
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪ | প্রিন্ট | ১২১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মার্কিন নাগরিকদের স্বামী/স্ত্রীর মধ্যে যারা কাগজপত্রহীন তথা অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট, তাদেরকে সিটিজেনশিপ প্রদানের বহুল প্রত্যাশিত একটি নির্বাহী আদেশ জারি করলেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ১৮ জুন মঙ্গলবার জারিকৃত এই আদেশের আওতায় ড্রিমার হিসেবে পরিচিত আরো ৫০ হাজারের মত তরুণ-তরুণীও গ্রিনকার্ড পাবেন। শুধু তাই নয়, আমেরিকার কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণকারী বিদেশিরাও গ্রিনকার্ডের সুযোগ পাবেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এই নির্দেশ অনুযায়ী যারা ওয়ার্ক পারমিটের পথ বেয়ে গ্রীণকার্ড নামক সোনার হরিণটি হাতে পাবেন এবং তার সাড়ে ৩ বছর পরই মার্কিন নাগরিকত্ব পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত-তারা আসছে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আবেদন জানাবেন। হাজার পঞ্চাশেক বাংলাদেশিসহ সাড়ে ৫ লাখ কাগজপত্রহীন বিদেশির জন্যে এমন একটি সুযোগ তৈরীর ঘটনাটিকে অভিবাসন নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলো কয়েক দশক পর ঐতিহাসিক একটি পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন।
উল্লেখ্য, দক্ষিণের সীমান্ত বেআইনীভাবে অতিক্রমকারীদের জন্যে এসাইলামের আবেদন বেআইনি ঘোষণার একটি আদেশ জারির দু’সপ্তাহের মাথায় সিটিজেনদের কাগজপত্রহীন স্বামী/স্ত্রীকে সিটিজেনশিপ প্রদানের এই আদেশটি আসছে নভেম্বরের নির্বাচনে বাইডেন তথা ডেমক্র্যাটদের বিজয়ে বড় ধরনের একটি প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে ইউএস সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ডেমক্র্যাটিক পার্টির কুইন্স বরোর ডিস্ট্রিক্ট লিডার অ্যাট লার্জ অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে বলেন, ১৭ জুনের মধ্যে সিটিজেন/গ্রীণকার্ডধারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কাগজপত্রহীন ব্যক্তিরা গ্রিনকার্ডের আবেদন করতে পারবেন। বিদ্যমান রীতি অনুযায়ী তাদেরকে নিজ দেশে ফিরতে হবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই তারা সবকিছু করতে পারবেন। আবেদনের এই প্রক্রিয়া যাতে নির্ভূল হয় সেজন্যে সংশ্লিষ্টদেরকে অভিজ্ঞ অ্যাটর্নির পরামর্শ নেয়া জরুরি। কারণ, আবেদনে ভুল-ভ্রান্তি হলে কিংবা সঠিকভাবে তা অনুসরণ করা না হলে ঘোষিত সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
সিটিজেনদের একত্রিত রাখার অভিপ্রায়ে ঘোষিত এই নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, যারা অন্তত ১০ বছরের অধিক সময় যাবত কাগজপত্রহীন ছিলেন, তবে কাজ করছেন, ট্যাক্স প্রদান করেছেন, গুরুতর কোন অপরাধে লিপ্ত হননি এবং ১৮ জুনের আগে সিটিজেন/ গ্রিনকার্ডধারীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন-তারাই যোগ্য। এছাড়া শিশুকালে মা-বাবার হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর লেখাপড়া করেছেন, এদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন-এমন কাগজপত্রহীন তরুণ-তরুণীর মধ্যে যাদের বয়স ১৮ জুন পর্যন্ত ২১ বছরের কম ছিল-তেমন ড্রিমাররাও সিটিজেনশিপের সুযোগ পাবেন। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৫ জুন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ড্রিমারদের নানা শর্তে সিটিজেনশিপ প্রদানের একটি নির্দেশ জারি করেন, যেটি ড্যাকা হিসেবে পরিচিত। সে অনুযায়ী ৮ লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করেছিলেন, যার পথ বেয়ে গ্রীণকার্ড পাবার কথা। কিন্তু রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে হোয়াইট হাউজের ক্ষমতা লাভের পর সেই ড্রিমারদের গ্রিনকার্ড প্রাপ্তির পথ রহিত করেন। তবে তা সুপ্রিম কোর্টের রুলিংয়ে থামিয়ে দেয়া সম্ভব হলেও ওবামার নির্দেশনাটি কার্যকর হওয়া সম্ভব হয়নি।
বাইডেনের এই নির্দেশনায় বয়স সীমা ২১ বছর পর্যন্ত নির্দ্ধারণ করায় ৫০ হাজার ড্রিমার সিটিজেনশিপের সুযোগ পাবেন বলে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে। যাদের বয়স ২১ বছরের অধিক হয়েছে তাদের ভাগ্য কীভাবে প্রসন্ন হবে সেটি এখন ভাবতে হবে কংগ্রেসকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাইডেনের উপর্যুপরি অনুরোধে ডেমক্র্যাটদের সর্বশেষ উত্থাপিত একটি কমপ্রিহেনসিভ ইমিগ্রেশন রিফর্ম বিল, যেটিতে কাগজপত্রহীন সোয়া কোটি অভিবাসীকে গ্রিনকার্ডের পথ বেয়ে সিটিজেনশিপ প্রদানের কথা ছিল, তা রিপাবলিকানদের প্রচন্ড বিরোধিতার মুখে নাকচ হয়ে গেছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপরই ইমিগ্রেশনের ভঙ্গুর অবস্থাকে ঢেলে সাজাতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রথমে দক্ষিণের সীমান্তকে নিরাপদ করার আদেশ জারি করেন এবং দু’সপ্তাহের মাথায় পরিবার একত্রিকরণের অভিপ্রায়ে জারি করলেন এই আদেশটি। ১৯৮৭ সালে সর্বশেষ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রিগ্যান কর্তৃক ৩ লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে সিটিজেনশিপ প্রদানের একটি আদেশ জারির ঘটনা ঘটেছিল। এর ৩৭ বছর পর অবৈধ অভিবাসী তথা কাগজপত্রহীন সোয়া কোটি বিদেশীর মধ্যে বিশেষ এই ক্যাটাগরির সাড়ে ৫ লাখ মানুষকে সিটিজেনশিপ প্রদানের বিধি জারি হলো। এই বিধিকেও চ্যালেঞ্জের হুমকি দিয়েছেন রিপাবলিকানরা।
রিপাবলিকান তথা টাম্পের নীতি-নির্দ্ধারকরা বলেছেন, এটি বাইডেনের নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেয়ার মতলবে করা হলো-যা যুক্তরাষ্ট্রে আরো বিদেশীকে বেআইনীভাবে আগমণের উৎসাহ জোগাবে। অপরদিকে, ডেমক্র্যাটরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এই সাড়ে ৫ লাখ মানুষ সিটিজেনশিপ পাবার সিড়িতে উঠার ফলে তাদের দীর্ঘদিনের একটি দুশ্চিন্তা দূর হবে এবং তারা আরো বেশী মনোযোগী হবেন নিজ নিজ কর্মস্থলে। যারা সুফল পাবে আমেরিকা। নয়া এই বিধি অনুযায়ী ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে কৃতিত্বের সাথে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণকারিগণের সিটিজেনশিপ প্রাপ্তির আবেদনের সিড়ি হিসেবে পরিচিত ওয়ার্ক পারমিটও দ্রুততম সময়ে ইস্যু করা হবে। অর্থাৎ যে সব দক্ষ-শ্রমিক সেক্টরে সংকট বিরাজ করছে, সেগুলোতে দ্রুত নিয়োগের পথ সুগম হবে। আর এর মধ্যদিয়ে রিপাবলিকানদের অভিবাসন-বিরোধী প্রচারণারও দাতভাঙ্গা একটি জবাব দেয়া সম্ভব হলো বলে ডেমক্র্যাটরা উল্লেখ করেছেন।
দক্ষিণের সীমান্ত বেআইনীভাবে অতিক্রমকারিদের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসাইলাম প্রার্থনা নিষিদ্ধ হওয়ার আদেশ জারির পর ট্রাম্প-সহ রিপাবলিকানরা বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার শোরগোল শুরু করেছিল। সেই ইস্যুটিকে নভেম্বরের ব্যালট যুদ্ধে রিপাবলিকানরা যাতে কাজে লাগাতে সক্ষম না হয়-সে জন্যে এই বিধি মন্ত্রের মত কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ডেমক্র্যাটরা আভাস দিয়েছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে হোয়াইট হাউজের ন্যায় কংগ্রেসেও ডেমক্র্যাটরা একচ্ছত্র আধিপত্য পেলে কমপ্রিহেনসিভ ইমিগ্রেশন রিফর্ম বিল পাশ করাও সহজ হবে। তারপরই সোয়া কোটি কাগজপত্রহীন অভিবাসীর সিটিজেনশিপ প্রাপ্তির দীর্ঘ প্রত্যাশার অবসান ঘটবে।
এই আদেশ জারির পরই প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন গ্রীষ্মের পরই সংশ্লিষ্টদের কাছে থেকে আবেদন জমা নেয়ার জন্যে। এজন্যে কোনো ফি ধার্য করা হবে কিনা তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে যারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি নন, নিয়মিতভাবে ট্যাক্স প্রদান করেছেন, গুরুতর কোন অপকর্মে জেল-জরিমানার শিকার হননি-তারা স্বাচ্ছন্দে সুযোগটি পাবেন।



