বৃহস্পতিবার ২৩শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জীবন

তসলিমা নাসরিন   |   বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট  

জীবন

১. ভাবছি এমন কোনও শিক্ষক কি আমি পেয়েছি, যাঁর কাছ থেকে ইস্কুল কলেজের পরীক্ষায় কী করে পাস করতে হয় এই কৌশল ছাড়া অন্য কিছু শিখেছি? সত্যি কথা বলতে, ঘরে বসে দিন-রাত ইস্কুল কলেজের বই পড়েই যা শেখার শিখেছি। আর রাত-দিন লুকিয়ে লুকিয়ে ‘আউটবই’ পড়ে জীবন এবং জগৎ সম্পর্কে জেনেছি।

এখনও তাই করি, পড়ে পড়ে শিখি। জগৎময় ঘুরে ঘুরে শিখি।

সবচেয়ে বেশি শিখি ঠকে ঠকে। চলার পথে পাল পাল শত্রু আমার পথ রোধ করেছে, আমার কণ্ঠরোধ করেছে, আমাকে অপমান করেছে, অপদস্থ করেছে, চরম আঘাত করেছে, ধাক্কা দিয়ে নর্দমায় ফেলেছে, নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে- নিজেকে বাঁচাতে উঠে দাঁড়িয়েছি আমি। বার বার। বার বার আমি শিখেছি, নিজেই শিখেছি কী করে উঠে দাঁড়াতে হয়, কী করে মুষ্টিবদ্ধ করতে হয় হাত, কী করে যেতে হয় যেদিকে ইচ্ছে করে যেতে, কী করে বলতে হয় যে কথা ইচ্ছে করে বলতে, কী করে প্রতিবাদ করতে হয় আপস না করে, কী করে বাঁচতে হয়, কী করে আমার মতো দুর্ভাগাদের বাঁচাতে হয়।
আমি নিজেই নিজের শিক্ষক।

২. ঘরবন্দি জীবন আমার কাছে নতুন নয়। মেয়ে হয়ে জন্মেছি এই অপরাধে ইস্কুল কলেজের বাইরে পুরোটা কৈশোর ঘরবন্দি জীবনই তো কাটাতে হয়েছে। যৌবনেই বা কতটুকু আর স্বাধীনতা পেয়েছি। বাইরে যৌন হেনস্তা, অপহরণ, ধর্ষণ ওত পেতে আছে বলে ঘর থেকে বেরোতে পারিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমার লেখালেখিতে ইসলামী উগ্রবাদের সমালোচনা ছিল বলে মৌলবাদীরা ফাঁসির দাবিতে মিছিল করতো। বইমেলায় শারীরিক আক্রমণ করতো। ওদিকে একের পর এক ফতোয়াও জারি হলো। মুণ্ডু কেটে নিতে পারলে লাখ টাকা উপহার। তখনও বাধ্য হয়েছি ঘরবন্দি জীবন কাটাতে। সরকার একসময় মামলা করলো, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলো। তখনও আত্মগোপন করতে গিয়ে আবারও ঘরবন্দি জীবন। নির্বাসন জীবন শুরু হলো ইউরোপে। সেখানেও নিরাপত্তারক্ষীরা আমাকে ঘরবন্দি জীবন দিয়েছিল। বিদেশ ফেলে যখন ভাষার টানে কলকাতায় ঠাঁই নিয়েছি, সেখানেও একের পর এক ফতোয়া। একসময় সিপিএম সরকার আমাকে রাজ্য ছাড়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। কথা শুনিনি বলে আমাকে গৃহবন্দিত্ব উপহার দিল। আহ সেইসব কষ্টের যন্ত্রণার দিনগুলি! কয়েক মাস ঘরবন্দি করে রাখার পর রাজ্য ছাড়তে শেষ অবধি বাধ্যই করলো। দিল্লিতেও কেন্দ্রীয় সরকার একই কাজ করেছিল, হয় ভারত ছাড়ো নয়তো ঘরবন্দি থাকো, বাইরে বলা হয়েছিল ‘সেইফ হাউসে’ আছি। সেখানেও কেটেছে আরো কয়েকটি মাস।

এ কারণেই সম্ভবত একা একা একটি বাড়িতে দিন-রাত পড়ে থাকা, বাইরের আলো হাওয়ার স্পর্শ না পাওয়া আমার কাছে খুব কিছু অস্বাভাবিক অসম্ভব নয়। বীন দেয়ার, ডান দ্যাটের মতো। টেনশন তখনও ছিল, এখনও আছে। পরাধীনতার ক্ষোভ ছিল, ফণা তুলে থাকা মৃত্যু ছিল চোখের সামনে। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও অনুভূতিগুলো প্রায় একই। বাইরে বেরোলে নারীবিদ্বেষীরা, গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগা পুলিশেরা, মুণ্ডু কাটায় আগ্রহী অর্থলোভী ধার্মিকেরা, ফাঁসির দাবিতে চিৎকার করা ধর্মান্ধরা, আদর্শচ্যুত দূরদৃষ্টিহীন রাজনীতিকেরা সবাই আমাকে খুন করবে, ঠিক এখন যেমন ইমিউনিটি কম থাকা শরীরটি বাগে পেলে যে কোনও মারণ ভাইরাস আমাকে গলা টিপে হত্যা করবে।

৩. কখনও আমি টাকা পয়সা খুব বেশি নেই বলে দুঃখ করি না। স্বামী নেই বলে বা সন্তান নেই বলে, ভাড়া বাড়িতে থাকি বলে বা নিজের কোনও বাড়ি নেই বলে, নারীবিদ্বেষী এবং ধর্মান্ধ লোকেরা আমাকে পছন্দ করে না বলে, বড় বড় পুরস্কার জোটে না বলে, বড় লোকদের আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ পাই না বলে, নতুন ফ্যাশনের জামা জুতো পরি না বলে, হীরে সোনার কোনও গয়না কিনতে পারি না বলে, উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসে চড়তে পারি না বলে, প্রভাবশালী-প্রতাপশালী-সেলিব্রিটি-শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-সমাজপতি বা রাজনীতিকগণ আমাকে পাত্তা দেন না বা পোছেন বা বলে দুঃখ করি না।

আমার দুঃখ অন্য জায়গায়। কারও বাক স্বাধীনতা কেউ হরণ করলে দুঃখ হয়, কারও ওপর অন্যায় হলে দুঃখ হয়, প্রতারণা দেখলে, অবিচার দেখলে, বৈষম্য দেখলে দুঃখ হয়, কারও মানবেতর জীবনযাপন দেখলে, অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অভাব দেখলে দুঃখ হয়, কারও অকাল মৃত্যু হলে দুঃখ হয়।

ব্যক্তিগত দুঃখও কিছু আছে, আমার মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নিলে দুঃখ হয়, আমাকে রাজনীতির ঘুঁটি করলে দুঃখ হয়।

সুখ অনেক। ভালো একটি বই পড়লে, ভালো একটি লেখা লিখলে, অজানা কিছু জানলে, নতুন কিছু শিখলে, পশু পাখিকে খুশি করলে, দরিদ্রকে দান করলে, দুর্বলকে সবল করলে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখলে, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখলে, মানুষের ভালোবাসা দেখলে সুখ হয়।

সাহিত্যের জগতে একটি শব্দ প্রায়ই শুনি। শব্দটি ‘কালজয়ী’। সাহিত্যপ্রেমীরা কোনও সাহিত্য পাঠ করার পর নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন এই সাহিত্য কালজয়ী হবে, অথবা এই সাহিত্য কালজয়ী হবে না। এই সাহিত্যিক অমর, অথবা এই সাহিত্যিক ক্ষণস্থায়ী। ঠিক কত দিন বা কত বছর উত্তীর্ণ হওয়াকে ওঁরা কালোত্তীর্ণ বলেন, তা আজও আমার জানা হয়নি।

কালজয়ী শব্দটিকে আমার খুব হাস্যকর শব্দ বলে মনে হয়।

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের বয়স তেরো শ আশি কোটি বছর। পৃথিবীর বয়স চার শ চুয়ান্ন কোটি বছর। আর মানুষের জন্ম মাত্র তিন লক্ষ বছর আগে। যে কোনও সময় পারমাণবিক বিস্ফোরণে, গ্রহাণুর পতনে, আবহাওয়ার পরিবর্তনে, মারণ ভাইরাসের কামড়ে মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমাদের চেয়ে শক্তিশালী হয়েও, আমাদের মস্তিষ্কের চেয়েও বড় মস্তিষ্কের অধিকারী হয়েও নিয়ানডার্থাল নামের মানুষ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, বিলুপ্ত হয়ে গেছে আরও নানা মানুষ প্রজাতি। আমরা কতদিন টিকবো তার কোনও ঠিক নেই। অনেকটা এই আছি তো এই নেই-এর মতো।

আর লেখকদের গল্প উপন্যাস- তার টিকে থাকা বা বেঁচে থাকা নিয়ে কিছু লোকের ঘুম নেই। বটে।

কেউ কেউ বলতে পারে, এক দশক, পাঁচ দশক, দশ দশক ধরে কোনও লেখা যদি লোকে পড়ে, তাহলেই সেটা কালজয়ী। তাহলে তো বটতলার উপন্যাস আর সস্তা রসরচনাগুলো ভীষণই কালজয়ী। কেউ কেউ বলতে পারে, ওসব সাহিত্য নয়। কোনটা সাহিত্য, কোনটা সাহিত্য নয়- তা বিচার করার ভারই বা কার ওপর!

কিছু লেখক, আমি জানি, কালজয়ী হওয়ার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে আছেন। কালজয়ী কিছু লেখার কোনও বাসনা আমার অন্তত নেই। অমরত্বেও আমি বিশ্বাস করি না। যা আমার ভালো লাগে, যা লেখা আমার জরুরি মনে হয়, তা আমি লিখি। এসব লেখা কাগজের ঠোঙা হয়ে গেলেও আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি আজকের মানুষ, আজকে আমার লেখা কেউ পড়লেই আমি ধন্য। দুদিনের জীবন, দুদিনের জন্যই আমার রচনা। যদি কেউ আমার লেখা দুই দশক পড়ে, সে চমৎকার। আমি মরে যাওয়ার পর আমার লেখালেখি নিয়ে কী হবে না হবে, তা ভেবে রাতের ঘুম নষ্ট করার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। মোদ্দা কথা কালজয়ী হওয়ার স্বপ্ন কামড়ে না ধরলে বেশ নিশ্চিন্তে লেখালেখি করা যায়, ঘুমোনোও যায়।

৪. সন্তান জন্ম দেওয়ার এত দরকার কেন? মেয়েরা, এমনকি প্রতিষ্ঠিত, সমাজের নানা নিয়ম ভেঙে ফেলা সাহসী মেয়েরাও, তিরিশের কাছাকাছি বয়স এলেই সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই ব্যাকুলতা কতটা নিজের জন্য, কতটা পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতি মানার জন্য? আমি কিন্তু মনে করি নিজের জন্য নয়, মেয়েরা সন্তান জন্ম দিতে চায় পরিবার থেকে বংশ রক্ষার যে দাবি ওঠে, সেই দাবি মেটানোর জন্য; সমাজের দশটা নিন্দুক বাঁজা বলবে, সেই নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করার জন্য। বাল্যকাল থেকে শুনে আসা শিখে আসা ‘মাতৃত্বেই নারীজন্মের স্বার্থকতা’ জাতীয় বাকোয়াজ মস্তিষ্কে কিলবিল করে বলেই মেয়েরা ভুল করে, মনে করে সন্তান জন্ম দেওয়ার ইচ্ছেটা বুঝি নিজের।

সন্তান জন্ম দেওয়ার ইচ্ছে মানুষের ভিতর আপনাতেই জন্ম নেয় না, জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিকভাবে সম্পন্ন হয়ে যায় না। মানুষ ইচ্ছে করলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, লাগাম টেনে ধরতে পারে গর্ভধারণের যাবতীয় বিষয়াদির। এখানেই পশুর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য। মানুষ ভাবতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সন্তান জন্ম দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।

যারা মূল্যবান কাজ করছে জীবনে, আমার মনে হয় না তাদের উচিত অহেতুক শিশু জন্ম দিয়ে কাজের সময় নষ্ট করা। লালন-পালনেই তো ব্যয় হয়ে যায় জীবনের অনেকটা সময়। নিজেকে যারা ভালোবাসে না তারাই হয়তো জীবনকে মূল্যহীন করতে দ্বিধা করে না। আর যারা মনে করে বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখভাল করবে সন্তানেরা, তাই সন্তান জন্ম দেওয়া জরুরি, তারা নিতান্তই দুষ্টবুদ্ধির লোক, সন্তানের ঘাড়ে চড়ার বদ উদ্দেশ্য নিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা করে। আর এমন তো নয় যে এই গ্রহে মানুষ নামক প্রাণীর এত অভাব যে অচিরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই প্রজাতি; বিলুপ্ত হওয়া থেকে প্রজাতিটিকে যে করেই হোক বাঁচাতে হবে! বাঁচানোর দায়ই বা কেন আমাদের নিতে হবে!

পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা প্রায় আট শ কোটি। এত ভিড়ের পৃথিবীতে আপাতত কোনও নতুন জন্ম কাক্সিক্ষত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মেয়েরা যদি ভেবে নেয় জন্ম না দিলে তাদের জীবনের কোনও অর্থ নেই, তাহলে তারা যে ভুল তা তাদের বোঝাবে কে! সন্তানের জন্ম তারা দিতেই পারে যদি এমনই তীব্র তাদের আকাক্সক্ষা, তারপরও এ কথা ঠিক নয় জন্ম না দিলে তাদের জীবনের কোনও অর্থ নেই। কোনও কোনও মানুষ তাদের জীবনকে শখ করে অর্থহীন করে। তা ছাড়া কারও জীবনই অর্থহীন নয়। বরং যে ভ্রূণ আজও জন্মায়নি, সে ভ্রূণ অর্থহীন।

পৃথিবীর প্রচুর শিক্ষিত, স্বনির্ভর, সচেতন মেয়ে বিয়ে করেনি, সন্তান জন্মও দেয়নি। তাদের জীবন কিন্তু বৃথা যায়নি।

৫. আমি কবিতা লিখি না, আমি জীবন লিখি কাগজে।

কবিতা লিখি না,

পাহাড়ের চুড়োয় দাঁড়ালে যে হাওয়া এসে শরীরে ধাক্কা খায়, সেটি লিখি।

গভীর রাত্তিরে সমুদ্রের খুব কাছে বসে থেকে যে হু হু শব্দ শুনি জলের কান্নার, সেটি লিখি।

নদীর কাছে গিয়ে মাছের, মাছরাঙাদের, মানুষের কোলাহল লিখি।

আমি কবি নই, এক পিপাসার্ত পথিক মাত্র।

পৃথিবী ভ্রমণ করে করে ঘৃণার হিশ হিশ লিখি,

যুদ্ধ লিখি,

লাশের স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়, সেটি লিখি।

খুনোখুনিতে লোকেরা ব্যস্ত হয়ে গেলে লিখি,

লিখে রাখি।

কলম-দোয়াত না পেলে আঙুলের রক্ত দিয়ে লিখি। তবু লিখি।

যতদিন পথ আছে, পথের কাঁটাগুলো লিখে যাবো।

দুঃখ-কষ্ট লিখে যাবো,

হাহাকার লিখে যাবো।

মানুষের ঈর্ষা আর ক্রোধের আওয়াজ লিখে যাবো।

অরণ্য পোড়ার আগুন লিখে যাবো,

চড়ুইয়ের, চিতার, আর চিত্রল হরিণের ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটোছুটি লিখে যাবো।

সব লেখা শেষ হলে,

সকলে ঘুমিয়ে গেলে,

ভালোবাসা লিখে যাবো।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:০৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar