Advertisement Placeholder

গণতন্ত্রে রাজনীতি, অর্থনীতির রসায়ন

মোস্তফা কামাল   |   শনিবার, ০২ নভেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ৮৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

গণতন্ত্রে রাজনীতি, অর্থনীতির রসায়ন

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি শুনতে বলতে বড় মধুর। যে যত তথ্য-তত্ত্বই দিক তা অর্জন সরকারের একার পক্ষে অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেখানে এখন একটি সুবর্ণ সময় চলছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে। উন্নয়ন সহযোগীরাও মুখিয়ে আছে। কিন্তু সুযোগটি ধরার আয়োজন অস্পষ্ট। এসডিজি কেবল ঘোষণার বিষয় নয়। সরকারও এখানে সব নয়। সব শ্রেণি, বিশেষ করে বেসরকারি সেক্টরের শরিকানা সম্পৃক্ততা জরুরি। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আস্থা ও আয়ত্তে নেওয়ার বিষয় রয়েছে। আর ব্যবসায়ী বলতে দেশে কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টিতে যুক্তরা। কিন্তু গণহারে ব্যবসায়ীদের শত্রু জ্ঞান করতে গিয়ে তাদেরও এক খাতায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এর অবসানে দরকার একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

ঋণখেলাপি গালমন্দে তাবৎ ব্যবসায়ীদের একাকার করে ফেলার হিল্লা করতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই। কে না জানে কিছু ঋণ তো দেওয়াই হয়েছিল তা ফেরত না নেওয়ার জন্য। বকশিশ, স্পিড মানির নামাবলিতে ঘুষ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ করেছে কারা? অর্থ পাচারকারীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহায়তার কথাও গোপন নেই। রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সেসব বন্দোবস্তের লাগাম না টানলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঠিক হবে না। তা বুঝতে মস্ত অর্থনীতিবিদ হওয়া জরুরি নয়। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেই বোধগম্য সরকারিভাবে ৫-৭ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। বাকিদের কর্মসংস্থানের ভরসা বেসরকারি সেক্টর। অথবা বিদেশ চলে যাওয়া। বলা বাহুল্য, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সমান সুযোগের দাবিতেই গেল আন্দোলনের সূচনা। যা পরে গড়ায় সরকার পতনে। সরকারি চাকরির বাইরে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মোক্ষম কোরামিন হতে পারেন নোবেল লরিয়েট প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তার ব্র্যান্ড ব্যবহার করে কেবল ঋণ-অনুদান বা অর্থ খাতে গতিময়তা নয়, দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের নয়া দরজা-জানালাও খুলতে পারে। আর হবে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভেদের বদলে আনতে হবে প্রতিযোগিতা। সেটার অনুঘটকও হতে পারেন তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন-উন্নতির কিচ্ছা শোনালেও দেশের অর্থনীতি হয়েছে অধোগতির শিকার। তার ওপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে নানা কারণে সেখানে ধাক্কা যোগ হয়েছে। স্যাবোটাজ চলেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর। নানা প্রতিবন্ধকতা শেষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তোড়জোড়কে টেকসই করতে গেলে অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি বেসরকারি খাতের শিরায় সঞ্চালন জরুরি। সেই উদ্যোগের প্রথমেই আবশ্যক ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ী মহলকে এগিয়ে যাওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া। তবেই রক্ত সঞ্চালন হবে অর্থনৈতিক সেক্টরে। আর রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত হলেই বাড়বে কর্মসংস্থান। বাস্তবে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে ব্যবসায়ীদের এখনকার বেশি চেষ্টা টিকে থাকার লড়াইয়ে। সেখানে পদে পদে আস্থার ঘাটতি। তার ওপর নানা ঝুঁকি। একদিকে সুদের উচ্চহার। নয়-ছয় সুদ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা টেনে আনতে ছিঁড়ে যায়। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ঘর্মাক্ত তারা। চাহিদা দৃষ্টে গ্যাস মিলছে না। বাড়তি দামেও পাচ্ছে না বিদ্যুৎ। এতে বর্তমান কারখানাগুলোই টিকিয়ে রাখা কঠিন। তারপরই না নতুন কারখানা গড়া এবং সেখানে কর্মসংস্থান তৈরি। গড়পরতা হিসাবে দেশে বছরে ২৫ থেকে ২৭ লাখ কর্মক্ষম লোক চাকরিজীবনে প্রবেশের যোগ্য। যার ৫-৬ শতাংশের বেশি সরকারি চাকরিতে অভিষেক হয় না। বাকিদের খুঁজতে হয় বেসরকারি দুয়ার। বিনিয়োগ না বাড়লে বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা হয় না, হবেও না। বিনিয়োগকারীরাই পেরেশানিতে থাকলে চাকরিপ্রত্যাশীরা পেরেশান কেন, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার পিলারও পাবে না। মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পর একটি আন্দোলনের মুখে সরকার এসেছে। এটা কোনো স্বাভাবিক সরকার নয়, যার বয়স তিন মাসও হয়নি। এর পরও এ সরকারের কাছে নতুন অনেক প্রত্যাশা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকলাঙ্গ দশা কাটানোর দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে। বেসরকারিদের ঘুরে দাঁড় হতে দেওয়ার সুযোগ তৈরির দায়িত্বও তার। এডহক নয়, টেকসই উন্নয়ন ছাড়া এ আঁধার কাটবে না। আর সেটা বাস্তবায়নে সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় অত্যাবশ্যক। বেসরকারি খাতের ভূমিকাকে কেবল স্বীকৃতি নয়, মর্যাদাও দিতে হবে। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কর্ম-পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ কতটা হচ্ছে তা মনিটরে ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত রাখার দরকার আছে। নইলে অন্তত তথ্যযোগ ও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র জানতে তাদের কাছে রাখতে হবে। নইলে তথ্য ঘাটতি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। আর তথ্য ঘাটতি থাকলে ত্রুটি থেকে যায় পরিকল্পনায়।

বিরাট সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে তাই ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীসহ সব মহলেই প্রাপ্তির একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এসডিজি অর্জনে কতটুকু অগ্রগতি, ঘাটতি ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা তুলে ধরতে হবে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে নির্মোহ তথ্য জোগান দিতে সক্ষম। বিগত সরকারের সময় নানা অবাস্তব তথ্য দিয়ে লোক হাসানো হয়েছে। হাসতে হাসতে মানুষ সেই সরকারটির পরিণতিও উপভোগ করেছে। মোটকথা সমীক্ষাটি যেন কেবল সরকারি না হয়। বিজনেস কমিউনিটিসহ সেখানে যেন থাকে বেসরকারি এমন কি ব্যক্তি খাতের তথ্য ও ভূমিকার তথ্য। সম্ভব হলে সম্পৃক্ততাও। বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেলেও দেশে পায় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের তুলে ধরার এক মোক্ষম সুযোগ এখন হাতের মুঠোয়। এমন সময়-সুযোগটা যেন হাতছাড়া না হয়।

সুযোগের সদ্ব্যবহারে উগান্ডা-রুয়ান্ডা পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তাদের অনগ্রসর, দুর্ভিক্ষ-হানাহানির দেশের তালিকায় ফেলে রাখার দিন আর নেই। ইথিওপিয়াকে ট্রল করাও এখন অবিচার। মাত্র কদিন আগে ধসেপড়া শ্রীলঙ্কা তো ম্যাজিকের মতো বদলে গেছে। কোনো ঝাড়ফুঁক বা অলি-আউলিয়ার দোয়া বা আলাদিনের চেরাগের ছোঁয়া নয়, খাদের কিনার থেকে যথাসময়ের যথাকাজ তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে। অন্ধকার আফ্রিকা বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ ওখানে এখনো খাদক-মাদক-সিন্ডিকেট কম নয়। পাশ্চাত্য নতজানু সমৃদ্ধ আফ্রিকাকে দরিদ্র করেছে তা দেশগুলোর নাগরিকদের বোধোদয়ে আসা হঠাৎ শুরু হয়নি। সময় লেগেছে।

পরিবারতন্ত্র, দলকানা রাজনীতি, রাজনৈতিক ডামাডোল-অস্থিরতা ওইসব দেশেও ছিল, আছে। লুট-চুরির অর্থ বিদেশে পাচারের কায়কারবারও আছে। সবার কথা না টেনে অন্তত শ্রীলঙ্কার কথা বিবেচনায় নিলে কিছু বার্তা বা মন্ত্র এমনি এমনিই রপ্ত হয়ে যায়। মাত্র দেড় বছর আগে কী ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়েই না পড়েছিল দেশটি। প্রায় দেউলিয়া হওয়ার জেরে দেশটিতে ব্যাপক ও কদাকার রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। যার অনিবার্য পরিণতিতে শ্রীলঙ্কার সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। দেশ ছাড়তে হয় দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে। বাংলাদেশ একজন ড. ইউনূসকে পেয়েছে। শঙ্কা থাকলেও এখানকার অবিরাম নির্যাতিত রাজনৈতিক দলগুলো শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিশোধ পরায়ন হয়নি। লঙ্কাকাণ্ড ঘটায়নি।

তার ওপর বিজনেস কমিউনিটিসহ সামাজিক শক্তিগুলো সরকারের পেছনে একাট্টা। শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার এত সুযোগ পায়নি। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যপথে ব্যবসা-বিনিয়োগকে প্রায়োরিটি দিয়েছে। আস্থায় নিয়েছে বনেদি, পেশাদার বিজনেস হাউসগুলোকে। ব্যবসা-বিনিয়োগের পথে মসৃণতার গ্যারান্টি দিয়েছে। সামাজিক শক্তিকে দিয়েছে ভরসা। ফল মিলেছে ম্যাজিকের মতো। গতিময়তা পেয়েছে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্রসহ প্রায় সব নীতি ও তন্ত্রসহ শিরা-উপশিরা। কীভাবে সম্ভব হলো ম্যাজিকটি? কেবল শ্রীলঙ্কার স্থানিক নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছেও এটি বিশ্লেষণের বিষয়। ভাবনার অনেক খোরাক আছে সেখানে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

Facebook Comments Box
আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার