি জরিপ চালালে দেখা যাবে যে গণঅধিকার পরিষদ প্রথম দিকেই আছে। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন নেই বললেই চলে। আমার মনে হয় না যে, নিরপেক্ষভাবে ভোট হলে আওয়ামী লীগ ১০ শতাংশের বেশী আসন পাবে। তবে অন্যসব দল আছে আসল গণতন্ত্র তারা তৈরি করবে, যেখানে বিরোধী দলের কথা বলা এবং কাজ করার একটা সুযোগ থাকবে। যেখানে লক্ষ লক্ষ লোকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হবে না। যেখানে হাজার হাজার মানুষকে জেলে নেয়া হবে না। প্রত্যেক মাসে শতশত মানুষকে গুম-হত্যা করা হবে না, যেখানে টর্চারে মানুষ মারা যাবে না, রাজনৈতিক সমাবেশ করতে চাইলেই আক্রমণের শিকার হবে না। অন্যধরনের গণতন্ত্র। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। এটা স্বৈরতান্ত্রিক সরকার। আগে যেমন ছিল, স্বাধীনতার পরই যেমন অগণতান্ত্রিক হয়েছিল, এবারও তাই হয়েছে। আসলে আওয়ামী লীগ একটি জেনুইন গণতান্ত্রিক দল নয়-এটা দেশের মানুষের কাছে প্রমাণিত সত্য।
প্রশ্ন : তাহলে আপনার দল ছাড়া বিকল্প কোনোটি?
উত্তর : আমাদের দলই বিকল্প। এদেশের সামগ্রিক কল্যাণে আমরা দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। উন্নয়নের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন ঘটাতে চাই আমরা। মূলকথা হচ্ছে, আমরা সাধারণ মানুষের জন্যে কাজ করবো। এই দেশটা যে এখন কয়েকটি পরিবার লুট করছে, সেই পরিবারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হবে এবং জনগণের পক্ষে বাজেট তৈরি করা হবে। জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা হবে।
প্রশ্ন : পরিবারকেন্দ্রিক লুটতরাজের অভিযোগ বিএনপি-জামায়াত জোট আমলেও ছিল। এমন একটি পরিস্থিতিকে কীভাবে হ্যান্ডেল করবেন যদি নিরপেক্ষ (আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী) নির্বাচনে আপনার দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়?
উত্তর : তখনকার দিনে, এরশাদের সময় ১০ মিলিয়ন ডলার চুরির মামলা রয়েছে। আর এখন তো বিলিয়ন ডলার পাচার ও চুরির ঘটনা ঘটছে। আর এই চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকটি মাত্র পরিবার। ২৫-৩০ বছর আগে ১০-১৫ মিলিয়ন ডলার চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আগে এখন যারা বিলিয়ন ডলার চুরি করেছে তাদের দ্রæত বিচারের আওতায় আনতে হবে। চুরির অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। জনগণের কল্যাণে তা ব্যয় করা হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন : এ মুহ‚র্তে আপনার ভাবনা কী।
উত্তর : দেশকে বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্যে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। কিছু সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষ আছেন, যারা ভাবছেন যে, তাদের ব্যবসা ভালো চলছে, তারা কোনো ঝামেলায় যেতে চাচ্ছেন না। কিন্তু সবাই যদি দায়সারাভাবে কাজ করেন, তাহলে আমাদের দেশ কখনোই সত্যিকারের গণতন্ত্রে ফিরতে পারবে না। কারণ, গণতন্ত্র হচ্ছে পার্টিসিপেটরি একটি জিনিষ, সবাই অংশগ্রহণ না করলে এটা সম্ভব নয়, আসলে গণতন্ত্র বাংলাদেশে আসতে পারবে না। দ্বিতীয়ত এই মুহ‚র্তে সরকার একটি সিরিয়াস অর্থনৈতিক বিপদে পড়েছে। তারা আইএমএফ-কে ডাকাডাকি করছে। ৫ বিলিয়ন ডলার চাচ্ছে সরকার। তাদের রিজার্ভ এখনও মাটামুটি একটা পর্যায়ে আছে। কিন্তু অবনতি যে খুব মারাত্মকভাবে হচ্ছে গত দুয়েক বছরে-এটা তারা টের পেয়েছে। তা’না হলে আইএমএফ-কে কেউ ডাকে না। আইএমএফে আমি চাকরি করতাম। পারমানেন্ট স্টাফ ছিলাম। এক্স স্টাফ হিসেবে আমি বলতে পারি, কখনোই একটি দেশকে আইএমএফ’র হাতে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, আইএমএফকে কিছু কাজ করতে হয় যা দেশের মানুষের জন্যে খুবই কষ্টকর হবে। এবং তা হবেই। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার তা বুঝেশুনে করছে কিনা আমার সন্দেহ। চুরির যে বুঝা দেশের ওপর ফেলেছে, ঋণের যে বুঝা চাপিয়ে দিয়েছে, এটার জন্যে সামনের সরকারের অনেক কষ্ট হবে। তাদের নিজেদের কাজ করতে খুব কষ্ট হবে। প্রথমে তারা ঋণের এ পরিস্থিতি ঠিক না করে কিছুই করতে পারবে না।
প্রশ্ন: আপনি তা হলে শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতির আশংকা করছেন বাংলাদেশেও?
উত্তর : আমার মনে হয় যে, বাংলাদেশে মোটামুটি সব অর্থনীতিবিদ, কয়েকটা দালাল ছাড়া, যারা সরকারের কন্ট্রাক্টের ওপর নির্ভরশীল দালাল অর্থনীতিবিদ আছে, যারা সরকারের কন্সালটেন্সি-কন্ট্রাক্টে অনেক টাকা বানিয়েছে, বানাচ্ছে, এমন অনেক বুদ্ধিমান-দালাল ছাড়া, যেমন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং আরো অনেকে বলেছেন সামনে বিরাট সমস্যার কথা। সামনের আড়াই বছরের মধ্যে শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে হলে কেউ আশ্চর্য হবে না। যদি এই সরকারের মত কেউ দেশটা চালায়।
প্রশ্ন : আড়াই বছরের মধ্যেই তো সামনের নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে বিজয়ীরা তাহলে কীভাবে এমন পরিস্থিতি ওভারকাম করবে বলে মনে করেন।
উত্তর : এমন ভয়ংকর আশংকা থেকেও দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু কেউ যদি আড়াই বছর পরে ঠিক করতে বলেন, তাহলে তা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। শ্রীলংকার মত অবস্থা হবেই।
প্রশ্ন : এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে আপনার বিকল্প প্রস্তাব আছে কি? রাজনৈতিক নেতার বাইরেও বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আপনার পরামর্শ কি?
উত্তর : এই অবৈধ-অদক্ষ সরকারকে প্রথমে সরাতে হবে। তাড়াতাড়ি সরাতে পারলেই আমরা এমন বিপদ থেকে রক্ষা পাবো। দেরী হয়ে গেলে আমরা বিপদের খুব কাছে চলে যাবো। কারণ, প্রতিমাসেই আমাদের ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে। অদক্ষতার জন্যে, চুরির জন্যে। যারা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করছে, বিদেশে বাড়ি করছে, সব সম্পত্তি বিদেশে নিয়ে আসছে, নিজের স্বার্থে; দেশের প্রতি তাদের কতটা মায়া আছে তা সন্দেহের বিষয়। তা খুব দ্রুত এদেরকে সরানো জরুরী। এবং জনগণকে একত্রিত হয়ে আন্দোলনে নামতে হবে।
প্রশ্ন : সামনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সংলাপের আয়োজন করছে। সেই সংলাপে আপনি যদি অংশ নেন তাহলে এসব প্রসঙ্গ কী উত্থাপন করবেন?
উত্তর : বিরোধী দলের কয়েকজন বসতে পারেন। কিন্তু ইলেকশন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনে আমাকে বসালেও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবো না। ফেরেশতাকে বসালেও যায়-আসবে না। আসল কথা হলো শেখ হাসিনা ওয়াজেদের যে চিন্তা-ধারা, তার আগের যে হিস্টরী, এই ১৪ বছরে যা করেছেন তা জেনে ওনার অধীনে কোনো নির্বাচনে দালালরা ছাড়া কেউ যাবে না।
প্রশ্ন : নির্বাচনে আপনারা যদি অংশ না নেন, তাহলে তো অন্যেরাই ক্ষমতায় বসবেন। নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজে সরকার পরিবর্তনের অন্যতম অবলম্বন। তাহলে তো আপনারা যে অভিযোগ/আশংকা করছেন তার ভিকটিমতো হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তো আপনারও, সকলেরই।
উত্তর : এক নম্বর হচ্ছে এটা সবার দেশ অনেকে মনে করেন না। বউ-বাচ্চাকে যারা কানাডায় পাঠিয়ে দিয়েছেন টাকাসহ, বাংলাদেশ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই-এটি বুঝতে হবে। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে, তাদের দয়ামায়া এই দেশটির জন্যে খুবই কম। তারা সবাই অর্থাৎ বিশেষ করে যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তারা বাংলাদেশকে নিজের দেশ মনে করেন না। মনে করলে তারা অনেক কিছু অন্যভাবে করতেন। আমি মনে করি চুরি-লুটতরাজে লিপ্তরা বাংলাদেশকে নিজের দেশ হিসেবে দেখে না, তারা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ডকে নিজের দেশ ভাবেন।
প্রশ্ন : বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন/করছেন-এমন দুয়েকজনের নাম কী বলতে পারবেন? এমন কোনো ড্যাটা বা পর্যবেক্ষণ আছে কি?
উত্তর : বিভিন্ন তদন্ত/মামলা বিভিন্ন দেশে চলছে। কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পরই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। ডকুমেন্টারি অ্যাভিডেন্স ছাড়া আমি কারো নাম বলব না।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন ডলারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কোনো মামলা কী যুক্তরাষ্ট্র অথবা কানাডায় চলছে?
উত্তর : বিভিন্ন জায়গায় আছে। তবে তথ্য-উপাত্ত আমার হাতে এলেই তা জানাতে পারব। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া কারও নাম বলাটা খুব কঠিন। কানাডায় কার কটি বাড়ি আছে সে সংবাদ বেরিয়েছে। আরও কিছু আসবে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:০৪ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar