
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | শনিবার, ০৪ মে ২০২৪ | প্রিন্ট | ১০৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

নিউইয়র্কে নিজ বাড়ির রান্নাঘরে মা এবং ছোট ভাইয়ের আকুতি উপেক্ষা করে দুই পুলিশের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি উইন রোজারিও(১৯) হত্যাকাণ্ডের ৩৬ দিন পর ৩ মে পুলিশের বডি ক্যামেরার ফুটেজ (যঃঃঢ়ং://ধম.হু.মড়া/ড়ংর/ভড়ড়ঃধমব/রিহ-ৎড়ুধৎরড়) প্রকাশ করলো নিউইয়র্ক স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশা জেমস। সেই ভিডিও ফুটেজ দেখার পর ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে উইনের মা নট্যান আভা কোস্টা, বাবা ফ্রান্সিস রোজারিও এবং ছোটভাই উৎস রোজারিও এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মাসাধিককাল আগে হারিয়েছি উইনকে এবং আমাদের হৃদয় সেই থেকে ভেঙ্গে তছনছ হয়েছে। প্রতিটি দিনক্ষণ আমরা তার অনুপস্থিতি গভীর বেদনার সাথে অনুভব করছি। এমন নিদারুণ কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। এ অবস্থায় আমরা আশা করছি সেই ফুটেজ জনসমক্ষে প্রকাশের কোনো প্রয়োজন নেই। যে ফুটেজ প্রকাশ করা হলো তা একেবারে স্পষ্ট করেছে যে, উইনের বেঁচে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু পুলিশ এসে তাকে আমাদের কিচেনে হত্যা করেছে। আমাদের এবং উইনের সুরক্ষার পরিবর্তে পুলিশ অফিসারেরা উইনকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করার মত পরিস্থিতি তৈরী করেছিলেন। তাই আমরা চাচ্ছি পুলিশ অফিসার দ্বয়কে বরখাস্ত করা হউক এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করা উচিত।’
উল্লেখ্য, মানসিক রোগে আক্রান্ত উইন রোজারিও গত ২৭ মার্চ দুপুরে নিউইয়র্ক সিটির ওজোনপার্কে তার মা-এবং ভাইয়ের সাথে কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করলে ৯১১-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়। নিউইয়র্ক পুলিশের দুই অফিসার বাসায় এসে উইনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টার এক পর্যায়ে টেজার (এক ধরনের অস্ত্র, যা বিদ্ধ করে উত্তেজিত/অবাধ্য লোকদের নিস্তেজ করা যায়) ছোঁড়া হয়। সে সময়ে উইনের মা উইনকে জড়িয়ে ধরে পুলিশের প্রতি আকুতি জানাচ্ছিলেন গুলি না করার জন্য। তবুও পুলিশ সাড়া দেয়ার পরিবর্তে উপর্যুপরি টেজার ছোড়ার আতংক মানসিক বিকারগ্রস্ত উইন চেয়ারের ওপরে রাখা মাছ/মাংস কাটার কেঁচি হাতে নিয়ে পুলিশের প্রতি ধেয়ে যাবার চেষ্টা করলেই উভয় অফিসার কয়েক রাউন্ড গুলিতে উইনকে ধরাশায়ী করেন। ফুটেজে তা স্পষ্ট হয়েছে।
ফুটেজ দেখে সুস্থ মস্তিষ্কের সকলেই অনুধাবনে সক্ষম হচ্ছেন যে, টেজার ছোঁড়ার পর উইনকে গুলি করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পুলিশ অফিসারদ্বয় সে চেষ্টা করেননি। উল্লেখ্য, উইন হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পরিবার এবং কম্যুনিটির পক্ষ থেকে দাবি জানানো হচ্ছিল বডি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশের জন্যে। কিন্তু নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তা আমলে না নেয়ায় স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল তা প্রকাশ করলো।
এই ফুটেজের ব্যাপারে নিউইয়র্কস্থ জাস্টিস কমিটির পক্ষ থেকে ৩ মে প্রদত্ত বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক লৈডা কলোন বলেছেন, ফুটেজটি খুবই কষ্টদায়ক এবং তা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সামিল। শুরু থেকেই পুলিশ অফিসার দ্বয়ের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকর এবং অপমানজনক ভাষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানসিক রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মত যোগ্যতা ওই দু’জনের ছিল না। উইনকে হত্যার পর নিউইয়র্ক পুলিশ যেসব বক্তব্য দিয়েছিল তার সাথে এই ফুটেজের কোনো মিল নেই। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে ওই দুই অফিসার যথেচ্ছাচার করেছেন। উইন কিংবা তার পরিবারের সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ অবসানের চেষ্টার পরিবর্তে তারা উল্টো নিজেরাই পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করেন, টেজার ছুড়েন এবং গুলি করেন। মুহূর্তের মধ্যেই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় উইনকে তারা হত্যা করেছেন।
বিবৃতিতে দুই পুলিশ অফিসারের নামও প্রকাশিত হয়েছে। এরা ছিলেন স্যালভেটর অ্যালোঙ্গি এবং ম্যাথিউ সিয়ানফ্রকো।
বিবৃতিতে ক্ষোভের সাথে আরো বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত সিটি প্রশাসন এই অভিযুক্ত দু’জনকে বিচারে সোপর্দ করা দূরের কথা, চাকরি থেকে বরখাস্তও করেনি। জাস্টিস কমিটির এই কর্মকর্তা ক্ষুব্ধচিত্তে উল্লেখ করেছেন, সিটি মেয়র এরিক এডামসকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে কেন অভিযুক্ত অফিসারদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। এবং এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কেন ধামাচাপা দেয়ার কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে-সে প্রশ্নেরও জবাব মেয়রকে দিতে হবে।
উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক সিটিতে পুলিশের অন্যায় আচরণ, সহিংসতা এবং পর্যায়ক্রমিক বর্ণবিদ্বেষমূলক আচরণ জনসমক্ষে প্রকাশ ও দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করা নিয়ে ১৯৮০ সাল থেকে কাজ করছে অলাভজনক সংস্থা হিসেবে এই জাস্টিস কমিটি। কম্যুনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে জাস্টিস কমিটির তৎপরতা ইতিমধ্যে প্রশংসিতও হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ানদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দেশিজ রাইজিং আপ অ্যান্ড মুভিং’ তথা ড্রাম এর বর্ণবিদ্বেষমূলক সংগঠক সিমরান থিন্ড এই ফুটেজ প্রসঙ্গে প্রদত্ত বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, আমাদেরকে আর কতবার নিউইয়র্ক পুলিশের বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নিউইয়র্ক পুলিশ বাহিনী কি এ ধরনের নির্দয় আচরণ করতেই থাকবে? কেন আমরা মানসিক-স্বাস্থ্য সম্পর্কে পুলিশ অফিসারদের যথাযথ ট্রেনিং দিচ্ছি না। মানসিক বিকারগ্রস্তদের দ্বারা উদ্ভ’ত পরিস্থিতি যথাযথভাবে সামাল দেয়ার জন্যে কেন পুলিশ অফিসারদের সেভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে না।
উইন রোজারিও পরিবার নিয়োজিত ল’ ফার্ম বেলডোক লেভাইন অ্যান্ড হোফম্যান এলএলপির পক্ষে ডেভিড র্যাঙ্কিন অপর এক বিবৃতিতে উল্লেখন করেছেন, ওরা লোকটিকে গুলি করে হত্যা করেছে। ওরা একজনকে হত্যা করেছেন এবং আরো দু’জনকেও প্রায় হত্যায় উদ্যত হয়েছিলেন। দুই পুলিশ অফিসারই বরখাস্ত হওয়া এবং বিচারে সোপর্দ করা উচিত ছিল। এটা খুবই দুঃখজনক, অসহনীয়-অপমানজনক। ফুটেজ দেখে বলা যেতে পারে যে, উইন রোজারিওর জীবনকে এভাবে থামিয়ে দেয়ার কোনো কারণ ঘটেনি। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, মানসিক বিকারগ্রস্ত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে নিউইয়র্ক পুলিশ অফিসারদের সেভাবে প্রস্তুত করা হয়নি।
এদিকে, গত ৭ এপ্রিল নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকায় হিলসাইড এভিনিউ সংলগ্ন ১৬৮ স্ট্রিটে ভর দুপুরে দুর্বৃত্তের হামলায় গুরুতরভাবে আহত হবার তিনদিন পর ১০ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বাংলাদেশি জাকির হোসেন খসরু (৭৬)। তার ঘাতকও আজ অবধি গ্রেফতার দূরের কথা পুলিশ তাকে শনাক্তই করতে পারেনি। এ ধরনের দুর্বৃত্তকে গ্রেফতারে সীমাহীন গাফিলতির নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে খসরুর ঘাতকে গ্রেফতার দাবিতে শেরপুর জেলা সমিতির পক্ষ থেকে ১২ মে রোববার বেলা ২টায় হিলসাইডের ওই স্থানে এক মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, খসরু ছিলেন শেরপুর জেলা সমিতির উপদেষ্টা শামীমা আকতার শিউলির স্বামী। এই কর্মসূচিতে সকল প্রবাসীর উপস্থিতি কামনা করা হয়েছে।



