সোমবার ১৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অভিবাসী বাঙালির মূলধারার মার্কিন রাজনীতিতে বীরোচিত পদার্পন

ড. আতিউর রহমান   |   শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২২ | প্রিন্ট  

অভিবাসী বাঙালির মূলধারার মার্কিন রাজনীতিতে বীরোচিত পদার্পন

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাইরেও একাধিক বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি আসলেই চোখে পড়ার মতো। আগে মূলত যুক্তরাজ্যেই এমন বাংলাদেশের খোঁজ মিলত। এখন এর প্রসার ঘটেছে বিশ্বব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্রে এমন বাংলাদেশটি দারুণ প্রাণবন্ত এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। মাত্র কয়েক দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ও রাজনীতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের দীপ্ত অংশগ্রহণের পরিধি এতটা বেড়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। এজন্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে ধন্যবাদ না দিলে খুবই অন্যায় হবে। ‘অনারিং আউর হিরোস’ শিরোনামে এক চমৎকার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ প্রতিদিন গত ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যেবেলা। কুইন্সের লাগোয়ার্ডিয়া প্লাজা হোটেলে যেন ঠাঁই ধরে না। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নানা রাজ্য থেকে স্থানীয় ও রাজ্য সরকারের নির্বাচিত সদস্যদের সম্মান জানানোর এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিউইয়র্ক শাখা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের উত্তর আমেরিকা সংস্করণের নির্বাহী সম্পাদক লাবলু আনসারের প্রচেষ্টায় এতসব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একসঙ্গে করা সম্ভব হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে ২৭ জন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সম্মাননা দেয়া হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নাঈম নিজাম ছাড়াও বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সায়েম সোবহান আনভীরও যোগ দিয়েছিলেন এই অনুষ্ঠানে। আরও  উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিজনেজ এডিটর রুহুল আমিন রাসেল।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। আর বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামার অন্যতম উপদেষ্টা ড. নিনা আহমেদ। তিনি পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া সিটির ডেপুটি মেয়রও ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বাঙালির নাম উজ্জ্বল করা এই প্রতিনিধির উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানকে আরও মহিমান্বিত করেছিল। এ ছাড়াও সম্মাননা পেলেন রাজ্য সিনেটর শেখ রহমানসহ আরও অনেকেই। সেরাতে সম্মানিত হলেন আমাদের সবার পরিচিত মুখ মোরশেদ আলম, ড. নুরুন্নবী এবং আরও অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাত দিয়ে এই সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ প্রতিদিন বাঙালির মহত্মম অর্জনের সঙ্গে প্রবাসে তাদের আরেক সংগ্রামী বিজয়গাথাকে যুক্ত করে এক নয়া ইতিহাস গড়ল।

এই রকম একটি অসামান্য অনুষ্ঠানে আমাকে যুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানাই আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। প্রাবাসের এই বীরদের কয়েকজনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়ার এই গৌরবের কথা দীর্ঘ দিন আমার মনে থাকবে। বিশেষ করে নয়া প্রজন্মের কয়েকজন নারীর সম্মাননা লাভ এবং তাদের কণ্ঠে সাহসী উচ্চারণ পুরো অনুষ্ঠানকে দিয়েছে এক নয়া মাত্রা। ঘরে বাইরে এই নারীদের সংগ্রামের কথা শুনে আমরা সবাই সে সন্ধ্যায় অভিভ‚ত হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের শাহানা হানিফ এবং জামিলা উদ্দীনের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ আগামীতে বাঙালি তরুণীদের আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বেশি বেশি অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আমার মনে হয়েছে।

একদিনেই এই পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তিন দশক আগেও আমি এ দেশের মূলধারার রাজনীতিতে বাঙালির এতটা উপস্থিতি দেখিনি। তখন দেখতাম যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের বিভাজনধর্মী রাজনীতির বাড়াবাড়ি। সেই রাজনীতির রেশ এখনও আছে। তবে তার তীব্রতা কমেছে। এখন বরং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগ্রহই বেশি দেখতে পাচ্ছি। অবশ্যি বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পেশাদারী সমিতির উপস্থিতি আগেও ছিল। এখনো আছে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বেশি করে বাঙালির অংশগ্রহণ বেশ আশা জাগানিয়া এক বাস্তবতা বলে মনে হচ্ছে। যেখানে অভিবাসী বাঙালিদের সংখ্যা বেশি সেসব এলাকায় তারা এ দেশের স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। তাই একেবারে কমিউনিটি থেকে নির্বাচন করে করে উচ্চতর আইনসভায় তারা ঠাঁই করে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক সক্রিয়তার এক ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উভয় সমাজেই সভা সমিতির সংস্কৃতি বেশ জোরদার। তাই সংঘবদ্ধ হয়ে নিজ নিজ কমিউনিটির স্বার্থ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দেখে আমরা অবাক হই না। এভাবে চলতে থাকলে অভিবাসী-বান্ধব যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালিদের অনেকেই একদিন সর্বোচ্চ আইন সভার সদস্য নিশ্চয় হতে পারবেন। সেই আকাক্সক্ষাকে উৎসাহ দেওয়ার যে আয়োজন বাংলাদেশ প্রতিদিন করেছিল তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আরও ভালো লাগলো ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সমর্থকদের প্রতিনিধিরা কাঁধে কাঁধ রেখে এই সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার দৃশ্যটি দেখে। দল ও মত ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু সামাজিক সমাবেশে মিলেমিশে উপস্থিত থাকার এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা থাকাটা খুবই জরুরি। যদিও নির্বাচিত ডেমোক্রেট প্রতিনিধিরাই ছিলেন সংখ্যাগুরু। তবু নির্বাচিত রিপাবলিকান দুই একজন প্রতিনিধির অংশগ্রহণ ছিল সমান তালের। এটিই মার্কিনি গণতন্ত্রের সার কথা। সংখ্যা নয়, সব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমানতালে অংশগ্রহন পুরো অনুষ্ঠানকে এক নতুন মাত্রা দিতে পেরেছিল সেই সন্ধ্যায়।
শুধু বাংলাদেশ প্রতিদিনের এই অনুষ্ঠান নয়, নিউইয়র্কে একই সঙ্গ চলছিল ইউএস-বাংলাদেশ ট্রেড ফেয়ার। নিউইয়র্ক চেম্ব^ার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) যৌথ আয়োজনে বসেছিল বাণিজ্য মেলা।

পাশাপাশি চলছিল সেমিনার। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ডা. জিয়াউদ্দীন আহমদ ও বিশ্বজিৎ সাহা এই সেমিনারগুলোতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্টের ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও শিক্ষামন্ত্রী এই সব সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় সারা বিশ্বের শান্তি ও প্রগতির পক্ষে যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তা স্মরণীয় করে রাখার জন্য মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ঐদিনটিকে বাংলাদেশি ইমিগ্রেন্ট ডে হিসেবে পালন করার উদ্যোগ নেয়। উপযুক্ত লবিং করে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে আইন পাস করার ব্যবস্থা করেন। সেই দিবসটি পালনের লক্ষ্যে এ বছর টাইম স্কোয়ারের পাশেই মেরিয়ট হোটেলে তারা বঙ্গবন্ধুর একশটি আলোকচিত্রের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি তা উদ্বোধন করেন। আর বঙ্গবন্ধুর ভিশন ও বাংলাদেশি ইমিগ্রেন্ট ডের তাৎপর্য নিয়ে সেমিনারটিতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী। এছাড়া এফবিসিসিআই সভাপতি জনাব জসিমউদ্দীন, ঢাকা থেকে আগত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সদস্যবৃন্দ এই সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। নিউইয়র্ক চেম্বার ও মেয়র অফিসের প্রতিনিধিরাও এতে অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ের সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছি। প্রতিটি সেমিনারেই অর্থবহ আলাপ হয়েছে। তাছাড়া একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ যেভাবে বাল্টিমোরে পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র উঠাতে বাধা দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আইনসভার সদস্যদের সমর্থন আদায়ে কাজ করেছেন সেসব বিষয় নিয়েও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও আলাপ-আলোচনা হয়। এক সন্ধ্যায় যারা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছেন তাদের তিনজনকে বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়। আর প্রতি রাতেই ছিল সংগীতানুষ্ঠান।

সব মিলে এই ক’দিন যেন বাঙালির মিলনমেলা বসেছিল নিউইয়র্কে। বাংলাদেশ প্রতিদিন ও মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কাছে অনুরোধ তারা যেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জয়যাত্রা এবং প্রবাসী বাঙালিদের সাফল্যের কথা আরও ভালোভাবে প্রতি বছরই নানা সেমিনার ও অনুষ্ঠান মাধ্যমে তুলে ধরতে সক্রিয় থাকেন। এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, চেম্বার এবং গবেষক ও শিক্ষকদের সম্মিলনে এ ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুই দেশের নানামাত্রিক সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি হোক সেই কামনাই করছি। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই যে বাংলাদেশ জোর কদমে এগিয়ে চলেছে সেই বার্তাটি আরও স্পষ্ট করে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সে কারণেই এমন ধারার আয়োজন খুবই প্রাসঙ্গিক হতে পারে বলে মনে হয়েছে আমার। তাই এই আহ্বান।
লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:২৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বু বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar