শনিবার ২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পদ্মা সেতু আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রতিদিন ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৯ জুন ২০২২ | প্রিন্ট  

পদ্মা সেতু আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে: প্রধানমন্ত্রী

নানা চাপ, মিথ্যা মামলা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও পদ্মাসেতু নির্মিত হওয়ায় বাঙালির মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। বুধবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে পদ্মাসেতু নিয়ে আনা একটি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।

জাতিকে পদ্মাসেতু উপহার দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতে ওই প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবটি সংসদে আনেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। দিনের অন্যসব কার্যক্রম স্থগিত রেখে বিকাল সোয়া পাঁচটায় এই আলোচনা শুরু হয়। শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টায়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নানা চাপ, মিথ্যা মামলা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও পদ্মাসেতু নির্মান আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে, আমরা পারি। ভবিষ্যতে আরো ভাল কাজ করতে পারবো। প্রযুক্তি সম্পর্কে দেশের মানুষের জ্ঞান হয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা আরো উন্নত কাজ করতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ নিজেরা পারে, এটা সারাবিশ্বে দেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করেছে।’

ধন্যবাদ প্রস্তাবনায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার জোট শরিক ও প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ৩৮ জন সদস্য বক্তব্য রাখেন। এরমধ্যে বিএনপির দু’জন হারুনুর রশীদ ও রুমিন ফারহানা ছাড়া সবাই পদ্মাসেতু নির্মানে সরকারের অসামান্য সাফল্যের ভূয়াসী প্রশংসা করেন।

তারা বলেন, এই সেতু নিয়ে দেশে বিদেশে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। নিজেদের টাকায় এই সেতু নির্মাণ করে তাদের সমুচিত জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সেতু শুধু সেতু নয়, এটি প্রকৌশল জগতে এক বিস্ময়। পদ্মাসেতু নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগকারীদের কঠোর সমালোচনা করেন বক্তারা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু নির্মানে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ড. ইউনুস বেআইনিভাবে ৭১ বছর পর্যন্ত এমডি পদে ছিলো। তাকে কোনো অপমান করা হয়নি। বরং তাকে ব্যাংকের উপদেষ্টা এমেরিটাস হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে এমডি থাকতে হবে।’

ড. ইউনুসের সমালোচনায় তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সালের বন্যার সময় গ্রামীণ ব্যাংককে আমরা ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছিলাম। গ্রামীণ ফোনের লাভের টাকা ব্যাংকে যাওয়ার শর্ত ছিলো কিন্তু তিনি তার একটি টাকাও ব্যাংককে দেয়নি। বরং গ্রামীণ ব্যাংকের যত টাকা সব কিন্তু তিনি নিজে খেয়ে গেছেন। না হলে একজন ব্যাংকের এমডি এত টাকার মালিক হয় কীভাবে? দেশে বিদেশে এত বিনিয়োগ করে কীভাবে? ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে লক্ষ লক্ষ ডলার কীভাবে অনুদান দেয়? কার টাকা দিল? কিভাবে দিল-সেটা তো কেউ খোঁজ নিলো না।’

পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বলেন, ‘আমি, আমার বোন রেহনা, আমার ছেলে কেউ বাদ যায়নি। ড. মসিউর রহমান, আমাদের সচিব মোশাররফ, মন্ত্রী আবুল হোসেন এদের ওপর যে জুলুর তারা করেছে এবং যখন অসত্য অপবাদ দিয়ে যখন পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করে দিলো, তখন আমরা বললাম আমরা নিজের টাকায় করবো। তিনি বলেন, অনেকে বোধহয় ভেবেছিলেন এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি বলেছিলাম আমরা করতে পারবো। এই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে অপমান! শুধু তাই নয়। স্টেট ডিপার্টমেন্ট দুই দুই বার আমার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে ডেকে নিয়ে থ্রেট করেছে যে-তোমার মাকে বলো-এমডির পদ থেকে ইউনূসকে সরানো যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশের পর ইউনুস বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলো। কিন্তু প্রত্যেকটি মামলায় যে হেরে গেল। কারণ আইন তো তাকে কাভার দিতে পারে না। আইন তো কারো বয়স কমাতে পারে না। হেরে গিয়ে আরও ক্ষেপে গেল। হিলারী ক্লিনটনকে দিয়ে আমাকে ফোন করিয়েছে। টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারকে দিয়ে ফোন করিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি আসলেন। সবার কথা ইউনুসকে ব্যাংকের এমডি রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘জাতির কাছে প্রশ্ন করছি ব্যাংকের এমডির পদে কী মধু ছিলো যে ওইটুকু উনার না হলে চলতো না। সে তো নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। নোবেল প্লাইজ যে পায় যে একটি এমডি পদের জন্য এত লালায়িত কেন? সেটা সবার চিন্তা করে দেখা উচিত।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যেন টাকাটা বন্ধ করে তার জন্য বার বার ইমেইল পাঠানো- হিলারির সঙ্গে দেখা করা, তাকে দিয়ে ইমেইল পাঠানো; এবং তার সঙ্গে আমাদের একজন সম্পাদকও ভালোভাবে জড়িত ছিলেন। আমার প্রশ্ন এদের মধ্যে কী কোনো দেশপ্রেম আছে? আমরা সেই অবস্থার থেকে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছি। নিজেদের অর্থায়নে করবো বলেছিলাম। আমরা সেটা করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘রেললাইন কেন করলাম সেটা নিয়েও আমাদের অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন। এই সেতুর দরকারটা কী ছিলো এই কথাটাও কেউ কেউ বলেন। যখণ নির্মাণ কাজ শুরু করি অনেক জ্ঞানীগুনি বলেছিলেন-হ্যাঁ আওয়ামী লীগ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারবে কিন্তু সেতু সম্পন্ন করতে পারবে না। তাদের কেউ কেউ আমাদের সরকারের সাথেও ছিলো। কত রকমের কথা এখানে শুনতে হয়েছে। আর এর একটাই কারণ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ছাড়া কিছু করা যাবে না। তাদের খবরদারি ছাড়া কোনো কিছু হবে না। আর বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হবে না। আমাকে এটাই বুঝানোর চেষ্টা হয়েছে। আমি বলছি না, আমি মানি না। আমরা পারবো। আর যদি পারি করবো, না পারলে করব না।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘এত চাপ। এই মামলা নিয়ে যে সমস্ত খেলা। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি। আর যে সমস্ত খেলা। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি। কার ডায়রিতে লিখে রাখতে ডিটটা হলে পরে অমুক এত পারসেন্ট, অমুক এত পারসেন্ট। এখানে মসিউর রহমান সাহেবের নাম, রেহানার নাম, নিক্সনের নাম। তারপর আমাদের আবুল হোসেনের নাম, সচিবের নাম। সবার নাম দিয়ে পারসেনটেজ লিখে রেখেছে। আমি যখন ডিমান্ড করলাম আমাকে কাগজ দাও। আমি দুর্নীতির এভিডেন্স চাই। একটা ডায়রির কাগজ। পেনসিল দিয়ে লেখা। সেখানে তারিখ নেই। কিছু নেই। কোথায় বসে লিখেছে। এটা নাকি ওয়েস্টিন হোটেলে বসে লেখা। আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আমেরিকানদের জবাব দিয়ে বলেছিলাম- হ্যাঁ আমার সাথে তো হিলারি ক্লিনটন দেখা করতে এসেছিল। সে এই এই কোম্পানিকে কাজ দিন। এবং ওই ওই কোম্পানীকে কাজ দিলে যে এত পারসেন্ট পাবে। আমার ডায়রিতে লেখা আছে। দেব বের করে। তখন চুপ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, একজন আন্ডার সেক্রেটারী এসে খুব হুমকি ধামকি। অ্যাম্বাসেডর এসে বারবার অফিসারদেরকে হুমকি দিতো। ইউনুসকে এমডির থেকে বের করলে পদ্মার টাকা বন্ধ করা হবে। বুঝি না একটা এমডির পদের জন্য একটা দেশের এত বড় ক্ষতি।‘

তিনি বলেন, ‘এই যে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা। আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দোষ দিচ্ছি। কিন্তু এই ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দিয়ে তো এটা করানো হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তার শেষ কর্মদিবসে এটার টাকা বন্ধ করে দিয়ে যায়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপর তাদের চাপ হলো- অমুককে গ্রেপ্তার করতে হবে। অমুককে অ্যারেস্ট করতে হবে। অমুককে বাদ দিতে হবে। তাহলে আমরা টাকা দেবো। কিন্তু আমি বলেছিলাম আমার কোনো অফিসারকে এই অপমান করতে দেবো না। মসিউর রহমান ও আবুল হোসেন সাহেবকে গ্রেপ্তার করতে হবে। মোশাররফ সাহেবকে গ্রেপ্তার করায়ই দিল। কিন্তু আমি বললাম, এটা করতে দেব না। কারণ কোনো টাকা ছাড় হয়নি। দুর্নীতিটা হলো কোত্থেকে। আমি তো তাদের কাছে এভিডেন্স চেয়েছি কিন্তু তারা তো দিতে পারেনি। একটা কাগজও দিতে পারেনি। তাহলে তাদের এই অপবাদ আমরা নেবো কেন?’

তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি পদ্মা সেতু করব না। যেদিন নিজের টাকায় করতে পারবো সেদিন করবো। কিন্তু আমার দেশকে অপমান করে টাকা নিয়ে করতে হবে! আমাকে ভয় দেখানো হয়েছে যদি এটা না হয় আপনার ইলেকশনের কী হবে। আমার কথা জনগণ ভোট দেবে না। ক্ষমতায় আসবো না। ২০০১ সালে তো আমাকে আসতে দেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘একটি মানসিক যন্ত্রনা আমার পরিবারের ওপরে। আমার মেয়েটাকে, আমার ছেলে, আমার বোন। তাদের ওপর যে মানসিক চাপ। জয়কে নিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে তোমার মাকে বলো না হলে তোমার বিরুদ্ধে অডিট হবে। সে বলেছিল, হ্যা করো। আমার মাকে এটা বলতে পারবো না। আমার বিরুদ্ধে যত এনকোয়ারি আছে করতে পারো। আমি এখানে কোনো অন্যায় করিনি। আমার সবকিছু লিগ্যাল। আমি কোনো ভয় পাই না। কাকে না তারা চাপ দিয়েছে। শুরু আমার ওপরে? সবার ওপরে। এ রকম অবস্থাতে আমি কিন্তু দমে যাইনি। সততা আমার শক্তি। আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ। এই জনগণকে অপমান করে কোন কিছু করবো? এটা নয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই একটা সিদ্ধান্ত। যখন আমরা সেতু করতে শুরু করলাম। সবার টনক নড়লো। সবাই সমীহ করতে শুরু করলো। যে না বাংলাদেশ পারে। এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাবে।’

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুন ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar