
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪ | প্রিন্ট | ১৪৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দু’ লক্ষাধিক শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারি নিউইয়র্ক সিটির একাউন্ট্যান্ট, স্ট্যাটিস্টিশিয়ান, ও অ্যাকচ্যুয়ারিজ ইউনিয়ন-‘লোকাল ১৪০৭’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা নবমবারের মত নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশি মাফ মিসবাহ উদ্দিন। একইসাথে টানা সপ্তমবারের মত ডিস্ট্রিক্ট ৩৭ এর ট্রেজারার নির্বাচিত হয়েছেন মাফ মিসবাহ। নিউইয়র্ক সিটির দু’লাখের অধিক শ্রমিক-কর্মচারি এ দুটি শ্রমিক ইউনিয়নের ভোটার-সদস্য। সবচেয়ে বড় কথা হলো উভয় সংগঠনই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসনে প্রভাবশালী শ্রমিক ফেডারেশন ‘এএফএল-সিআইও’র অধিভ’ক্ত। নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনে কর্মরত একাউন্ট্যান্ট, স্ট্যাটিস্টিশিয়ান, অ্যাকচ্যুয়ারিজ, ট্যাক্স অডিটর, বেনিফিটস এক্সামিনাররা হলেন এই শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য। তিন বছর মেয়াদী এ দায়িত্ব চলতি জুন থেকে শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে।
বিগত ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশি-আমেরিকান মাফ মিসবাহ উদ্দিন লোকাল ১৪০৭’র প্রেসিডেন্ট পদে টানা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। এশিয়ান আমেরিকানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদে নির্বাচিত হবার বিরল গৌরব অর্জন করেন। সিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় এ নেতা প্রথম এশিয়ান-আমেরিকান হিসেবে নিউইয়র্ক সিটির ৬২ টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ডিস্ট্রিক্ট (ডিসি)-৩৭ এর ট্রেজারার নির্বাচিত হন ২০০৪ সালে। ডিসি-৩৭ এর মেম্বার সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ৮৯ হাজার। নিউইয়র্ক সিটিতে কর্মরত শিক্ষক এবং পুলিশ অফিসার ছাড়া প্রায় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী (সাধারণ কেরানী থেকে ইঞ্জিনিয়ার, সায়েন্টিস্ট পর্যন্ত) ডিসি-৩৭ এর সদস্য। এসকল সদস্যের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেনিফিট পরিচালনা করেন ডিসি-৩৭ এর ট্রেজারার মাফ মিসবাহ উদ্দিন।
আবারো নির্বাচিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাফ মিসবাহ এক বিবৃতিতে বলেন, লোকাল ১৪০৭ এর সদস্যরা পুরো প্যানেল সহ আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন, বিপুল বিজয় এনে দিয়েছেন তার জন্য আমি অত্যন্ত সম্মানিত, অনুপ্রাণিত এবং গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি । তিনি বলেন. মেম্বারদের আন্তরিকতা দিয়ে আমাকে আবারও নির্বাচিত করার জন্য প্রত্যেককে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, সকল সদস্যের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে, তাদের অভিযোগগুলো দ্রুততম সমাধান সহ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমি বিগত বছরগুলোর ন্যায় শেষ দিন পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যাব।
নোয়াখালীর সন্তান এবং বর্তমানে সপরিবারে নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকায় বসবাসরত মাফ মিসবাহ আরো বলেন, ‘এটি কেবল নিছক একটি কাজ নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব। এটা আমার আবেগ, আনন্দ, এবং প্রাপ্তি। এই কাজে আমি সপ্তাহে সাত দিন, দিনে ২৪ ঘণ্টাই নিজকে বিলিয়ে দেই। লোকাল ১৪০৭ এর প্রিয় সদস্যরা আমাকে অনুপ্রাণিত করে, আমাকে উৎসাহিত করে এবং আমাকে পরিচালনা করে।’
লোকাল ১৪০৭ এর এ নির্বাচনে মাফ মিসবাহ উদ্দিনের প্যানেলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অপর কর্মকর্তারা হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেড মাতালন, সেক্রেটারি জুলি লাইসে, কোষাধ্যক্ষ মেরিলিন বালি, ট্রাস্টি আলেক্সান্ডার সৈকত, নূর আহমেদ, এবং এনামুল হক সোহাগ । এছাড়াও ডিসি-৩৭ এর ডেলিগেট হিসেবে নির্বাচিতরা হলেন আর্লিন আইকেন্স, ডেনিস এন্ড্রিজ, মেরিলিন এ বেলী, চার্লস ফরেস্ট, মহাদ্দিয়া মেরি, এবং জেড মাতালন, ডেলিগেট টু সেন্ট্রাল লেবার কাউন্সিল রিকি এল জেনকিন্স এবং সার্জেন্ট-এট-আর্মস জেনিস নার্স।
উল্লেখ্য, নিউইয়র্কে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত লোকাল ১৪০৭ এ প্রতিনিধিত্ব করেন ২.৪৮৭ জন একাউনটেন্ট, অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল স্পেশালিস্ট, বুকসকিপার, বিজনেস প্রমোশন কো-অর্ডিনেটর, কলেজ একাউনটেন্ট, ক্রাইম এনালিস্ট, ইউনিভার্সিটি প্যারোল এনালিস্ট, অর্থনীতিবিদ, ফাইন্যান্স এনালিস্ট, ইনভেস্টমেন্ট এনালিস্ট, ম্যানেজমেন্ট অডিটর, পার্চেসিং স্পেশালিস্ট, রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট এক্সামিনার, স্ট্যাটিস্টিসিয়ান, সিস্টেম এনালিস্ট ফাইন্যান্স, ট্যাক্স অডিটর এবং ওয়ার্কার্স কমপেনসেশন বেনিফিট এক্সামিনারগণ। লোকাল ১৪০৭ এর সদস্যরা সিটিওয়াইড মেয়রাল এজেন্সি, হেলথ অ্যান্ড হসপিটাল কর্পোরেশন, শিক্ষা বিভাগ, হাউজিং অথরিটি, ট্রানজিট অথরিটি, স্কুল কন্সট্রাকশন অথরিটি এবং সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে কর্মরত।
সিটি মেয়রের এবং স্টেট গভর্নর অফিসের মাধ্যমে সদস্যদের বেতন-ভাতাসহ, হেলথ ইন্সুরেন্স, প্রেক্রিপশন ড্রাগ, ওয়েলফেয়ার, এবং পেনশন সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বিষয়ে চুক্তি করেন লোকাল ১৪০৭ এর প্রেসিডেন্ট। এ গুরত্বপূর্ণ পদ দু’টি শুধু বাঙালি হিসেবেই নন, এশিয়ান আমেরিকান হিসেবেও একমাত্র মাফ মিসবাহ উদ্দিন-ই অলংকিত করে আসছেন।
মাফ মিসবাহ উদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বলস্টেট ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েট টিচিং এ্যাসিসটেন্সশীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন ১৯৮৪ সালের ২৮ আগস্ট। এর আগে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি গণিতে অনার্স সহ মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৮০ সালে একই ইউনিভার্সিটিতে ডেমোগ্রাফিতে দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। এ বিষয়ে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে আমেরিকা আসার আগ পর্যন্ত তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডবিøউএইচও (হু) এর একটি প্রকল্পে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। মাফ মিসবাহ ১৯৮৬ সালে বল স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে একচ্যুরিয়াল সায়েন্সে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এটি ছিল তার তৃতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি। একই বছর তিনি নিউইয়র্ক সিটির পেনশন ডিপার্টমেন্টে একচ্যুয়ারি হিসেবে যোগ দেন। চাকুরীর সুবাদে নিউইয়র্ক সিটির স্পসরশিপের মাধ্যমে তিনি ও তার পরিবার গ্রিনকার্ড লাভ করেন।
২০২২ সালে নিউ ইয়র্কসিটি মেয়র এরিক এডাম ও সিটি কাউন্সিল স্পিকার আদ্রিয়ানা এডামস যৌথভাবে মাফ মিসবাহ উদ্দিনকে নিউইয়র্ক সিটির ডিস্ট্রিক্টিং কমিশনার পদে নিযুক্তি দেন ও তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি ও সাউথ এশিয়ান, এবং একমাত্র মুসলিম এ পদে নিযুক্তি পান।
মাফ মিসবাহ ২০০৮ সালে একমাত্র সাউথ এশিয়ান হিসাবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ওবামার ডেলিগেট নির্বাচিত হন ও একই বছরের আগস্টে প্রতিষ্ঠা করেন মূলধারায় দক্ষিণ এশিয়ার ইমিগ্র্যান্টদের একমাত্র সংগঠন ‘অ্যালায়েন্স অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লেবার’ তথা অ্যাসাল। তিনি অ্যাসাল’র প্রতিষ্ঠাতা ও ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে আসালের ২১ টি চ্যাপ্টার ১১ স্টেটে কাজ করছে। এছাড়া বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ও নেপালে অ্যাসালের এফিপিলিয়েটেড শাখা রয়েছে।
অ্যাসালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ানদের মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে কমিউনিটির সুযোগ-সুবিধা, অভাব-অভিযোগ মূলধারার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। সাউথ এশিয়ানদের জীবন-মান উন্নয়নেও কাজ করছে সংগঠনটি।



