রবিবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে নিউইয়র্কে সেমিনার

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র   |   শনিবার, ২২ অক্টোবর ২০২২ | প্রিন্ট  

বাংলাদেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে নিউইয়র্কে সেমিনার

‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব র্নির্বাচন’ শীর্ষক সেমিনারে জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা টিমের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম বলেছেন যে, নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের নির্বাচন এলেই নানা অভিযোগ উঠে। ভোট কারচুপি থেকে শুরু করে অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন লাভ, ভোটারকে অর্থ দিয়ে সম্ভব না হলে পেশীশক্তির প্রভাব অথবা জালিয়াতির মাধ্যমে ফলাফল নিজের অনুকূলে নেয়া ইত্যাদি কথা উঠে। এখনও তেমনটি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ভোটের সময় এলেই এক ধরনের অস্থিরতা গ্রাস করে রাজনৈতিক ময়দান থেকে সমস্ত জনজীবনকে। এহেন অবস্থার স্থায়ী সমাধানের বিকল্প হিসেবে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন ব্যবস্থা এখন গণতান্ত্রিক বিশ্বের বহুদেশে প্রচলিত রয়েছে। ড. নজরুল উল্লেখ করেন, এ ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু করা সম্ভব হলে প্রার্থী মনোনয়নের কৌশলে পরিবর্তন আসবে। দলগুলো নিজস্ব ফোরামে তার প্রার্থীগণের একটি তালিকা তৈরী করবে। সরেজমিনের অবস্থার আলোকে সারাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-কল্যাণে বিশেষ ধারণা অথবা এক্সপার্টিজ রয়েছে-এমন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেবে। কারণ ভোটের ব্যাপারটি তখন শুধু নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক হবে না।

সারাদেশের মানুষের মধ্যে সম্যক ধারণা থাকতে হবে সেই প্রার্থীর ব্যাপারে। ড. নজরুল বলেন, এ ব্যবস্থার আলোকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনীতিক, নীতি-নির্দ্ধারকের সাথে কথা হয়েছে। লেখালেখিও করেছি, করছি। আমার একটি গ্রন্থও রয়েছে এ নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় পার্টির অনেকে এমন ধারণাকে খুবই উপযোগী মনে করলেও বৃহৎ দল আওয়ামী লীগ থেকে সম্মিলিত সাড়া পাবার পরিস্থিতি এখনও তৈরী হয়নি। বিএনপির কেউ কেউ এমন ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানালেও সকলে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলেই মনে হচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে চলমান বাদানুবাদের পরিসমাপ্তির জন্যে বিকল্প এই পন্থার গুরুত্ব অপরিসীম বলে প্রগ্রেসিভ ফোরামের এই সেমিনারে অংশগ্রহণকারিরা মনে করছেন। এটি অনুষ্ঠিত হয় ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে একটি মিলনায়তনে। সেমিনারের দর্শক-শ্রোতারা সচরাচর বেশীক্ষণ অবস্থান করেন না। এখানে ছিল ভিন্ন অবস্থা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৯০% দর্শক-শ্রোতা নিমজ্জিত ছিলেন বিষয়ের গভীরতায়। অর্থাৎ প্রত্যেকেরই প্রচন্ড একটি আগ্রহ ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন সাধনে বিকল্প এই ইস্যুর প্রতি। এ সময় উপস্থিত সুধীজনের কৌতুহল মেটাতে সাদামনের মানুষ হিসেবে প্রবাসে খ্যাতি থাকা ড. নজরুল উল্লেখ করেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে জাতীয় সংসদে আরো ভালো লোক আসতে পারবেন, বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কের মান আরো বাড়বে, জনগণ যে ভ’মিকা আশা করে তারও প্রতিফলন ঘটবে। ড. নজরুল বলেন, বর্তমানের প্রচার মানে কেবলমাত্র এলাকাভিত্তিক ইস্যুগুলো স্থান পায়। অর্থাৎ নির্বাচিত হলে কে কতটুকু সড়ক পাকা করবেন, কটি ব্রীজ বানাবেন, নয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানমূহকে জাতীয়করণ করবেন, ইত্যাদি।

কিন্তু সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থায় জাতীয় ইস্যুগুলো প্রাধান্য পাবে। কারণ, জাতীয় সংসদে তো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়েও কথা বলার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তা ততটা দেখা যাচ্ছে না। আরেকটি বিষয় রয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থায় এমপি গণকে স্থানীয় সরকারের অভিভাবকে পরিণত করা হয়েছে। অথচ প্রতিটি উপজেলাতেই নির্বাচিত চেয়ারম্যানসহ একটি সংস্থা রয়েছে। তারা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোন ভ’মিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছেন না। এমনকি প্রায় সর্বত্র এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে দ্ব›দ্ব বিরাজ করছে। মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও রয়েছে। এভাবে জনগণের প্রত্যাশার পরিপূরক অনেক কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।

ড. নজরুল বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর বিকশিত হবার সুযোগ নেই। এছাড়া,বড় দলগুলোও নির্বাচনে তেমনভাবে টিকতে না পারলে অস্থিত্ব হারানোর শংকায় থাকেন। কারণ, বড় না হলে ভোট পাচ্ছেন না। আর ভোট না পেলে টিকতে পারছেন না। অথচ আনুপাতিক নির্বাচন করলে এটা লেবেল প্লেইং ফিল্ডে পরিণত হবে। ছোট ড়ল যদি ১% ভোটও পায়, তাহলে ৩০০ আসনের মধ্যে ৩টি পাবে। একইহারে ছোট-বড় সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে জাতীয় সংসদে।

আনুপাতিক পদ্ধতিতে দলগুলো নিজের প্রার্থীগণের দুটি তালিকা তৈরী করতে পারেন। একটি ক্লোজ লিস্ট, আরেকটি ওপেন। আর এটি নির্ভর করবে দেশের পলিটিক্যাল ম্যাচ্যুরিটির ওপর। ড. নজরুল বলেন, ব্রিটিশশাসিত ছিল এমন বিশ্বে এখনও এই ব্যবস্থা চালু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্যও একই অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানেও চলছে ব্রিটিশ ব্যবস্থা। এর ফলে মনোনয়ন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে অনেক দলের বিরুদ্ধে। ১০ কোটি টাকা দলীয় ফান্ডে জমা দিতে পারছে এমন ব্যক্তিকে বাছাইয়ের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে কখনো কখনো জানিয়ে দেয়া হয় মনোনয়ন বোর্ডকে। এরফলে সারা বছর যে মানুষটি দলের জন্যে ত্যাগ-স্বীকার করলেন কিন্তু আর্থিকভাবে সামর্থ্য নেই-তার পক্ষে পার্লামেন্টে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্যেই নব্বইয়ের সময় থেকেই বাংলাদেশের পার্লামেন্টে সত্যিকারের রাজনীতিকের চেয়ে ব্যবসায়ীগণের আধিক্য বেড়েছে। তাই আনুপাতিক হারের ব্যবস্থা চালু হলে সেই বাণিজ্যের ব্যাপারটি ঠাঁই পাবে না। কারণ প্রার্র্থী বাছাইয়ের ব্যাপারটি তৃণমূলের নেতা-কর্মীগণের পছন্দের আলোকে হবে।
আলোচনাকালে ড.নজরুল বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যেকার হতাশাস দিনদিনই প্রবল হচ্ছে। অনেকেই এহেন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের কোন পথও দেখছে না। তাই সকলেই একটি উপায় খুঁজছেন যার মধ্যদিয়ে বর্তমানের শংকা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের সত্যিকার কল্যাণের প্রত্যাশা পূরণ করতে।

এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রগ্রেসিভ ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডভোকেট আকতারুল ইসলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারিগণের মধ্যে ছিলেন রানা ফেরদৌস চৌধুরী, জাকির হোসেন বাচ্চু, বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল বারি ও আমির আলী, রেজাউল করিম, এডভোকেট নাসিরউদ্দিন। সেমিনারে উপস্থাপিত পুরো বক্তব্য ভিডিওতে ধারণের পর কম্যুনিটি অ্যাক্টিভিস্ট মিনহাজ আহমেদ সাম্মু সকলকে জানান যে, পরবর্তীতে তিনি তা ইউটিউব-সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবেন। এই ধারণার প্রতি বাংলাদেশীদেরকে ভালোভাবে পরিচিত করতে এই ব্যবস্থার ভীষণ প্রয়োজন রয়েছে বলে সকলে মন্তব্য করেন। ফোরামের সভাপতি হাফিজুল হক সমাপনী বক্তব্যে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আন্তরিকতার সাথে অনুধাবনের জন্য।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:০৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২২ অক্টোবর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar