
ড. আতিউর রহমান | রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | ৩২৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিই বাংলাদেশের মুক্তির সমগ্রামের মূলমন্ত্র। গোড়া থেকেই এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই স্বাধীনতার ঊষালগ্নে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই এগুচ্ছিল। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই আট বিলিয়ন (মতান্তরে ছয় বিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতি তার আমলেই বিশ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সেই অর্থনীতির আকার আজ ৪৬৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে, বঙ্গবন্ধুর আমলে আমাদের মাথাপিছু জিডিপি (কারেন্ট ইউএস ডলারে) ১৮৭ শতাংশ বেড়ে ৯১ ডলার থেকে ২৬০ ডলারে উন্নিত হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হারানোর পরেই এই অভিযাত্রায় ছেদ পড়ে। দীর্ঘ তেরো বছর পরে তাঁর রেখে যাওয়া মাথাপিছু জিডিপির সমান করতে পেরেছিল পঁচাত্তর-উত্তর বাংলাদেশ। তাছাড়া তাঁকে হারানোর পরের ২২ বছরে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে মাত্র ৫২ শতাংশ। ১৯৯০-এর পরে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন একটি মাত্রায় ফেরার পরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অভিযাত্রাটি কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পায়। মাঝে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার শাসনভার গ্রহণ করায় প্রকৃত অর্থেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয়। কিন্তু সে যাত্রা আবার থেমে যায় ২০০১-এ। নানা চড়াই উতরাই শেষে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনেতিক অগ্রযাত্রায় সব বিচারেই একটি নাটকীয় উল্লম্ফন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনা শুরু করার পর থেকেই এই গতিময় অভিযাত্রার সূচনা হয়।
বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয়ের জরিপের তথ্য মতে, ২০১০ থেকে ২০২২- এই সময়কালে এ দেশের দারিদ্র্য হার ৩১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশ হয়েছে। অতিদারিদ্র্যের হার ১৭.৬ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৫.৬ শতাংশে। মাথাপিছু আয়ও এই সময়ের ব্যবধানে ব্যাপক হারে বেড়েছে বলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। ৬৯৯ ডলার থেকে প্রায় চার গুণ বেড়ে ২,৬৮৮ ডলার হয়েছে (বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে)। ২০১০-এ দেশের একটি গড় পরিবার মাসে ১১,২০০ টাকা ব্যয় করতো, আর ২০২২-এ এ পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩১,৫০০ টাকা। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করার পরেও এই সময়ে একটি পরিবারের গড় ভোগের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অবশ্যই অর্থনৈতিক সক্ষমতা সব পরিবারের সমানভাবে বাড়েনি। কারণ আয় ও ব্যয় বৈষম্যের সূচকের মান এ সময়ে সামান্য হলেও বেড়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনুসরণীয় মাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক থেকেছে (অর্থাৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সমাজের সব শ্রেণিই ভোগ করছে একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায়)। বিভিন্ন মানব উন্নয়ন সূচকে আমাদের সাফল্যগুলোই এর বড় প্রমাণ।
উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়ে আরও পরিণত হয়েছে। যেমন : জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ২০১০ সালে ২২ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৩৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থনীতির এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই জিডিপিতে কৃষির অংশ কমে এসেছে। কিন্তু মোট কৃষি উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে কৃষি প্রযুক্তিতে সরকারি ও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের কল্যাণে। আর তার ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু শিল্পখাতের চাহিদা মতো কাঁচামালের একটি অংশ অন্তত সরবরাহ করা গেছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই। একদিকে কৃষি এদেশের অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় আমাদের অর্থনীতির নাটকীয় উল্লম্ফনের রসদ জুগিয়ে গেছে।
সন্দেহ নেই যে, বিগত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্জনগুলো প্রশংসনীয়। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে সামনের দিনে আরও বড় অর্জনের ক্ষেত্রপ্রস্তুত হয়েছে। কেননা আমাদের জনশক্তি তুলনামূলক তরুণ। মেডিয়ান বয়স ২৬.৭ বছর (ভারতের ২৮.১ বছর, চীনের ৩৭.৪ বছর)। আমাদের জনশক্তির ১১ শতাংশের বিশ্ববিদ্যলয়ের ডিগ্রি রয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ অনুপাত প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৩২ শতাংশ হবে। ফলে উচ্চশিক্ষিত ওই জনগোষ্ঠী তখন দেশে-বিদেশে কাজ করে আরও বেশি আয় করতে পারবে।
বিগত ৮-১০ বছরে যে ব্যাপকভিত্তিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন এদেশে ঘটে গেছে সেটিও আগামীতে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বিশেষ অবদান রাখবে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আরও ৫৭ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে। বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর প্রায় সবগুলোই শেষ হয়ে যাবে ২০২৬ সালের মধ্যে। এই প্রকল্পগুলোর প্রতিটিই জিডিপিতে বার্ষিক এক শতাংশের মতো করে যুক্ত করবে। দিন শেষে প্রবৃদ্ধির হার নিশ্চয় বাড়বে। সব মিলে বাংলাদেশে ‘ডাবল-ডিজিট’ প্রবৃদ্ধির বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। এখন আমাদের নজর রাখতে হবে এই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার মতো বহুমুখী টেকসই অর্থায়ন কৌশলগুলো কতোটা দক্ষতার সাথে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারি। যেমন আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম সূচক রিজার্ভকে অবশ্যই পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারের ওপরে আগামী দুই বছরের মধ্যে টেনে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রিজার্ভে সুস্থিতি এলে ‘সভরেন ওয়েলথ ফান্ড’ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। সবুজ অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক বন্ড চালুর নীতি উদ্যোগও নিতে হবে।
বাংলাদেশের বিগত ১৪-১৫ বছরের অর্জনগুলো সন্তুষ্ট হওয়ার মতো। সামনের ১৪-১৫ বছরে আরও বড় অর্জন করা সম্ভব-এ কথাও সত্য। তবুও মনে রাখা চাই যে, এই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বড় বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি তুলে ধরতে চাই-
০১) চলতি ও আর্থিক হিসেবের ভারসাম্য টানাপোড়েন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয়ে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফনের মতো চ্যালেঞ্জগুলোকে বাজার-বান্ধব নীতি কৌশলে বাগে আনা। বলতেই হবে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কঠিন সব নীতি সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আর তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময় কিন্তু এখনই।
০২) এখনো বাংলাদেশের তিন কোটির বেশি নাগরিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। আগামীতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে এদের কথা মাথায় রেখে নতুন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে এগুতে হবে।
০৩) আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আমরা প্রতি বছর মাত্র ২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছি। অথচ শ্রমশক্তিতে প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে গুণমানবিহীন এই শিক্ষিত তরুণদের প্রশিক্ষণ ও পুঁজি দিয়ে কি করে উদ্যোক্তা তৈরি করা যায় সেটিই হবে বর্তমান ও আগামীর সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
০৪) প্রয়োজনীয় কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে এমএসএমই খাতের প্রত্যাশিত বিকাশের জন্য অর্থায়নে বাধা, অবকাঠামোগত কমতি এবং প্রযুক্তির অভাবের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকবিলা করা চাই।
০৫) ব্যক্তি খাতে কাজের সুযোগ বাড়াতে বিনিয়োগের পরিবেশের উন্নতিও নিশ্চিত করতে হবে। পুরো অর্থনীতিতেই যে ব্যাপকভিত্তিক অনানুষ্ঠানিকতা রয়েছে (প্রায় ৮০%) তাও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে বড় বাধা। দ্রæতই আমাদের অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর ভিতর আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়ম-কানুন সহজ করে উদ্যোক্তা তৈরির কাজকে প্রাধান্য দিতে হবে।
০৬) প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবের কারণে গেøাবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১-এর প্রতিবেদন মতে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে যথাযথ সংবেদনশীলতা দেখাতে হবে।
০৭) প্রবাসীরা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির বড়ো ভিত্তি। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি প্রণোদনা বাড়িয়ে কি করে দেশ গড়ায় তাদের কার্যকরীভাবে যুক্ত করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
০৮) সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকে দরকারবোধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগুতে হবে। আগামী প্রজন্মকে স্বদেশ বিষয়ে আশাবাদী রাখতে সর্বত্র সুশান প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়গুলোকে যথাযথ নীতি-অগ্রাধিকার দিতেই হবে। দুর্নীতিকে না বলার মতো পরিবেশ তৈরি না করা গেলা তরুণদের বিদেশমুখী যাত্রা ঠেকানো মুশকিল হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর আশানুরূপ উন্নতি সাপেক্ষে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলেই ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। আর ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করলে সেখানে পৌঁছানো যাবে ২০৩০-এই। মাঝামাঝি প্রবৃদ্ধি নিয়ে হয়তো ২০৩৫-এই আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে পারি। তবে এ জন্য সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে যেমন আশাবাদী উদ্যোগ দরকার, তেমনি দরকার যথাযথ সংবেদনশীলতা দেখিয়ে চ্যালেঞ্জসমূহ শক্ত হাতে মোকাবিলার মানসিকতাও। আশা করি আগামী দিনে আমরা সবাই সেই রুপান্তরবাদী মন নিয়ে স্বদেশের কাক্সিক্ষত ধারার পরিবর্তনের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ হয়ে সচেষ্ট থাকবো। এই হোক এবারের বিজয় দিবসে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।



