Advertisement Placeholder

রক্তে রঞ্জিত ফিলিস্তিন ও নির্বাক বিশ্ব

নাবিল নিজাম   |   শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ১৭৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

রক্তে রঞ্জিত ফিলিস্তিন ও নির্বাক বিশ্ব

নাবিল নিজাম

স্বাধীন মাতৃভূমির স্বপ্ন নিয়ে ফিলিস্তিনিরা দশকের পর দশক অপেক্ষার প্রহর গুনছে। বিনিময়ে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরেই হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের এই রক্তদান কবে সার্থক হবে? সফলতার সম্ভাবনা বিচার করতে হলে আগে দেখাতে হবে অতীত ইতিহাস কী বলে। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ভবিষ্যৎ সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর চারবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়েছে। কোনো যুদ্ধের ফল ফিলিস্তিনিদের অনুক‚লে আসেনি। ক্রমাগত আরব ভূমি হাতছাড়া হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এটা দিবালোকের মতো সত্য। ভূমি দখলের প্রক্রিয়াও থেমে নেই। আর এভাবে বসতি স্থাপন নতুন নয়; ১৯৪৮ সালে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে বিতাড়ন ও ৫০০ বসতি গুঁড়িয়ে দিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে থেকে আজ অবধি ৫১ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুহারা হয়েছে। হতাহতের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রত্যেক দিন নিহতের তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েল ভূখন্ডে প্রথম আক্রমণ করে। এরপর থেকে পাল্টা আক্রমণে ও ইসরায়েলের নির্বিচার বিমান হামলায় ৪১ হাজারের বেশি বেসামরকি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত প্রায় ১ লাখ মানুষ। নিহতদের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি শিশু। এখনও হামলা অব্যাহতভাবে চলছে।
গাজায় নির্বিচার হত্যাকান্ড শুরুর পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অধিকৃত ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়েছে। ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবে তিন দফা ভেটো দিয়েছে। সম্ভবত, ইসরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তীব্র প্রতিক্রিয়া, নির্বাচনি বছরে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাতকঠিন সমর্থনের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সমালোচনা ইত্যাদি কারণে ওয়াশিংটন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, কিংবা ভেটোও প্রয়োগ করেনি। রাষ্ট্রদূত জাতিসংঘকে বলেছেন, প্রস্তাবের সব বিষয়ে তাঁরা একমত নন। তাঁর এ বক্তব্যে প্রায় ৪১ হাজার বেসরকারি ফিলিস্তিনি নাগরিক হত্যা নিয়ে মার্কিন সরকারের যে নৈতিক অস্পষ্টতা, তা প্রকাশ্যে আসে। তারা হয়তো এখন ভাবছে গণখুনের প্রতিটি ঘটনায় ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর চেয়ে এ অবস্থান শ্রেয়তর।
যদিও গাজার মানুষের যে ভোগান্তি এবং এই ভোগান্তির যে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্যাপনের কিছু নেই। প্রস্তাব পাস হলেও এখনো পর্যন্ত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি লক্ষ্য করা যায়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তথা জাতিসংঘ কেবলই নিন্দা প্রস্তাব পাস ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।
মুসলিম বিশ্ব শক্ত অবস্থান নিতে পারে না কেন : মুসলমান প্রধান দেশগুলো সব সময় ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং ‘নিপীড়িত’ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসলেও বড় ধরনের সংকট এলে পুরো মুসলিম বিশ্বকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খুব একটা শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায় না। এমনকি মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি কিংবা আরব লীগও ইসরায়েলের সাথে সংকটকালে ফিলিস্তিনের পক্ষে খুব জোরালো কোন ভূমিকা নিতে পারে না। এবার গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাস ইসরায়েলি ভূখন্ডে অতর্কিত ভয়াবহ হামলার পর নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। উভয় পক্ষের আক্রমণে বহু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের সর্বাত্মক সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। এর বিপরীতে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে ইরান ছাড়া আর কোন দেশকেই উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। বরং কোন কোন মুসলিম দেশের প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই নখদন্তহীন। বিশ্লেষকরা বলছেন মুসলিম বিশ্বের জনগণ ফিলিস্তিনের পক্ষে একাট্টা হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে সরকারগুলোর পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়া অসম্ভব।
হামাসের যাত্রা উত্থান : মিসরের ইসলামী রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড। দখলদার ইসরায়েলিদের কাছে বাস্তুচ্যুত অনেক ফিলিস্তিনি মিসরে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ব্রাদারহুডের আদর্শে দীক্ষা নেন। ১৯৮৭ সালে এমনই দুজন আহমেদ ইয়াসিন ও আব্দেল আজিজ আল-রানতিসি প্রতিষ্ঠা করেন হামাস। হামাস হচ্ছে, হারকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া-এর সংক্ষেপ, যার অর্থ ইসলামী নবজাগরণের আন্দোলন। হামাস শব্দের অর্থ উদ্দীপনা, গভীর দেশপ্রেম। সাংগঠনিক সনদ অনুযায়ী, দখলদার ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে উৎখাত করে একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করাই হামাসের লক্ষ্য। পরবর্তীতে অবশ্য সংগঠনটি বলেছে, ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমানায় ফিরে গেলে, অর্থাৎ ওই যুদ্ধের সময়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সেখানে ফিরতে দিলে তারা ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু, ইসরাইল এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়। দখলদার শক্তিটি ফিলিস্তিনের এক ইঞ্চি ভূমিও ছাড়তে রাজি নয়।

হামাসের সাংগঠনিক কাঠামো, সমর্থন দেয় কারা : হামাসের প্রধান শাখা দুটি। এর একটি সাংস্কৃতিক, যার নাম দাওয়াহ। সামরিক শাখার নাম ইজ্জ আদদ্বীন আল-কাসসাম ব্রিগেডস। হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান এবং ইরান সমর্থিত সিরিয়ার সরকার ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী। এই জোটের সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির ঘোর-বিরোধী। সম্প্রতি আক্রমণ সম্পর্কে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ঘটনা দখলদারিত্বের মুখে ফিলিস্তিনি জনগণের গভীর আস্থার প্রমাণ। গাজা ছাড়াও পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হামাসের সমর্থকরা রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পশ্চিমাদের সমর্থক সরকার থাকলেও, সাধারণ জনগণের কাছে হামাসের গ্রহণযোগ্যতা আছে। ইতোমধ্যেই সিরিয়া, ইরান ও ইয়েমেন হামাসের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে এই আক্রমণকে ‘বীরোচিত’ ও ‘গর্বের’ বিষয় বলে অভিহিত করেছে। আরব লীগ ও জর্ডান বর্তমান সংঘাত শুরুর পেছনে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের চালানো নিষ্ঠুরতাকে দায়ী করেছে। সৌদি আরব, মরক্কো এবং ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ দোসর মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসির সরকার অস্ত্র সম্বরণের আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আছে- যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, মিসর ও জাপান।
হামাস কি বেসামরিকদের হত্যা করছে? হামাসের মুখপাত্র ওসামা হামদান জানায়, হামাস বেসামরিকদের ওপর হামলা করছে না। যদিও এর আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করে, হামাসের হাতে ইসরাইলি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অ্যামনেস্টিকে উদ্দেশ্য করে ওসামা হামদান বলেন, বসতি স্থাপনকারী এবং বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে পার্থক্য জানতে হবে। বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করেছে। এ সময় দক্ষিণ ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিকরাও বসতি স্থাপনকারী কিনা জানতে চাইলে হামদান বলেন, সবাই জানে সেখানে বসতি রয়েছে। আমরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেসামরিক কাউকে লক্ষ্যবস্তু করছি না। আমরা ঘোষণা করেছি বসতি স্থাপনকারীরা দখলদারত্বের অংশ এবং সশস্ত্র ইসরাইলি বাহিনীর অংশ। তারা বেসামরিক নয়।

স্বাধীন ফিলিস্তিনই সমাধান : ফিলিস্তিনিদের এ ভূখন্ডের মধ্যে স্থান দিতে হবে এবং নাগরিক হিসেবে পূর্ণ সম্মান ও অধিকার দিতে হবে। এ অধিকারগুলো তাদের সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পর হবে নাকি পূর্ণ নাগরিক হিসেবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে থেকে হবে, তা ইসরায়েলি নেতাদের সিদ্ধান্ত। ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এখন থেকে তাদের এ বিবেচনা করতে হবে। পূর্ণ সার্বভৌমত্বের সঙ্গে পুরো পশ্চিম তীর এবং গাজা নিয়ে গঠিত একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এমন একটি আদর্শ, যা প্রত্যেক ফিলিস্তিনি চায়। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে সাত দশকের বেশি সময় ধরে চলা মানবসৃষ্ট সংকটের অবসান ঘটতে পারে। মুসলিম বিশ্ব থেকে উদ্ভূত বেশির ভাগ অস্থিরতার এখন একটিই মূল কারণ, ফিলিস্তিনিদের তাদের মাতৃভ‚মি থেকে জোরপূর্বক দখল ও উচ্ছেদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আরব দেশগুলো বা পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজার খুব একটা আগ্রহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র দোসর হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করে, কিন্তু তার উদ্দেশ্যগুলো সন্দেহজনক হয়ে ওঠে যখন তার কংগ্রেস থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার জন্য নির্লজ্জ সমর্থন পাশাপাশি উচ্চারিত হতে থাকে। এ দ্বিমুখী আচরণ এ প্রচেষ্টাকে মিথ্যা প্রমাণ করে। প্রসঙ্গত, ১১ মাস ধরে গাজায় পুরো হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। শুধু তাই নয়, হামাস নির্মূলের নাম করে গোটা গাজা ভূখন্ড গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল। এ অবস্থায় বহুদিন ধরেই যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে চাইছে হামাস। এবার সংঘাত থামাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াতে আমেরিকার কাছে আর্জি জানিয়েছে তারা। হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আর অন্ধ হয়ে থাকবেন না। এবার ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার