Advertisement Placeholder

নিউইয়র্কে ড. ইউনূসের নাগরিক সংবর্ধনা নিয়ে কাড়াকাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ২১৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

নিউইয়র্কে ড. ইউনূসের নাগরিক সংবর্ধনা নিয়ে কাড়াকাড়ি

‘বৈষম্যবিরোধী প্রবাসী সচেতন নাগরিক সমাজ’ এর সমাবেশে কথা বলছেন এডভোকেট জামাল আহমেদ জনি। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস নিউইয়র্কে অবস্থানকালে এক নাগরিক সমাবেশে ভাষণ দেবেন ২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। এটি অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বখ্যাত টাইমস স্কোয়ার সংলগ্ন ম্যারিয়ট মারক্যুইস হোটেলের বলরুমে। এর পর দিন ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন ড. ইউনূস। এ উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। নাগরিক সমাবেশের হোস্ট হতে চায় নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ সোসাইটি। পাশাপাশি আরেকটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে হোস্ট করার অভিপ্রায়ে। ভিতরে ভিতরে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারী-পেশাজীবীরাও তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে ঢাকার নির্দেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ কন্স্যুলেট সমাবেশের যাবতীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এবং সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন কন্সাল জেনারেল মো. নাজমুল হুদা এবং বক্তব্য দেবেন ড. ইউনূস। সর্বশেষ সরকারের আমলের মতো বৈষম্যহীন আন্দোলনের ফসল হিসেবে অভিষিক্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাধারণ প্রবাসীরা সরকার প্রধানের সমাবেশের হোস্ট করার সুযোগ পাবে-তেমন প্রত্যাশা ছিল অনেকের। কিন্তু সে প্রত্যাশা মাঠে মারা যাচ্ছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। এর ফলে প্রবাসীদের সমস্যা সরকার প্রধানকে অবহিত করার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও মূল ধারার রাজনীতিক (একইসাথে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা) গিয়াস আহমেদ এ সংবাদদাতাকে বলেন, দেশে ফিরলে এয়ারপোর্টে সমস্যা, প্রবাসীদের সহায়-সম্পদ নিয়ে সমস্যা, বিনিয়োগে আগ্রহীরা কী ধরনের বৈরী পরিস্থিতিতে বছরের পর বছর মাতৃভূমিতে কিছু করতে সক্ষম হননি, অবকাশ যাপনকালে নিরাপত্তাহীনতা, এলাকার চাঁদাবাজ-মাস্তানের কবলে পড়া এবং সর্বোপরি এনআইডি কার্ড না পাওয়ায় আমেরিকা-কানাডার প্রবাসীদের কী ধরনের পরিস্থিতির ভিকটিম হতে হচ্ছে ইত্যাদি সবিস্তারে ড. ইউনূসের গোচরে আনার জন্য এই সমাবেশে কথা বলার অধিকার দেওয়া উচিত। গিয়াস আহমেদ আরো বলেন, জুলাই-আগস্টেও ছাত্র-জনতার বিপ্লবে নিহতদের স্বজন এবং আহতদের পাশে দাঁড়ানোর অভিপ্রায়ে আমরা চেম্বারের পক্ষ থেকে এক কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থের একটি চেক দেব ড. মুহম্মদ ইউনূসকে। এ ধরনের তহবিল প্রদানের আগ্রহ আরো কিছু সংগঠনের রয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটিও বন্যার্তদের জন্য ৩০ লাখ টাকার সমপরিমাণের ডলার দিতে চায়। সেই চেকটিও নিজ হাতে নিতে পারবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু ঢাকা থেকে অনুমতি না পাওয়ায় নিউইয়র্ক কন্স্যুলেট কিছুই করতে সক্ষম হচ্ছেন না।
এ অবস্থায় নিউইয়র্ক অঞ্চলে আমব্রেলা সংগঠন খ্যাত ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’ গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করেছে। তারা বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের জন্য আসা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানকে সংবর্ধনা প্রদান করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অথবা মিশনের কর্মকর্তারা। দলীয় ফোরামে সেসব হওয়ায় দল-নিরপেক্ষ প্রবাসীরা কথা বলার কোন সুযোগই পান না। তাদের সমস্যা-সম্ভাবনার কথাও জানতে সক্ষম হোন না সরকার প্রধানেরা। বর্তমানে পরিবর্তিত একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকার ছাত্র-জনতার দাবি অনুযায়ী- রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন। তাঁর এই সফর অন্যান্য সরকার প্রধানের সফরের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। আমরা আশা করছি-নিরপেক্ষ, নির্দলীয় এই সরকার প্রধানের কাছে সমস্ত প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মনের কথাগুলো সহজে বলার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশ সোসাইটিও সমস্ত প্রবাসী বাংলাদেশির পক্ষ থেকে সেই সুযোগটি গ্রহণ করতে চায়। সে আলোকেই আমরা সমস্ত প্রবাসীদের আমব্রেলা সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র পক্ষ থেকে এবারের নাগরিক গণসংবর্ধনার আয়োজন করতে আগ্রহী। যেহেতু এখন রাজনৈতিক সরকার নেই, তাই প্রবাসী রাজনৈতিক দলের শাখা কর্তৃক আয়োজনের ব্যাপারও নেই। আর এর মাধ্যমে আমরা প্রবাসীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও সমস্যা সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারে প্রবাসীদের বিভিন্ন বিষয় আমরা সরাসরি সরকার প্রধানের সামনে তুলে ধরতে চাই।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উল্লেখ করা হয়, আপনারা জানেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাংলাদেশ সোসাইটি প্রাথমিকভাবে ৩০ লক্ষ টাকার একটি তহবিল প্রদান করেছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সেই স্মারকও প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করতে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর সরকার নিয়েছে, তার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে প্রবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব সংক্রান্ত একটি স্মারকলিপিও আমরা তাঁকে দিতে চাই।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, আমরা বাংলাদেশ সোসাইটির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, নিউইয়র্ক কনস্যুলেট এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেছি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতাও একান্ত কাম্য।
৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিটির এলমহার্মস্টস্থ সোসাইটির নিজস্ব অফিসে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী। এরপর সভাপতি মোহাম্মদ রব মিয়া লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এসময় সোসাইটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রহীম হাওলাদার সহ সোসাইটির অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে সহসাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ নওশেদ হোসেন এবং প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও ‘বৈষম্যবিরোধী প্রবাসী সচেতন নাগরিক সমাজ’ এর ব্যানারেও একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ড. ইউনূসের সমাবেশের হোস্ট হবার আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে অন্যান্যের মধ্যে কথা বলেন বাংলাদেশ সোসাইটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিএনপি নেতা এডভোকেট জামাল আহমেদ জনি, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রিটা রহমান, ড. শওকত আলী, ড. আবুল কাশেম, মোশারফ হোসেন সবুজ প্রমুখ।
উল্লেখ্য, নাগরিক সমাবেশ আয়োজনে বাংলাদেশ কন্স্যুলেটকে সহায়তা দিচ্ছেন নিউইয়র্কে বসবাসরত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এ নিয়ে কন্সাল জেনারেল নাজমুল হুদার সাথে তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন। কন্সাল জেনারেল নাজমুল হুদা এ প্রসঙ্গে বলেন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী নাগরিক সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রবাসীগণের সহায়তা নিচ্ছি আমন্ত্রণপত্র বিতরণের জন্য। কম্যুনিটি অনেক বড়। দাওয়াত দিতে পারবো মাত্র ৫০০ জনকে। তাই তালিকাটি খুবই সতর্কতার সাথে করতে হচ্ছে। এ লক্ষে প্রবাসের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বকারীগণের সহযোগিতাও পাচ্ছি।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস ৭৯ তম সাধারণ অধিবেশনে ২৭ সেপ্টেম্বর সকালের দিকে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। সেটি হতে পারে বেলা ১১টা থেকে একটার মধ্যে। উল্লেখ্য, এদিনই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগের কথা ড. মুহম্মদ ইউনূসের। জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের নেতাদের পাশাপাশি মহাসচিবের সাথেও ড. মুহম্মদ ইউনূসের বৈঠক হবে। বাংলাদেশের পরিস্থিতির আলোকে করণীয় নিয়ে এ সময় কথাবার্তা হবে বলে ক‚টনীতিকরা জানান। জাতিসংঘে বাংলাদেশের নেতা হিসেবে ড. ইউনূসের যাবতীয় কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাচ্ছেন স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এম এ মুহিত। ‘কাউকে পেছনে না রেখে, বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার অগ্রগতির জন্য একত্রে কাজের সংকল্প’ হচ্ছে এবারের সাধারণ অধিবেশনের মূল স্লোগান। এটি ২৪ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্বনেতারা এতে বক্তব্য দেবেন। বাইডেনের সাথে সাইড-লাইনে ড. ইউনূসের বৈঠক হবে কিনা তা এ সংবাদ লেখার সময় পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে যে, দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকসমূহ নিয়ে কাজ চলছে। তবে গণমাধ্যমে দেওয়ার মতো কিছু আপাতত নেই।
জানা গেছে, ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে ড. ইউনূস নিউইয়র্কে আসার কথা ২২ সেপ্টেম্বর। জেএফকে এয়ারপোর্টে যথারীতি কাল পতাকা প্রদর্শন ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ। জাতিসংঘে তার ভাষণের দিনও বাইরে বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান জানান, বাংলাদেশের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের এবং প্রতিদিনই অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটছে। জুলুম-নির্যাতনের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে বাংলাদেশকে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এহেন জুলুম-নির্যাতন এবং নেতা-কর্মীদের বাড়ি লুটতরাজ শেষে অগ্নি সংযোগের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিধনের সুগভীর একটি ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশে। এসবের নিন্দা-প্রতিবাদ এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে জেএফকে এয়ারপোর্টে এবং জাতিসংঘের সামনে বিক্ষোভ করা হবে। প্রবাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও ড. ইউনূসকে স্মারকলিপি প্রদানের প্রস্তুতি চলছে। অপরদিকে, বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীরা জেএফকে এয়ারপোর্টে ড. ইউনূসকে স্বাগত জানাবেন বলে জানা গেছে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার