শনিবার ২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামিয়ে রাষ্ট্র বিনির্মাণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সাফল্য অপরিসীম

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট  

দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামিয়ে রাষ্ট্র বিনির্মাণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সাফল্য অপরিসীম

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সামান্য একটু ত্রু টি দেখা গেলেই তা ফলাও করে প্রচার করা হয়। অপবাদের চেষ্টা চলে ‘মিশনের ব্যর্থতা’কে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, দ্বদ্ব-সংঘাত থামাতে, হতাহতের সংখ্যা একেবারেই কমিয়ে আনতে, হানাহানির মাত্রা হ্রাসে এবং বহুল প্রত্যাশিত শান্তির প্রক্রিয়ায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এ সত্য উদঘাটিত হয় জাতিসংঘের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা-পর্যবেক্ষণরত পৃথক ১৬টি সংস্থার গবেষণায়। তারা দেখতে পেয়েছেন যে, শান্তিরক্ষী তথা ‘ব্লু হেলমেট’ পরিহিতরা মানবিকতার ক্ষেত্রে অপরিসীম দায়িত্ব পালন করছেন।

বলা যেতে পারে যে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন তার প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে অর্থাৎ সামাজিক অস্থিরতা দূর করে যুদ্ধ-সংঘাতের সমাপ্তি ঘটাচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শণের পর ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লাইজ হাওয়ার্ড ‘পাওয়ার ইন পীচকীপিং’ গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। অধ্যাপক লাইজ শান্তিরক্ষা মিশন প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, সারাবিশ্বের গতি-প্রকৃতির ওপর আমরা যদি নিবিড়ভাবে অবলোকন করি তাহলে দেখবো যে, শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম কাজে আসছে।

‘শীতল যুদ্ধের পর যদি আমরা শান্তি-স্থিতি স্থাপনের মিশনের প্রতি দৃষ্টি প্রসারিত করি তবে দেখবো যে, শান্তিরক্ষীদের ওপর প্রদত্ত দায়িত্ব প্রতিপালনে দুই তৃতীয়াংশ সময়ই তারা সফল হয়েছেন’-জাতিসংঘকে প্রদত্ত সাক্ষাতকারে অধ্যাপক লাইজ ১০ ডিসেম্বর এ কথা বলেছেন। ‘তবে এটাও ঠিক যে, অর্পিত দায়িত্বের শতভাগ তারা পালন করতে সক্ষম হননি। কিন্তু তারা দ্বন্দ্ব-সংঘাত, যুদ্ধ থামাতে সক্ষম হয়েছেন’-উল্লেখ করেন অধ্যাপক লাইজ। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, শান্তিরক্ষীরা গৃহযুদ্ধের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

তারা শান্তি চুক্তি অর্জনেও সহায়তা করছে। যেখানে শান্তিরক্ষীদের একটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেখানে আমরা একটি শান্তি চুক্তি হতেও দেখেছি। এই চুক্তিগুলোর ভিতও শক্ত। সবকিছুর উর্ধ্বে বড় সত্য হচ্ছে ১৯৪৮ সালে ‘পীচকীপিং মিশন’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে লাখ লাখ শান্তিরক্ষী প্রাণ দিয়েছেন অন্যের জীবন বাঁচাতে। এই মিশনে সেনাদের নিয়োগ করা হলেও মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেয়া। উল্লেখ্য, এই মিশনের কার্যক্রম শুরু হয় ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণার সময় নিকট প্রতিবেশীদের সাথে সংঘাত-উত্তেজনা প্রশমনের প্রক্রিয়ায়। সে সময় জাতিসংঘের সিনিয়র অফিসার ছিলেন আমেরিকান সিটিজেন ড. রালফ বাঞ্চে, তার নেতৃত্বে গঠিত হয় শান্তিরক্ষা মিশন। প্রতিষ্ঠার সময় এর নীতিমালায় সন্নিবেশিত হয় যে,ট্রুপস নিয়োগ করা হবে পুরোপুৃরি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, যাতে গোলযোগে লিপ্তদের পক্ষাবলম্বনের অবকাশ না থাকে। এমনকি শান্তি রক্ষা মিশনের সৈন্যরা এমনভাবে কাক করবেন যাতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্তরা তাদের ওপর আস্থাবান হয়ে উঠে এবং এক পর্যায়ে তারাই যাতে সংঘাত থামাতে শান্তিরক্ষীদের কাছে আবেদন জানায়। অর্থাৎ যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি চুক্তির পথে এগুবে। প্রতিষ্ঠার বছরেই অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে মিশর এবং ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ বিরতির আলোচনায় সহায়তা করার জন্য ড. রালফ বাঞ্চেকে ১৯৫০ সালে ‘নোবেল শান্তি পুরষ্কার’এ ভূষিত করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ড. রালফের অবিস্মরণীয় এই ভূমিকা স্মরনীয় করে রাখতে জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে (৪৩ স্ট্রিট এবং ফার্স্ট এভিনিউ) একটি পার্ক এবং স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘সংঘাতে লিপ্তরা অন্যের প্ররোচনায় বিভ্রান্তিতে পড়েছিল। শান্তিরক্ষীরা তাদেরকে বিভ্রান্তি মুক্ত করতে সক্ষম হন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অবহিত করেন। আগে তারা কখনো ভোট দেননি, তাই ভোটের ক্ষমতা কতটা প্রবল, তা দ্বন্দ্ব -সংঘাতে লিপ্ত দেশ-অঞ্চলসমূহের নাগরিকেরা খুব কম সময়েই অনুধাবনে সক্ষম ছিলেন। শান্তিরক্ষীরা নাগরিকদের তাদেরে অধিকার ও নিজস্ব নেতা নির্বাচন করার অর্থ কী তা জানাতে সাহায্য করেন।

গৃহযুদ্ধে লিপ্ত এলাকায় শান্তিরক্ষীরা শুধু যুদ্ধ বিরতির জন্যেই মাঠে নামে না, তারা এলাকাটির মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহকেও ঢেলে সাজাতে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা দিচ্ছেন। সামাজিক স্থিতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভীত মজবুত করার পাশাপাশি নাগরিকদেরকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতেও ভূমিকা রাখছেন। তারা দেশসমূহের সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তেও সহায়তা দিচ্ছেন। এরফলে পুনরায় যদি কোন কারণে বিরোধ দেখা দেয়ার মত পরিস্থিতি তৈরী হয়, তাহলেও নাগরিকেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতির অবসানে আলোচনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, বেসামরিক লোকজনের জীবন রক্ষা করা।

সাউথ সুদানে গুহযুদ্ধের সময় শান্তিরক্ষীরা নিজের ক্যাম্পে জায়গা দিয়েছিলেন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া জনগোষ্ঠির একটি অংশকে। তারা ক্রমান্বয়ে সংঘাতের পথ পরিহারে ঐসব লোকজনকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন এবং পরস্পরের সহযোগী হয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগে ব্রত গ্রহণ করেন। অধ্যাপক লাইজ হাওয়ার্ড অকাট্ট যুক্তি দেখিয়ে আরো উল্লেখ করেন, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্তদের থামাতে বল প্রয়োগের পরিবর্তে সংলাপের পথ বেছে নেয়ায় শান্তি রক্ষার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে খুব সহজে। কারণ, শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালনরত এলাকার মানুষের ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধুতে পরিণত হওয়ায় মিশনের লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হচ্ছে। এ যাবত যেসব মিশনের কার্যক্রম সফল হয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে : নামিবিয়া-১৯৮৯-১৯৯০, কম্বোডিয়া- ১৯৯২-১৯৯৩, মোজাম্বিক-১৯৯২-১৯৯৪, এলসালভেদর/ক্রোয়েশিয়া-১৯৯৬-১৯৯৮, ইস্ট তিমোর-১৯৯৯-২০০২, সিয়েরা লিওন-১৯৯৯-২০০৫, বুরুন্ডি-২০০৪-২০০৬, ইস্ট তিমোর-২০০৬-২০১২, আইভরি কোস্ট-২০০৪-২০১৭ এবং লাইবেরিয়া-২০০৩-২০১৮।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar