শনিবার ২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে বিজয় দিবসের সমাবেশ : দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার সংকল্প

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি   |   শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট  

যুক্তরাষ্ট্রে বিজয় দিবসের সমাবেশ : দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার সংকল্প

দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার সংকল্পে বিপুল উৎসাহে যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ ডিসেম্বর শুক্রবার উদযাপিত হলো ৫২তম বিজয় দিবস। বৈরী আবহাওয়া সত্বেও জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস, নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কন্স্যুলেট, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-সহ বিভিন্ন সংগঠনের বিজয় সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলেন সরব। সব অনুষ্ঠানেই একাত্তরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, জাতীয় চার নেতাসহ সকলের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। জাতিরজনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলিও অর্পণ করেন মুক্তিযোদ্ধা-সহ কূটনীতিক ও রাজনীতিকরা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে এসব অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করা হয়। বক্তাগণের সকলেই জাতিরজনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা রচনার পথে শেখ হাসিনার বিচক্ষণতাপূর্ণ নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। একইসাথে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেও মহল বিশেষের বাংলাদেশ বিরোধী জঘন্য অপতৎপরতার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ জানিয়ে দেশপ্রেমিক প্রতিটি প্রবাসীকে চোখ-কান খোলা রাখার আহবান জানানো হয়।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম :
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ এর যুক্তরাষ্ট্র শাখার বিজয় সমাবেশ হয় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে জুইশ সেন্টারে। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্ম-উৎসর্গকারী বীর শহীদগণের স্মরণে দাঁড়িয়ে একমিনিট নিরবতা পালন ও তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পর জাতীয় সঙ্গীতের সাথে বিজয়ের গান পরিবেশন করেন বহ্নিশিখার শিল্পীরা। নেতৃত্বে ছিলেন বহ্নিশিখার পরিচালক ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সবিতা দাস। দেশ ও প্রবাসের মহিলাদের কল্যাণে কর্মরত ‘তারার আলো’র সভাপতি মিনা ইসলাম এবং সেক্রেটারি ফারহানা আমানের নেতৃত্বে সংগঠনের শিল্পীরাও ছিলেন এ পর্বে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত গানে গানে আপ্লুত করেন শাহ মাহবুব, রুনা রায়, ইসমত জাহান পলি, কানিজ ফাতেমা, সবিতা দাস, উইলি নন্দি প্রমুখ। তবলায় সঙ্গত করেন সজীব মোদক।
উদ্বোধনী পর্বে লাল-সবুজের রঙে রাঙানো শাড়ি পরিহিত ‘তারার আলো’র সদস্য-কর্মকর্তারা জাতীয় পতাকা হাতে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’ সঙ্গিতের তালে অনুষ্ঠানে প্রবেশের পর উপস্থিত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। বিপুল করতালির সাথে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত হয় অনুষ্ঠানস্থল। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাগণকে অভিবাদনও জানান।
এ অনুষ্ঠানের জন্যে গঠিত সাব-কমিটির আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সদস্য-সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার চুন্নুর সার্বিক সমন্বয়ে পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ ফারুক।

bIJOY dIBOS At UN

স্বাগত বক্তব্য দেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল বারি এবং আলোচনার সূচনা করেন সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার। লাবলু আনসার বলেন, প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে বিজয় দিবসের সমাবেশে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর সেই যুদ্ধ স্বল্প সময়ের মধ্যে সফল হয়েছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিক সহযোগিতায়। সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার কথাও ভুললে চলবে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মুুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বন্ধু মানবাধিকার সংগঠক ও লেখক ড. পার্থ ব্যানার্জি বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয়দের অবদানের কথা ইতিহাসে তেমনভাবে ঠাঁই পাচ্ছে না। আজকের প্রজন্ম কিছুই জানতে সক্ষম হচ্ছে না। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।

ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রেসিডেন্ট শাহ শহীদুল হক সাঈদ বলেন, একাত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবদানকে চির স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশে একটি ‘ইন্দিরা স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ করা উচিত। আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের এ বিজয় সমাবেশ থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এ আবেদন জানাচ্ছি।

আলোচনায় আরো অংশ নেন যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আনোয়ার বাবলু এবং মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা নুরুন্নাহার আলম। বিজয় দিবসের আলোকে কবিতা-গানে অংশ নেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সদস্য শামিম শরীফ এবং নৃত্য পরিবেশন করে অনিন্দিতা ভট্টাচার্য।

অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের মধ্যে আরো ছিলেন মতিউর রহমান, এনামুল হক, ইমদাদুল হক, শহীদুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, আবুল বাশার ভূইয়া, আবুল বাশার চুন্নু, নাজিমউদ্দিন, মেসবাহউদ্দিন আহমেদ।

জাতিসংঘে বিজয় দিবস : বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় সকাল সাড়ে দশটায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে। আলোচনা পর্ব শুরু আগে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্ম-উৎসর্গকারী বীর শহীদগণের স্মরণে একমিনিট নিরবতা পালন ও তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। এরপর উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশী-আমেরিকান নেতৃবৃন্দ। তাঁরা তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্পসমূহের বাস্তবায়নে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Bijoy Dibos Sector-1 in NY
অতিথিদের আলোচনা শেষে সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ আব্দুল মুহিত। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতাসহ ১৫ আগস্টেও শাহাদৎ বরণকারী জাতিরপিতার পরিবারের সকল সদস্য, জাতীয় চারনেতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ¯^প্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে রূপকল্প ২০২১, র“পকল্প ২০৪১ ও ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০ বা¯—বায়ন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২১ সালে স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য আমরা জাতিসংঘের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছি যা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের মর্যাদা ও সক্ষমতার স্বাক্ষর”।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত মুহিত বলেন, আমরা এখন শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, বিশ্বশান্তি রক্ষা, শান্তি-বিনির্মাণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ বিষয়ক আলোচনা ও নারীর ক্ষমতায়নসহ অসংখ্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ নেতৃত্বশীল ভূমিকা রেখে চলেছে মর্মে উল্লেখ করেন তিনি। স্থায়ী প্রতিনিধি আরও বলেন, “আমরা আজ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশ। আশা করা যায়, ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কোভিড ব্যবস্থাপনা ও অব্যাহত অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বেও কাছে আজ রোল মডেল বাংলাদেশ”।

আলোচনা পর্ব শেষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক রথীন্দ্রনাথ রায় এবং শহীদ হাসান। নৃত্যগীতি পরিবেশন করেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস’র একদল নৃত্যশিল্পী। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট,উত্তর আমেরিকার আহবায়ক মিথুন আহমেদের কবিতা আবৃত্তির মধ্যদিয়ে শেষ হয় সাংস্কৃতিক পর্ব ।

বাংলাদেশ কন্স্যুলেট :

জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সমন্বরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। কনসাল জেনারেল ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম উপস্থিত অতিথিবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদ,৭১-এর সকল শহিদ, জাতীয় চারনেতা ও শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। কনসাল জেনারেল তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতিরপিতা একটি সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন যা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। তিনি নতুন প্রজন্মের মাঝে জাতিরপিতার আদর্শ ও দর্শন এবং স্বাধীনতার ইতিহাস ও গৌরবগাঁথা তুলে ধরার জন্য সকলকে আহবান জানান। উন্মুক্ত আলোচনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

সান্ধ্যকালীন ২য় পর্বে বিদেশী অতিথিদের অংশগ্রহণে কনস্যুলেটে একটি রিসিপশনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত একটি প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। স্বাগত বক্তব্যে কনসাল জেনারেল ড. ইসলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রা ও গভীরতার উপর আলোকপাত করেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত, উপ-প্রতিনিধি ড. এম মনোয়ার হোসেন, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন ল্যু, মেয়র অফিসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিশনার দিলিপ চৌহানসহ বিভিন্ন দেশের কনসাল জেনারেল ও কূটনীতিকব্ন্দৃ উপস্থিত ছিলেন। কমিউনিটির শিল্পীদের দ্বারা মনোজ্ঞ এক সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar