বুধবার ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শীর্ষ নেতৃত্বের আহ্বান, কমিউনিটির স্বার্থেই দরকার ঐক্য

ভাগাভাগির ৩৬তম ফোবানা সম্মেলন

বিশেষ সংবাদদাতা   |   শুক্রবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট  

ভাগাভাগির ৩৬তম ফোবানা সম্মেলন

ফোবানার সমাপ্তি রজনীতে সামনের বছর ৩৭তম কনভেনশনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কানাডার মন্ট্রিয়ল, টেক্সাসের ডালাস এবং কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেন সিটিতে। ৩ ভাগে বিভক্ত ৩৬ তম ফোবানার প্রতিটিতেই কম্যুনিটির ঐক্য প্রত্যাশার পাশাপাশি প্রবাস প্রজন্মে বাঙালি সংস্কৃতি জাগ্রত রাখার সংকল্প ব্যক্ত করা হলো ৩ দিনের কনভেনশন থেকে। এগুলো অনুষ্ঠিত হয় ২-৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যথাক্রমে ক্যালিফোর্নিয়ার লসএঞ্জেলেস, ইলিনয়ের শিকাগো এবং কানাডার মন্ট্রিয়লে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে বিরোধ ঘটায় দুই দশক আগে থেকেই ফোবানা বিভক্ত ছিল।

এবার তা আরেক দফা সম্প্রসারিত হয়ে ৩ ভাগ হয়েছে। তবে লসএঞ্জেলেস বারব্যাংক ম্যারিয়টের ফোবানার সকল কার্যক্রম ছিল ‘মূল চেতনা’র সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্লোগান ছিল ‘আমরা করবো জয়’ এবং উৎসর্গ করা হয় জাতির জনকের স্মৃতির প্রতি। লসএঞ্জেলেস ফোবানার বর্তমান কমিটির মেয়াদ দু’বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ এর চেয়ারম্যান হচ্ছেন আতিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি ড. রফিক খান। অপরদিকে শিকাগো ফোবানার সমাপনীতে নতুন কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন আহসান চৌধুরী হিরু এবং সেক্রেটারি নাহিদুল খান। কানাডার মন্ট্রিয়লের ফোবানা কনভেনশনে গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন গিয়াস আহমেদ এবং সেক্রেটারি জেনারেল শাহনেওয়াজ। সকলেই কম্যুনিটির ঐক্যের সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। সে আলোকে তিন গ্রুপের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বললে তারা সকলেই ঐক্যের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আহসান চৌধুরী হিরু বলেন, ‘আমার একক কোন মতামত নেই। কমিটির সকলে বসে যে সিদ্ধান্ত হবে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।

আতিকুর রহমান বললেন, আমি ফোবানার শুরু থেকেই সক্রিয় রয়েছি। তাই অনৈক্য তৈরির পক্ষে কখনোই ছিলাম না। তবে সে ঐক্যের ভিত হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, লাল-সবুজের পতাকা ঘিরে। গিয়াস আহমেদ বলেন, ব্যক্তি নয় সংগঠনকে আমরা অধিক গুরুত্ব দেব। যেহেতু সংগঠনের মোর্চা হচ্ছে ফোবানা। তাই সকল সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে যে ঐক্য তৈরি হবে তা কখনোই ভাঙবে না।

শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ফোবানার ‘বিশেষ সম্মাননা’ প্রাপ্ত মার্কিন মুল্লুকে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রথম ভার্সিটি ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র চ্যান্সেলর এবং সিইও ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ বলেন, ফোবানাকে নিরঙ্কুশভাবে কম্যুনিটির ঐক্যের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা পরিহার করে মার্কিন রাজনীতির ধারায় চলতে হবে। অর্থাৎ ফেডারেল, স্টেট, সিটি কিংবা প্রাইভেট কোন সংস্থায় যারা কাজ করেন তাদের কেউই দল-নিরপেক্ষ নন। ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান কিংবা স্বতন্ত্র হিসেবে তালিকাভুক্ত ভোটার। তবে কর্মস্থলে সেটি প্রাধান্য পায় না।

একইভাবে প্রবাসীদেরও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ফোবানায় কাজ করতে হবে। আবু হানিপ বলেন, এবার ফোবানা নামে ৪টি এবং আরেকটি বাংলাদেশ কনভেনশন হলো একই সময়ে। যদি একটিমাত্র ফোবানা হতো তাহলে বেঁচে যেত অপর ৪টির খরচ এবং ফোবানায় কমপক্ষে ৫ হাজার প্রবাসীর সমাগম ঘটতো। ঐক্যবদ্ধ কম্যুনিটি দেখলে মার্কিন রাজনীতিক, বাইডেন প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকরাও বাংলাদেশি আমেরিকানদের আরো বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেমনটি ভারতীয়রা পাচ্ছে। তারা হোয়াইট হাউস, ক্যাপিটল হিল, স্টেট গভর্নর, সিটি প্রশাসন ছাড়াও সিনেট ও কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট অফিসে নিয়োগ পাচ্ছে। আবু হানিপ উল্লেখ করেন, ফোবানার চেতনার পরিপূরক কর্মকাণ্ড থেকে আমরা ক্রমে দূরে সরে এসেছি। আমাদের সন্তানেরা কম্যুনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। আমরা যদি জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তাহলে সন্তানেরাও ফোবানার বিশাল সমাবেশে এসে সমবয়েসীদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ পাবে। পরস্পরের সান্নিধ্যে এলে বৈবাহিক যোগসূত্র রচিত হবে। এটা হচ্ছে সময়ের দাবি। অন্তত সন্তানের কথা ভেবে হলেও সকলের উচিত দ্বিধা-দ্বন্দের ঊর্ধ্বে উঠা।

বাংলাদেশের সামগ্রিক কল্যাণে কাজের স্বার্থেও অনৈক্য-বিভাজন দূরে ঠেলে দিয়ে পরস্পরের সহযোগি হয়ে ফোবানায় অংশগ্রহণ করা জরুরি। তাহলে আমেরিকান ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে। চ্যান্সেলর হানিপ উল্লেখ করেন, ফোবানার সামনের ৩৭তম সম্মেলনের আগেই সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে আশা করছি। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ভিন্ন ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী যেন না হয়-সেটি সকলকে খেয়াল রাখতে হবে।
এ সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত জর্জিয়া স্টেট সিনেটর শেখ রহমান ছিলেন শিকাগো কনভেনশনে। সেখানকার বিভিন্ন পর্বে আলোচনায় তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, আমেরিকান স্বপ্ন পূরণের পথ সুগম করতে হলে মূলধারার রাজনীতিতে আরো জোরালোভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। এ নিয়ে কালক্ষেপণের অবকাশ থাকতে পারে না। আশা করছি ফোবানা তেমন একটি প্ল্যাটফরমে পরিণত হবে সামনের বছর থেকেই।

ফোবানার গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হয়েছেন লসএঞ্জেলেস কম্যুনিটির নেতা ও মূকাভিনেতা কাজী মশহুরুল হুদা। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন প্রিয় মাতৃভ‚মির সঙ্গে প্রবাস প্রজন্মের সম্পর্ক নিবিড় করতে ঐক্যের বিকল্প নেই। এজন্যে কাজ করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবেন না বলে উল্লেখ করেন কাজী হুদা।
৩৫ বছর আগে ফোবানার যাত্রা শুরু হয়েছে। এর ঐক্য কখনোই অটুট ছিল না। হঠাৎ ঐক্যের ভিত তৈরি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। কেন এমন নাজুক অবস্থা, কেনইবা প্রতিষ্ঠার সংকল্পের কাছাকাছিও যেতে সক্ষম হয়নি দীর্ঘ সাড়ে ৩ দশকেও-এমন আলোচনা এখন তীব্র হচ্ছে। কারণ, ফোবানার অনৈক্য ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হওয়ায় প্রবাস প্রজন্ম বাঙালি কম্যুনিটির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ছে। যদিও কিছুসংখ্যক ফোবানা কনভেনশনে সম্পৃক্ত হন, তারা সত্যিকার অর্থে কোন আনন্দবোধ করেন না কিংবা মা-বাবার কালচারের প্রতি আকৃষ্ট হতে চান না। তিনদিনব্যাপী কনভেনশনের একটি পর্বেও নতুন প্রজন্মের মতামত নেওয়া হয় না অথবা তাদের ভাষায় উপস্থাপিতও হয় না। ফলে তারা আইফোনে সময় কাটাতে বাধ্য হন।

এবারের ৩টি সম্মেলনেই অনেক প্রবাসীর সমাগম ঘটেছিল। কারণ, করোনায় বন্দিত্ব থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় ছিলেন অনেকে। যদিও সভা-সিম্পোজিয়াম-নাচ-গানে বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হননি কোনো পক্ষই। গতানুগতিক ধারায় সবকিছু চলেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভক্তি। গত বছর ওয়াশিংটন ডিসিতে বিএনপিপন্থি ফোবানার সম্মেলনে মারপিটের কারণে অভিযুক্ত শরাফত হোসেন বাবুকে ফোবানা থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই বাবু এবার নিউইয়র্কে ফোবানা কনভেনশনের আয়োজন করেছিলেন। অর্থাৎ আগে একই সময়ে দুটি করে কনভেনশন হলেও এবার চারটিতে রূপ নেয়। ফলে ফোবানার প্রতি সহজ-সরল প্রবাসীদের বীতশ্রদ্ধ বেড়েছে।
লসএঞ্জেলেস সম্মেলনে ৪৮, শিকাগো সম্মেলনে নন-ভোটিং মেম্বারসহ ৫৪টি সংগঠনের অংশগ্রহণ ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। মন্ট্রিয়লে ৪০টিরও অধিক সংগঠনের প্রতিনিধি ছিলেন। সবকটিতে মূলমঞ্চের অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

নেটওয়ার্কিংয়ে সাফল্য পরিলক্ষিত হয়েছে সর্বত্র। সকলেই পরম করুণাময়ের শোকরিয়া আদায় করেছেন করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ায়। একইসঙ্গে মৃত্যুবরণকারীদের আত্মার মাগফেরাত এবং এখনো যারা আক্রান্ত রয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্যে দোয়া করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন নজরুল গবেষক ও খ্যাতনামা নজরুল শিল্পী ড. লীনা তাপসি খান এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে লসএঞ্জেলেস কনভেনশনে। ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। এটি কোন দলের স্লোগান নয়। সে কথা দীপ্ত প্রত্যয়ে উচ্চারিত হয় লসএঞ্জেলেস কনভেনশনে এবং তা ধ্বনিত হয়েছে গান, কথামালা এবং বক্তব্যে। শিকাগো কনভেনশনে কিংবা মন্ট্রিয়ল কনভেনশনে তা পরিলক্ষিত হয়নি।
লসএঞ্জেলেস কনভেনশনের দাওয়াত রক্ষা করেননি সেখানকার কন্সাল জেনারেল। এ নিয়ে হোস্ট কমিটি ছাড়াও ফোবানার চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আউটস্ট্যান্ডিং মেম্বার জাকারিয়া চৌধুরী ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কনভেনশনে যোগদানে অনীহা প্রকাশের মধ্য দিয়ে লসএঞ্জেলেসের কন্সাল জেনারেল সামিয়া অঞ্জুম প্রবাসীদের কী মেসেজ দিলেন তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। তবে তিনি কনভেনশন সেন্টারে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু কর্ণারে বই প্রদান করেছিলেন।

শিকাগো কনভেনশনে অন্যতম প্রধান শিল্পী বেবী নাজনীনের গানে, লসএঞ্জেলেসে বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, এস আই টুটুল, শাহ মাহবুব, হৈমন্তীর গান আর তারিনের অভিনয়ে আপ্লুত ছিলেন সকলে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৫টি কনভেনশন আয়োজনে মোট ব্যয় হয়েছে মিলিয়ন ডলারের অধিক। এছাড়া আরো মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। এই দুই মিলিয়ন ডলারের দেড় মিলিয়নেরও অধিক সাশ্রয় হতো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে একটি কনভেনশন করা যেত। আর্থিক দিকটাকেও সামনে এনে ঐক্যের ফর্মুলা তৈরি করতে হবে। আগেই প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আমেরিকায় বাংলাদেশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় গত দুই দশকে ৫/৭ মিলিয়ন ডলারের অধিক এটর্নিকে দিতে হয়েছে। মামলার রায় এসেছে খুব কমসংখ্যক ক্ষেত্রেই। অনেকেই পরবর্তীতে আপস করেছেন অথবা মামলা কন্টিনিউ করেননি।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৫৪ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar