
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪ | প্রিন্ট | ২৮১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

‘সুচিত্রা সেন আন্তর্জাতিক বাংলা চলচ্চিত্র উৎসব’-এ সেরা নায়কের ক্রেস্ট নিচ্ছেন রেখা আহমেদ ও লুৎফুন্নাহার লতার কাছ থেকে রাজুব ভৌমিক। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
নিউইয়র্কে ২০-২১ এপ্রিল দুদিনব্যাপী ‘সুচিত্রা সেন আন্তর্জাতিক বাংলা চলচ্চিত্র উৎসব’ উপলক্ষে বর্তমান সময়ের ছোট ও বড় পর্দার চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রিয় মুখগুলোর বিপুল সমাগম ঘটেছিল। জড়ো হয়েছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক আর নেপথ্য সংগঠকরাও। প্রবাস প্রজন্মে বাংলা সংস্কৃতির ফল্গুধারা প্রবাহিত করতে নিরন্তরভাবে কর্মরতরাও ছিলেন বাংলা সিনেমা জগতের সর্বকালের জনপ্রিয় এই নায়িকার স্মরণ-সমাবেশে। বিপুল অর্থব্যয়ের এই আয়োজনটি টিকিটহীন হওয়ায় প্রবাসীরাও অকৃপণচিত্তে সাড়া দিয়েছিলেন। আর এ কারণেই শেষ সন্ধ্যার এওয়ার্ড বিতরণের জমকালো অনুষ্ঠানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ফিরতে হয়েছে অনেককে। বাংলাদেশ ও ভারতের জনপ্রিয় তারকাদের অংশগ্রহণে বেশ কটি পর্ব ছাড়াও দুদিনে লাগাতারভাবে তিন অডিটরিয়ামে ৩৯টি ছবি প্রদর্শিত হয়। অশ্লীলতার ছাপ নেই এমন ছবি সকল প্রবাসীকে আপ্লুত করেছে। বাছাইকৃত ছবির মধ্য থেকেই সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং নির্মাতাগণকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সবকিছু ঘিরে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারটি বাংলা আর বাঙালিদের পদচারণায় মুখরিত ছিল হিমেল হাওয়া সত্বেও। ’জীবনের সাথে, যাপনের সাথে, মননের সাথে, সবকিছুর সাথে জড়িয়ে আছেন একটা এমনি নাম, যে নাম যতদিন সিনেমা থাকবে, যতদিন আমরা সবাই থাকবো, এই জীবন থাকবে, ততদিন মাননীয়া সুচিত্রা সেনের নাম থেকে যাবে’-এমন সরল বাক্য উচ্চারিত হয় দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের কন্ঠে।
বাংলা সিনেমা জগতের জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্যতিত্রমী ফ্যাশন শো এবং নৃত্যাঞ্জলির নাচ-গানের গোছানো পরিবেশনা সকলকে মুগ্ধ করেছে। বর্তমান সময়ে শক্তিশালী উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয় এওয়ার্ড বিতরণ পর্বকে বিশেষ এক আমেজে আবিষ্ট রেখেছিলেন সুচিত্রা সেনের সাথে কৃত্রিমভাবে কথোপকথনের মধ্যদিয়ে। একইসাথে অনুষ্ঠান-পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্য ও অনিয়মকেও হাস্যরসের মধ্যদিয়ে অতিক্রমে ভূমিকা রাখেন জয়। এওয়ার্ড বিতরণ পর্বে প্রবীন ও নবীন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সম্মিলন ঘটানোর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। ছিলেন রেখা আহমেদ, লুৎফুন্নাহার লতা, নওশীন, রুমানা, বন্যা মির্জা, তমা মির্জা, মোনালিসা প্রমুখ। ঢাকা ও কলকাতার চঞ্চল চৌধুরী, বাধন, ঋতুপর্ণা সেন, নানজিবা খান, রেশমি মিত্র, হৃদি হক প্রমুখ ছিলেন সরব।
সমাপনী পর্বে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনের খ্যাতিমান অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজকদেরকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। পাশা সিনেমার নায়ক হিসেবে অভিনয়কারি নিউইয়র্কের রাজুব ভৌমিককে ‘প্রবাসের সেরা অভিনেতা’র পুরস্কার হস্তান্তর করেন একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রেখা আহমেদ ও লুৎফুন্নাহার লতা। একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন্নবীর লেখা বই ‘বুলেট অব দ্য সেভেন্টি ওয়ান : অ্যা ফ্রিডম ফাইটারস স্টোরি’ অবলম্বনে প্রামাণ্যচিত্র ‘ড. নূরন্নবী : আজীবন মুক্তিযোদ্ধা’ নির্মাণকারি নাদিম ইকবালকে সেরা পরিচালকের পুরস্কার হস্তান্তর করেন রেখা আহমেদ। ডক্যুফিচার ক্যাটাগরিতে ‘অবাঞ্ছিত জমজ’ ছবির নির্মাতা নানজিবা খানকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ছবিটি নির্মাণকালে নানজিবার বয়স ছিল ১৮ বছররেও কম। এটি নানজিবাকে হস্তান্তর করেন যৌথভাবে রুমানা ও বন্যা। চলচ্চিত্র জগতে শক্তিমান অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ এবং অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকেও বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। এ দুটি হস্তান্তর করেন এই উৎসবের অন্যতম পৃষ্টপোষক শাহনেওয়াজ ও আকাশ রহমান। এ সময় মঞ্চে ছিলেন বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমী। ফেরদৌস তার পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন ঢাকা-১০ আসনের ভোটারদের প্রতি। আর গভীর কৃতজ্ঞতা জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি। ‘প্রতিটি পুরস্কারই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমার জন্যে তা দারুন ব্যাপার বেশ কিছু কারণে। সবাই জানেন যে, আমার জীবনে একটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে আমার জীবনে। আমি এতদিন অভিনয় করতাম মৌসুমী আর ঋতুপর্ণার সাথে। এখন সেইদিকে একটু কাজ কমিয়ে দিয়ে চলে গেছি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে। ধন্যবাদ জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে, আমার ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস রেখে ঢাকা-১০ আসনের মত, সবচাইতে ইমপোর্টেন্ট আসনের নৌকার মাঝি করে তোলার জন্য। আর আমি পার্লামেন্ট মেম্বার হবার পর এই প্রথম একটি এওয়ার্ড পেলাম আমার চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারের জন্যে’-উল্লেখ করেন ফেরদৌস এমপি।
কলকাতা ও ঢাকার আরো কয়েকজনকে প্রদান করা হয় সম্মাননা ক্রেস্ট। ক্রেস্টগুলো এতটাই নিম্নমানের ছিল যে, হস্তান্তরের আগেই তার কয়েকটি ভেঙ্গে যায় এবং তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণের অভিপ্রায়ে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জয় বিষয়টিকে কৌতুকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চান। আবার এমনও ঘটেছে, ক্রেস্ট প্রদানকারির নাম ঘোষণা করা হয়েছে অথচ ক্রেস্ট পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে ‘সুচিত্রা সেন আন্তর্জাতিক বাংলা চলচ্চিত্র উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর উদ্যোক্তা ছিল ‘সুচিত্রা সেন মেমরিয়্যাল, ইউএসএ’ নামক একটি সংগঠন। পাবনার মেয়ে সুচিত্রা সেনের বাংলা চলচ্চিত্রে অবিস্মরণীয় অবদানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে, বিশেষ করে প্রবাস প্রজন্মে তা বিস্তৃত করার অভিপ্রায়ে মহানায়িকার ৯৩তম জন্মদিন উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবের মূল সংগঠক ছিলেন ‘সময় টিভি’র যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান সাকি এবং আহবায়ক ছিলেন গোপাল সান্যাল। সাথে ছিলেন একদল উদ্যমী মানুষ। এ উৎসবে প্রদর্শণের জন্যে ৪০৯টি ছবি জমা হয়েছিল। তার মধ্য থেকে বিচারকমন্ডলী ৩৯টি ছবি বাছাই করেছিলেন-যা দুদিনে ৩টি মিলনায়তনে প্রদর্শিত হয়েছে।
নিউইয়র্কের মত বহুজাতিক সমাজে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে এই উৎসবের ভূমিকা কতটুকু হবে বলে জানতে চাইলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, নিউইয়র্ক হচ্ছে একটি মাল্টিকালচারাল সোসনাইটি। পৃথিবীর এমন কোন সংস্কৃতি নেই যার ছিটোফোটা এখানে পাওয়া যাবে না। সত্যিকার অর্থেই একটি কসমোপলিটন সিটি। সেই শহরে সুচিত্রা সেন আন্তর্জাতিক বাংলা চলচ্চিত্র উৎসব হলো, এটি খুবই ভালো দিক। কারণ এই নিউইয়র্কে ভালো একটি বাঙালি কম্যুনিটি আছে। তাদের সামনে চমৎকার একটি সুযোগ এসেছিল ভাল ভাল ছবি দেখার। এই সুযোগটি যারা করে দিয়েছেন তারা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে একইসাথে দেখতে হবে যে, ভাল চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা কীভাবে করা যায়। ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে ছবি দেখার আগ্রহ তৈরী হয়। এবং ছবির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ে। সেটি হয়তো এই উৎসবের মধ্যদিয়ে নতুন করে জায়গা তৈরী করবে।
একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক নাজমুন্নেসা পিয়ারি এসেছিলেন জার্মানী থেকে। তিনি এ সংবাদদাতাকে এই উৎসবের অনুভ’তি প্রসঙ্গে বললেন, আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তখোনই বাংলা চলচ্চিত্র জগতের উদ্যোক্তাগণের সাথে জড়িয়ে ছিলাম। সে সময় তারা শিল্পসম্মত বিদেশী ছবিও দেখাতেন। আমরা লেখক, কবি, সাহিত্যিক তথা শিল্প-সংস্কৃতির পূজারিরা দলবেধে যেতাম প্রেক্ষাগৃহে। ছবির প্রতি সেজন্যে একটি ভালবাসা রয়েছে। আর বাংলা ছবি মানেই হচ্ছে সুচিত্রা সেনের ছবি। তার অভিনীতি ছবিগুলো দেখতে উদগ্রিব থাকতাম সবসময়। সে আলোকে সুচিত্রা সেনের নামে এই উৎসবে বাংলা ছবি প্রদর্শণের উদ্যোগকে আমি সর্বান্তকরণে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এখানকার বাঙালি প্রজন্মের মাধ্যমে বাংলা ছবির কথা বিদেশীদের কাছেও নিশ্চয়ই ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, আমাদের ছবির মান কোনভাবেই কম নয়। রুচিসম্মত ছবির কথা আমেরিকানরা জানতে পারলে তারাও আগ্রহী হবেন তা দেখতে। সে অর্থে আমি মনে করছি এ উৎসব স্বার্থক।



