Advertisement Placeholder

আমার মা’র স্বপ্ন পূরণ হয়নি

তসলিমা নাসরিন   |   বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২   |   প্রিন্ট   |   ১১০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

আমার মা’র স্বপ্ন পূরণ হয়নি

আজ একটি খবর পড়ে আমার মাকে বড় মনে পড়লো। খবরটি পাবনার মা ও ছেলের একসঙ্গে এসএসসি বা মাধ্যমিক পাস করার খবর। পরীক্ষায় মা মুঞ্জুয়ারা খাতুন পেয়েছেন জিপিএ-৪.৯৩ আর ছেলে মেহেদি হাসান জিপিএ-৪.৮৯। ছেলের চেয়ে মায়ের ফল ভালো। মা আর ছেলের একসঙ্গে পরীক্ষায় বসা এবং পাসের খবরে পাবনার স্কুল-কলেজের শিক্ষকবৃন্দ, উপজেলার কর্মকর্তাবৃন্দ সকলে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কেউ কটাক্ষ করেননি।

অথচ আমরা করেছিলাম। আমার মা যখন তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, যখন দ্বিতীয় ছেলের সঙ্গে এসএসসি দিতে চেয়েছিলেন, তখনও সকলে কটাক্ষ করেছিলেন। যখন আমার সঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন, তখনও একই, আমিও হেসেছিলাম, কটাক্ষ করেছিলাম।

মুঞ্জুয়ারা খাতুনের স্বামী দরিদ্র ভ্যানচালক। তিনি মুঞ্জুয়ারাকে উৎসাহ দিয়েছেন এসএসসি পরীক্ষা দিতে। আমার মা’র স্বামী অর্থাৎ আমার বাবা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, শহরের নামি ডাক্তার, আমার বাবা বাধা দিয়েছেন মা’কে।
আমার মা ময়মনসিংহ শহরের মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। খুব ভালো ছাত্রী ছিলেন। ক্লাসে প্রথম হতেন। খুব পড়ালেখার ইচ্ছে ছিল মা’র। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয় সবে লিটন মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হয়েছে এক ছেলের সঙ্গে। বিয়ের পরও মা স্কুলে যেতে থাকেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন মা গর্ভবতী হন। তখন অনিচ্ছে সত্ত্বেও মাকে স্কুল ছাড়তে হয়। পড়ালেখার ইচ্ছেটা মার এত প্রবল ছিল যে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মা ফের স্কুলে ভর্তি হতে চান। পুরো পরিবার আপত্তি জানায়। এর মধ্যে আরও এক পুত্রসন্তান জন্ম নেয় মার। অতঃপর বড় ছেলে যখন সপ্তম শ্রেণিতে, মা শহরের মহাকালী স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন, অনেকটা পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই। ক্লাসের ছাত্রীদের চেয়ে মা বয়সে বড়, মার বিয়ে হয়েছে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া এক পুত্রসন্তানও মার আছে, এ কথা শিক্ষিকারাই গোপন রাখেন, যেন মা অন্যান্য ছাত্রীর সামনে অস্বস্তিতে না পড়েন। মা পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিয়ে পাস করছিলেন। তারপরও মাকে যুদ্ধে হারিয়ে দেওয়া হয়, মার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ ঘরে মার দুই পুত্র সন্তানের যত্নআত্তির দরকার। যদিও যত্নআত্তির অভাব হয়নি কোনও। যদিও নানা নানি, মামা খালা এমনকি কাজে সাহায্য করার লোকও ছিল দুই পুত্রকে দেখাশোনা করার, কিন্তু মাকেই নাকি চব্বিশ ঘণ্টা বাড়িতে থেকে সন্তান মানুষ করতে হবে। মার আর উপায় ছিল না নিজের স্বপ্ন পূরণের। দুই ছেলে স্কুলে চলে গেলে তিনি স্কুলে যাবেন, ওরা স্কুল থেকে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও স্কুল থেকে ফিরে আসবেন। ঘরের কোনও কাজই পড়ে থাকবে না, ঘর গোছানো, কাপড় গোছানো, রান্না-বান্না, খাওয়ানো-দাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো সবই করবেন। তারপরও মা এবং বাবার পরিবারের কেউ রাজি নয় মা পড়ালেখা চালিয়ে যান। প্রচুর কেঁদেছেন মা, মার চোখের জলে কারও কিছু যায় আসেনি। মার জীবন এবং স্বপ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সন্তানদের আরাম আয়েশ।

মা হাল ছাড়েননি। ছেলেদের সঙ্গে প্রাইভেটে এসএসসি পরীক্ষা দিতে চাইলেন। ছেলেরা যা পড়ে তা পড়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে চাইলেন। তাঁকে বাধা দেওয়া হলো। আমি যখন এসএসসি দিই, তিনিও তখন প্রাইভেটে এসএসসি দিতে চাইলেন। তাঁকে নিয়ে বাবাসহ সকলে আমরা হেসে কুটিকুটি। মাকে ক্লাউনের মতো মনে হতো। মা কিন্তু সিরিয়াস ছিলেন। আমাদের কটাক্ষ, উপেক্ষা, তির্যক মন্তব্য, মাকে হাসির পাত্রী বানানো- কিছুই মাকে পিছু হটাতো না। আমি হেসে হেসে বলতাম, তোমার ছেলেমেয়েরা বড়, আর এই বয়সে তুমি এসএসসি পরীক্ষার জন্য বসলে লোকে হাসবে।

মা বলতেন, প্রাইভেটে পরীক্ষা যে কোনও বয়সেই দেওয়া যায়।

-কিন্তু তুমি কী করবে তোমার মাধ্যমিক সার্টিফিকেট দিয়ে?

মা বলতেন, কলেজে ভর্তি হবো।

-সংসার রেখে পড়াশোনা কী করে করবে?

-সংসার করেও পড়াশোনা করা যায়।

আমি বলতাম, কলেজ পাস করেই বা কী ঘোড়ার ডিম করবে?

মা বলতেন, ঘোড়ার ডিম কেন হবে? মাস্টার ডিগ্রি পাস করবো।

-ও করেই বা কী করবে?

-ভালো চাকরি করবো।

-কেন চাকরি করবে? বাবাই তো টাকা কামাচ্ছেন।

-তোমার বাবার টাকা তো তোমার বাবা কামাচ্ছেন। ও তো আমার টাকা নয়। শুধু টাকা উপার্জনের কথা হচ্ছে কেন? জ্ঞানের তো একটা মর্যাদা আছে।

আমি হো হো করে হেসে উঠতাম। আমি ভাবতাম বাবার টাকাই মার টাকা। আরও বড় হয়ে বুঝেছি, বাবার টাকাই মার টাকা নয়। বুঝেছি মেয়েদের শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার মূল্য পুরুষের শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার চেয়ে একটুও কম নয়। এরপর আমার ছোটবোন যখন এসএসসি দেবে, মাও দিতে চাইলেন। কিন্তু বরাবরের মতো বাবা বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। আসলে বাবার চেয়ে পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের ভ্যানচালক আবদুর রহিমই ঢের বুদ্ধিমান। তিনি তাঁর স্ত্রী মুঞ্জুয়ারা খাতুনকে বাধা দেননি এসএসসি পরীক্ষা দিতে। মুঞ্জুয়ারা খাতুন যেমন ভালো ফল করে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমার মা-ও, আমার বিশ্বাস পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলে তিনিও আমাদের সবার চেয়ে ভালো ফল করে দেখিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সেই সুযোগ মাকে আমরা কেউই দিইনি। মার স্বপ্নের ওপর ঢেলে দিয়েছি রাজ্যের আবর্জনা। বয়স এবং সংসার নামক ধারণার আবর্জনা।

মুঞ্জুয়ারা ন্যূনতম ডিগ্রি পাস করতে চান। আমার মার স্বপ্ন সফল হয়নি। মুঞ্জুয়ারার স্বপ্ন সফল হোক। আমার মার মতো অল্প বয়সে বিয়ে এবং সন্তান হয়ে যাওয়ায় সংসারের জালে যাঁরা আটকে পড়েছেন, তাঁদের স্বপ্নও, যদি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার স্বপ্ন তাঁদের থেকে থাকে, সফল হোক। ইউরোপ আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেক উন্নত। তাঁরা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাকে এমনই মূল্য দেন যে কেউ যে কোনও বয়সেই যে কোনও বিষয় নিয়ে যে কোনও সরকারি বা বেসরকারি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারেন। সরকার থেকে বরং শিক্ষাপ্রার্থী সবাইকে উৎসাহ দেওয়া হয়, নিরুৎসাহিত করা হয় না।

জ্ঞানের কোনও বিকল্প নেই। অথচ মেয়েদের একসময় স্বাধীনতাই ছিল না জ্ঞানার্জনের। স্কুলে কলেজে পড়া মেয়েদের বারণ ছিল। বিয়ের পর মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ার চল আজও আছে। মেয়েদের পড়াশোনাটা অনেকের কাছে ভালো বিয়ে হওয়ার জন্য, অর্থাৎ স্বামীকে প্রয়োজনে পত্র লেখার জন্য বা শিশু সন্তানদের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দেওয়ার জন্য; জ্ঞানার্জনের জন্য নয়, স্বনির্ভর হওয়ার জন্যও নয়।

ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্র মেয়েদের শিক্ষা, স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা পাওয়ার বিরুদ্ধে চিরকাল প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে। আজও করছে। তবে মানসিকতার পরিবর্তন গত এক শতকে কিছু তো হয়েছেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর উদার এবং শিক্ষিত পুরুষগোষ্ঠী শিক্ষিতা স্ত্রী কামনা করেছিলেন বলে তাঁদের উদ্যোগেই নারীশিক্ষার চল শুরু হয়। এখনও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিতা স্ত্রী বা শিক্ষিতা শয্যাসঙ্গী পাওয়ার আনন্দ লাভের জন্য পুরুষেরা শিক্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করার জন্য আগ্রহী হয়। কোনও কোনও পুরুষ স্ত্রীর অর্জিত অর্থের প্রতিও আকর্ষণ অনুভব করে বলে স্বনির্ভর মেয়েকে বিয়ে করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। মানসিকতার এই পরিবর্তন কিন্তু বাহিরে কেবল, অন্তরে নয়। সমাজ এখনও মেয়েদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত নয়। মেয়েদের পায়ে আজও শেকল পরানো। মেয়েরা কতটুকু পথ পেরোবে, কতটুকু শিক্ষা লাভ করবে, কতটা স্বনির্ভর হবে-সবকিছুই নির্ধারণ করে সমাজের পুরুষ নামক কর্তারা। স্বামী অনুমতি দিয়েছেন বলে মুঞ্জুয়ারা খাতুন স্কুল পাসের পরীক্ষায় বসতে পেরেছেন, স্বামী অনুমতি দেননি বলে আমার মা ঈদুল ওয়ারা পরীক্ষায় বসতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মেয়েদের স্বপ্ন এবং স্বাধীনতা নির্ভর করে পিতা বা স্বামী নামক প্রভুর অনুমতি এবং অনুগ্রহের ওপর।

এই নির্ভরতা থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মেয়েরা কোনওদিনই সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ পাবে না। আমার বাবা যখন ময়মনসিংহের লিটন মেডিকেল স্কুল থেকে এলএমএফ পাস করে রাজশাহী মেডিকেলে এমবিবিএসের জন্য কন্ডেন্সড পরীক্ষা দিতে যান, তিনি শুধু বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি যাচ্ছেন, বাবাকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। বাবার দরকার ছিল না কারও অনুমতি নেওয়ার। কিন্তু মা যখন বলেছিলেন তিনি স্কুলে পড়বেন, শুধু পরিবার নয়, সমাজের সকলে একজোট হয়ে মাকে বাধা দিয়েছিল। মার জন্য সবার অনুমতির দরকার হয়েছিল, বাবার জন্য দরকার হয়নি। পুরুষের জন্য অনুমতির দরকার হয় না, আজও চলার পথে পদে পদে মেয়েদের অনুমতির দরকার হয়। আজও মেয়েদের জন্য পুরুষ-প্রভু বা পুরুষ-অভিভাবকের দরকার হয়। মেয়েদের কোনও সিদ্ধান্তে পুরুষেরা যেদিন থেকে আর নাক গলাবে না, সেদিন বুঝবো নারী-পুরুষের সমতার জন্য সমাজ তৈরি হচ্ছে। তা না হলে এটি আজও পুরুষের সমাজ। এই পুরুষের সমাজে আমরা মেয়েরা দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরাধীন জীবনযাপন করছি।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার