
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | মঙ্গলবার, ১১ জুন ২০২৪ | প্রিন্ট | ৪১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

৯ বছর বয়েসী ইয়াফি আহমেদ এবং তার বোন ইয়ারা আহমেদ (৬)ও শেষ হাতিতে মেতে উঠতে পারলো না। নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী বাঙালি প্রজন্মের এই দুই শিশু টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যেকার খেলা শুরুর আগে বাংলাদেশ টিমের খেলোয়াড়দের গাইডার হিসেবে অন্য শিশুদের মধ্যে এরা দু’জনও ছিল। নিউইয়র্ক সিটি সংলগ্ন লং আইল্যান্ডে নাসাউ কাউন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১০ জুনের এই খেলায় ২০ হাজারের মত দর্শকের ১৮ হাজারের বেশী ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। অধিকাংশই লাল-সবুজের পতাকার সাথে মিলিয়ে পোশাক পরেন। অনেকের হাতে ছিল বাংলাদেশের পতাকা। আবার অনেকে মাথায় লাল-সবুজের স্কার্প পরেন।
৩৪ হাজার আসনের এই স্টেডিয়ামটি পরিণত হয়েছিল লাল-সবুজের বাংলাদেশে। সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে খেলা শুরুর পরই গোটা স্টেডিয়াম ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠে। দক্ষিণ আফিক্রানদের উইকেট কেড়ে নেয়ার প্রতিটি ক্ষণ ছিল বাঙালি উৎসবে ভিন্ন এক আমেজ। নেচে-গেয়ে দর্শকেরা নিজ নিজ অনুভূতি প্রকাশ করেন বড় একটি বিজয়ের প্রত্যাশায়। তেমন সম্ভাবনায় কোনই কমতি ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাট করতে নামার পরই উল্লাস আর আনন্দে ভাটা পড়ে। ফ্যাকাশে হয়ে যায় স্টেডিয়ামের লাল-সবুজের বর্ণাঢ্য অনুভূতি। বাঙালির বিজয়ের আনন্দ একেবারে ম্লান হয়ে যায় মাত্র ৪ রানের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায়। খেলা শেষ হবার সময় যেন সবকিছু থমকে দাঁড়ায়। স্তব্দ হয়ে যান সকলে। স্টেডিয়াম ত্যাগের সময় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাকিব আর শান্তর নাম উচ্চারণ করে।
স্টেডিয়ামের সন্নিকটে ইয়াফি আর ইয়ারার মা-বাবার বাসা। হাজারো ক্রিকেট প্রেমী দর্শকের সাথে ইয়াফি ও ইয়ারাও পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিল। নিউইয়র্কে এই প্রথম বিশ্বকাপের খেলোয়াড়দের গাইডার হবার মত ঘটনায় সম্পৃক্ত হতে পারার আনন্দ যেন একেবারেই মুছে গেছে। বিষন্ন চিত্তে মা-বাবা-স্বজনের সাথে হাঁটছিল ইয়াফি ও ইয়ারা। সে সময় এ সংবাদদাতা তাদের অনুভ’তি জানতে চাইলে অত্যন্ত হতাশার সাথে বললো, জানি না কেন এমন হলো। ভাঙা বাংলায় ইয়াফি ও ইয়ারা আরো উল্লেখ করলো, খুব খারাপ লাগছে বাংলাদেশ জিততে না পারায়।

ইয়াফি আর ইয়ারার মত সকলেই হতাশ হয়ে নিজ নিজ বাসায় ফিরেছেন। কেন এমন বিপর্যয় ঘটলো-সে বিশ্লেষণ করছেন ক্রিকেট প্রেমীরা। সাকিব আর শান্তই কী পুরো ব্যর্থতার জন্যে দায়ী-এমন প্রশ্ন প্রায় সকলেরই। ইউএস বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লিটন আহমেদ দুঃখের সাথে বললেন, জয়ী হবার সম্ভাবনা শতভাগ থাকা সত্বেও কেন হারলো বাংলাদেশ-তার বিশ্লেষণ করা জরুরি। সামনের খেলাগুলোতে যাতে এমন বিপর্যয় না ঘটে-সে জন্যেই সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া দরকার।
বোলারদের নৈপুণ্যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১১৩ রানে থামিয়েও শেষ পর্যন্ত কেন জিততে পারল না বাংলাদেশ? দুই বলে প্রয়োজন ৬ রান। দক্ষিণ আফ্রিকার কেশভ মহারাজের ফুল টস লং অন দিয়ে মারলেন মাহমুদউল্লাহ। মনে হচ্ছিল, সীমানা পার হয়ে যাবে বল। কিন্তু না! দড়ির ঠিক আগে লাফিয়ে দারুণ ক্যাচ নিলেন এইডেন মারক্রাম। একইসঙ্গে যেন নিশ্চিত করে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জয়। শেষ বলে আরেকটি ফুল টস পেলেন তাসকিন আহমেদ। তিনিও পারলেন না বাউন্ডারি হাঁকাতে। বিজয়ের একেবারে কাছে গিয়ে হারল বাংলাদেশ। পেসারদের দারুণ বোলিংয়ে প্রোটিয়াদের মাত্র ১১৩ রানে থামিয়ে জয়ের সম্ভাবনা জাগায় বাংলাদেশ। রান তাড়ায় অনেকটা সময় পথেই ছিল তারা। কিন্তু শেষ দিকে দিক হারিয়ে মেলাতে পারেনি সমীকরণ।
বাংলাদেশকে ১০৯ রানে থামিয়ে টানা তৃতীয় জয় পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পূর্ণাঙ্গ ম্যাচে এর চেয়ে কম রান করে জেতার নজির নেই আর। এর আগে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা ১১৯ রান করে নিউ জিল্যান্ডকে এবং চলতি আসরেই ভারত ১১৯ রান করে পাকিস্তানকে হারায়। বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে এ নিয়ে চারবার ৫ বা তার কম রানে জিতল দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বের আর কোনো দল দুইবারের বেশি গড়তে পারেনি এই কীর্তি।
অথচ রান তাড়ায় ১৫ ওভার শেষেও ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ৬ উইকেট হাতে রেখে ৩০ বলে করতে হতো ৩১ রান। সেখান থেকে পেসারদের দারুণ বোলিংয়ে ঘুরে দাঁড়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ ওভারে মহারাজের জন্য ১১ রান রাখেন তিন পেসার আনরিক নরকিয়া, কাগিসো রাবাদা ও ওটনিয়েল বার্টম্যান। প্রথম বলে ওয়াইড দিলেও কোনো বাউন্ডারি হজম না করে মাত্র ৬ রান দেন মহারাজ। তিনটি ফুল টস পেয়েও ছক্কা মারতে পারেননি জাকের আলি, মাহমুদউল্লাহ ও তাসকিন।
মুখোমুখি লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সবচেয়ে কম রানে থামিয়ে রান তাড়ায় শুরুটা তেমন মন্দ ছিল না বাংলাদেশের। দ্বিতীয় ওভারে তানজিদ হাসান ফিরলেও পাওয়ার প্লেতে আর কোনো উইকেট হারায়নি তারা। নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন কুমার দাসের সাবধানী ব্যাটিংয়ে প্রথম ৬ ওভারে আসে ২৯ রান।
সপ্তম ওভারে আক্রমণে এসেই লিটনকে ফেরান মহারাজ। ইনসাইড আউট করে বড় শটের খোঁজে কাভারে মিলারের হাতে ক্যাচ দেন ১৩ বলে ৯ রান করা লিটন। এরপর টিকতে পারেননি সাকিব আল হাসানও। নরকিয়ার বাউন্সার পুল করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ধরা পড়েন তিনি। বোলিংয়ে মাত্র ১ ওভার করা সাকিব ব্যাট হাতে ৪ বলে করেন ৩ রান। দলীয় পঞ্চাশ ছুঁয়ে শান্তর উইকেটও হারায় বাংলাদেশ। নরকিয়ার আরেকটি বাউন্সার সাকিবের মতোই পুল করতে গিয়ে প্রায় একই জায়গায় একই ফিল্ডার মারক্রামের হাতে ক্যাচ দেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সংগ্রামী ইনিংসে তিনি ২৩ বলে করেন ১৪ রান।
পঞ্চম উইকেটে চাপ সামাল দেন তাওহিদ হৃদয় ও মাহমুদউল্লাহ। আগের ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলা হৃদয় এদিনও শুরু থেকেই রান রেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে থাকেন। অন্য প্রান্তে মাহমুদউল্লাহও ভালো সঙ্গ দেন তাকে।
ভাগ্যের সহায়তাও অবশ্য পায় বাংলাদেশ। দ্বাদশ ওভারে নরকিয়ার বাউন্সারে স্লিপে ক্যাচ নিতে পারেননি মার্কো ইয়ানসেন, ৭ রানে বেঁচে যান মাহমুদউল্লাহ। দ্বিতীয় স্পেলে ফেরা মহারাজকে ছক্কায় উড়িয়ে রানের চাপ সরান হৃদয়। পরের ওভারে ইয়ানসেনকে বাউন্ডারি মারেন তিনি।
সপ্তদশ ওভারে বার্টমানের বলে মাহমুদউল্লাহকে এলবিডব্লিউ দেন আম্পায়ার। রিভিউ নিয়ে উইকেট বাঁচান অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। ওই বল তার প্যাডে লেগে চলে গিয়েছিল সীমানায়। কিন্তু আম্পায়ার আগেই আউট দেওয়ায় লেগ বাই থেকে বাউন্ডারি যোগ হয়নি বাংলাদেশের স্কোরে।
পরের ওভারে হৃদয়কে ফেরান রাবাদা। রিভিউ নিয়েও লাভ হয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়, লেগ স্টাম্পের বেলস ছুঁয়ে যেত বল। অর্থাৎ মাঠের আম্পায়ার ‘নট আউট’ দিলে বিপদ ঘটত না ২টি করে চার-ছক্কায় ৩৪ বলে ৩৭ রান করা হৃদয়ের। এরপর শুধুই পেছাতে থাকা। সৌম্য সরকারের জায়গায় একাদশে সুযোগ পেয়ে তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ জাকের আলি। শেষ ওভারে ফেরার আগে ৯ বলে তিনি করেন ৮ রান। মারতে পারেননি কোনো বাউন্ডারি। মাহমুদউল্লাহ ২ চারে ২৭ বলে করেন ২০ রান। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেন মহারাজ। তবে মিতব্যয়ী বোলিংয়ে তাদের জয়ের পথটা গড়ে দেন মূলত পেসাররাই। এর আগে রৌদ্রজ্জ্বল সকালে টস হেরে শান্ত বলেছিলেন, তিনিও আগে বোলিংই নিতেন। বাংলাদেশ অধিনায়কের মন্তব্যের যথার্থ প্রমাণ করতে একদমই সময় নেননি পেসাররা। প্রথম ওভারে কুইন্টন ডি ককের কাছে একটি করে ছক্কা-চার হজম করলেও শেষ বলে অন্য ওপেনার রেজা হেনড্রিকসকে ফেরান তানজিম হাসান।
নিজের পরের ওভারে আরেক ওপেনার ডি কককে বোল্ড করেন তানজিম। চতুর্থ ওভারে তিন নম্বরে নামা এইডেন মারক্রামের স্টাম্প ছত্রখান করেন তাসকিন আহমেদ। দক্ষিণ আফ্রিকার চাপ আরও বাড়িয়ে টানা তৃতীয় ওভারে সাফল্যের দেখা পান তানজিম। এবার ট্রিস্টান স্টাবসকে ফেরান তরুণ পেসার। মাত্র ২৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন যেন অকূল পাথারে প্রোটিয়ারা। বিপর্যয় সামাল দিতে রীতিমতো টেস্ট মেজাজে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে মুস্তাফিজের করা পাওয়ার প্লের শেষ ওভারটি খেলেন মিলার ও হাইনরিখ ক্লসেন। প্রথম ৬ ওভারে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ২৫ রান।
এরপর ধীরে ধীরে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন দুই মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান। মিলার খোলসে ঢুকে গেলেও সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি মারতে থাকেন ক্লসেন। দশম ওভারে রিশাদ হোসেনের বলে পরপর দুটি ছক্কা মারেন প্রোটিয়া কিপার-ব্যাটসম্যান। পঞ্চাশ পেরিয়ে যায় তাদের দলীয় স্কোর। পরের ওভারে মাহমুদউল্লাহর বলে মিলারের ক্যাচ ছেড়ে দেন লিটন। ১৩ রানে বেঁচে যান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। এরপর আর ভুল করেননি তিনি। দেখেশুনে খেলে ক্লসেনের সঙ্গে এগিয়ে নেন দলের ইনিংস। সপ্তদশ ওভারে একশ পূর্ণ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর ৭৯ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন। বড় শটের খোঁজে বোল্ড হন ২ চার ও ৩ ছক্কায় ৪৪ বলে ৪৬ রান করা ক্লসেন। পরের ওভারে মিলারকে বোল্ড করেন রিশাদ। একটি করে চার-ছক্কায় মিলার খেলেন ৩৮ বলে ২৯ রানের ইনিংস।
দুই সেট ব্যাটসম্যানের বিদায়ের পর শেষ দিকে আর প্রত্যাশামতো রান নিতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৮ রানে ৩ উইকেট নেন তানজিম। ১৯ রানে ২ শিকার ধরেন তাসকিন। উইকেট না পেলেও স্রেফ ১৮ রান খরচ করেন মুস্তাফিজ। কিন্তু, আরও একবার দিনশেষে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় হতাশায় সঙ্গী বাংলাদেশের।



