
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৪ | প্রিন্ট | ৫৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই পরস্পরকে আক্রমণাত্মক বক্তব্য/মন্তব্য তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
মার্কিন রাজনীতি কিংবা নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থনের ক্ষেত্রে একেবারেই দূরে থাকা বিল গেটস এবার কমলা হ্যারিসের নির্বাচনি তহবিলে ৫০ মিলিয়ন ডলারের চাঁদা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটস এই অর্থ দিয়েছেন একটি অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে। সেই সংস্থাটি সরাসরি কমলা হ্যারিসের নির্বাচনে কাজ করছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটস জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের উদ্ভট মতামতে অতিষ্ঠ হয়েই কমলার পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। আসন্ন নির্বাচনটি নানা দিক থেকেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিল গেটস।
বিল গেটস এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, আমি ওই প্রার্থীকে সমর্থন করি, যিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি দেবেন। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করার আমার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচন ভিন্ন। কমলার সঙ্গে গেটসের সম্পর্ক খুব একটি গভীর নয়। তবে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জো বাইডেন-কমলা হ্যারিস প্রশাসনের কাজের প্রশংসা করেছেন। সূত্র আরও বলেছ, গেটস ‘ফিউচার ফরোয়ার্ড’কে অনুদান দেওয়ার কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে ট্রাম্পের বিজয়ে বিশ্বের অপর সেরা ধনী উদ্যোক্তা-উদ্ভাবক ইলন মাস্ক ৭৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের কথা বলেছেন। অর্থাৎ নির্বাচনি শিবিরে সম্পৃক্ত হয়েছেন বিশ্বের সেরা ধনীরাও বিপুল অর্থ নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র ১২ দিন বাকি। এই শেষ মুহূর্তে এসে নতুন জরিপে দেখা যাচ্ছে, রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে জনসমর্থনে আরও এগিয়ে গেছেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী কমলা হ্যারিস। রয়টার্স/ইপসোস পরিচালিত ছয় দিনের নতুন এই জরিপে ৪৬ শতাংশ ভোটার হ্যারিসকে সমর্থন করেছেন। আর ৪৩ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস তিন শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে গেছেন। জরিপটি সোমবার শেষ হয় এবং তার ফলাফল মঙ্গলবার জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে রয়টার্স/ইপসোস পরিচালিত জরিপে হ্যারিস পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ সমর্থন, আর ট্রাম্প পেয়েছিলেন ৪২ শতাংশ সমর্থন। দুই প্রার্থীর মধ্যে এবারের ৫ নভেম্বরের নির্বাচনি লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি হবে সে ধারণাই আরও পোক্ত করেছে নতুন জরিপগুলোর ফল। নির্বাচনি সমাবেশের ফাঁকে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে রিপাবলিকান নীতি-নির্ধারকরা বিজয়ী হতে পারলে হোয়াইট হাউসকে কোন দিক-নির্দেশনায় পরিচালিত করা হবে তা নিয়ে ঘন ঘন বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন বলে রিপাবলিকান শিবির থেকে জানা গেছে। তারা মার্কিন প্রশাসনে রদবদলের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিতেও আমূল পরিবর্তন সাধনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর অন্যতম হচ্ছে অভিবাসনের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন, বিচার বিভাগকে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষের বিচারের নির্দেশ, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, আমেরিকার অর্থনৈতিক নীতিগুলোকে ইউরোপ থেকে গুটিয়ে নেওয়া, ইউরোপ থেকে সামরিক পশ্চাদপরসারণ এবং গণতান্ত্রিক সিটিগুলোয় একতরফাভাবে সেনা মোতায়েন করার পরিকল্পনা। ট্রাম্পসহ সবাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসীকে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার এবং বহিষ্কারের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন বলেও সূত্রে বলা হয়েছে। একইভাবে এখন যারা ট্রাম্পের বিরোধিতা করছেন তাদেরও জেলে ভরাব নীল-নকশায় হাঁটছে ট্রাম্প শিবির। প্রয়োজনে বিচারিক আইনের সংশোধনেও তারা পিছপা হবেন না বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, সীমান্ত জোরপূর্বক পাড়ি দিয়ে আসা বিদেশির সংখ্যা কমাতে তাদের আশপাশের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া, আবারও মুসলিম অধ্যুষিত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি, কাগজপত্রহীন অভিবাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের সিটিজেনশিপ প্রদানের প্রথা বিলুপ্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে একাধিকবার এমন মনোভাবের প্রকাশ ঘটালেও ট্রাম্পের পক্ষে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি কংগ্রেসের অনুমোদন না পাওয়ায়। যেমন বর্তমানে বাইডেনের পক্ষেও অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের একচ্ছত্র আধিপত্য না থাকায়।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও অভিবাসন নিয়ে ভোটারদের অখুশি দেখা গেছে রয়টার্স/ইপসোসের নতুন জরিপে। এই বিষয়গুলোতে ভোটাররা ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৭০ শতাংশই জীবনযাপন ব্যয় ভুল পথে যাচ্ছে বলে মনে করছেন। অর্থনীতি ভুল পথে যাচ্ছে মনে করছেন ৬০ শতাংশ ভোটার। অভিবাসননীতি নিয়ে একই অবস্থান ৬৫ শতাংশ ভোটারের। ভোটাররা আরও বলেছেন, অর্থনীতি, অভিবাসন এবং গণতন্ত্রে হুমকি এখন দেশের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা। এসব বিষয়ে কোন প্রার্থীর অবস্থান ভালো- সে প্রশ্নে অর্থনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোটার। আর হ্যারিসের পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৮ শতাংশ ভোটার।
অন্যদিকে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও হ্যারিসের পক্ষে সমর্থনের এ হার যথাক্রমে ৪৮ ও ৩৫ শতাংশ। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত- সে প্রশ্ন জরিপে অংশগ্রহণকারীরা অভিবাসনকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ৩৫ শতাংশ ভোটারের মতে, নতুন প্রেসিডেন্টকে সবার আগে অভিবাসনে নজর দেওয়া উচিত। আর ১১ শতাংশ ভোটার আয়বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবা ও ট্যাক্সে সমান ১০ শতাংশ শেয়ারের কথা বলেছেন। তবে রাজনৈতিক উগ্রপন্থা ও গণতন্ত্রে হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের তুলনায় হ্যারিস জনসমর্থন বেশি পেয়েছেন। জরিপে দেখা গেছে, এই দুই বিষয়ে হ্যারিসকে সমর্থন দিয়েছেন ৪২ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে, ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন ৩৫ শতাংশ ভোটার। আবার গর্ভপাত এবং স্বাস্থ্যসেবা নীতিতেও ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন হ্যারিস। রয়টার্স/ইপসোস জরিপসহ জাতীয় সব জরিপেই ভোটারদের দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যের ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের ফলই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী কে তা নির্ধারণ করে দেয়। আর সাতটি দোদুল্যমান স্টেটের ফলেও চূড়ান্তভাবে বিজয়ী নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করেছিলেন প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। হিলারি সেবার জাতীয় পপুলার ভোটে ২ পয়েন্টে জয়ী হলেও ট্রাম্প ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের জোরে নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করেছিলেন।



