Advertisement Placeholder

আমেরিকার নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি   |   শুক্রবার, ০১ নভেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   ৮২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

আমেরিকার নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব

বাংলাদেশ কিংবা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে অস্থিতিশীল যে কোনো দেশের নির্বাচনে পরাশক্তির প্রভাব বা প্রতিবেশী কোনো দেশের মোড়লিপনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু খবরটা যদি এমন হয়, বিশ্বমোড়লের তকমা পাওয়া খোদ আমেরিকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে ভিন্ন কোনো দেশ, তবে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। এই অবাক হওয়ার মাত্রা এবার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইরান, চীন, রাশিয়া-এ তিনটি দেশই আমেরিকায় ৫ নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন খবরগুলো। আর বরাবরের মতো আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইসরায়েলের তথা ইহুদিদের প্রভাবের বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।

প্রতি চার বছর পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নভেম্বর মাসের ১ তারিখের পর প্রথম মঙ্গলবার নির্বাচন হয়ে থাকে। এমন নির্বাচনের ঠিক আগে মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগরীয় দেশসমূহ বিশেষত ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, লেবানন বা সিরিয়ায় সামরিক উত্তেজনা একটি নিয়মিত দৃশ্য।

এ ছাড়াও ইরান এবং চীনেও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার নজির বারবারই দেখা যায়। এমন সামরিক উত্তেজনার নেপথ্যে থাকে সাধারণভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও সুনির্দিষ্টভাবে মুসলমানদের প্রতি কিংবা রাশিয়া ও চীনের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা দলের মনোভাব জানা, যা ভোটারদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে। এবার নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের আক্রমণের নেপথ্যে অনেকেই তাই আমেরিকার আসন্ন নির্বাচনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে ফিরছেন। শুরুটা করেছিল ইরানই। অক্টোবরের ১ তারিখে হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যালাস্টিক মিসাইল হামলা চালিয়েছিল ইরান। তথ্যমতে, ১৮০টি মিসাইল নিক্ষেপ করেছিল ইরান, তবে তার কয়টি ইসরায়েল ও আমেরিকার সৈন্যরা আকাশে ধ্বংস করে আর কয়টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, এ নিয়ে তর্ক রয়েছে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসরায়েল কিছুটা অপেক্ষা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে (২৭ অক্টোবর ২০২৪) ১০০ জঙ্গি বিমান নিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দিয়ে কেন ইরানে আক্রমণ চালাল এবং কী অর্জন করল, এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এ বিমান হামলার সঙ্গে আমেরিকার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছে পেন্টাগন তথা জো বাইডেন প্রশাসন। বাইডেনের দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কমলা হ্যারিস এরই মাঝে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারণাকালে গাজায় গণহত্যা বিষয়ে এক ছাত্রের করা প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে যান। তবে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বভাবসুলভ উগ্র ভাষায় ইরানকে সাবধান করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রচারাভিযানকালে উল্লেখ করেছেন, ইরান ইতোমধ্যে তার প্রচারণা কার্যক্রম হ্যাক করেছে। তার আশঙ্কা, এবারের নির্বাচনে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ একটি বড় নিয়ামক হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে। এ নির্বাচনের ফলাফল সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে বিধায় বিভিন্ন দেশ নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জোগাতে প্রণোদনা বা টাকা দিতে পারে বলে ভাবছেন তিনি। অন্যদিকে খোদ মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলাইভান বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষরা আমেরিকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করা ও গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের আস্থা নষ্ট করার জন্য অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আমরা এদিকে কড়া দৃষ্টি রাখছি এবং এ-সংক্রান্ত বহু প্রচেষ্টা প্রতিহত করছি।’ আমেরিকার নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব খাটানোর অভিযোগ প্রায় এক দশক পুরনো। ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগেই আলোচিত হয় রাশিয়া নানাভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কলকাঠি নাড়ার চেষ্টা করবে। ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটন। আর হিলারির প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইন বা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ডেভিড প্রডেস্ট্রা জুনিয়র। রাশিয়ার হ্যাকাররা দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার (জিআরইউ) পৃষ্ঠপোষকতায় ডেমোক্র্যাটদের ন্যাশনাল কমিটির তথ্যভাণ্ডারে হানা দেয় এবং হিলারি ক্লিনটন ও প্রডেস্ট্রার মাঝে বিনিময়কৃত ইমেইল ফাঁস করে দেয়। সেই নির্বাচনে জিতেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রাশিয়ার ইন্টারনেট রিসার্চ এজেন্সির (আইআরএ) বিরুদ্ধে আমেরিকার নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো আমেরিকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভক্তি সৃষ্টি। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভক্তিমূলক উপকরণ বা কনটেন্ট প্রচার করা, মিথ্যা তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার রাশিয়ার হ্যাকারদের অন্যতম কাজ ছিল। পরবর্তীতে আমেরিকার প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে নির্বাচনে রাশিয়া ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার করেছিল মর্মে মতামত দিয়েছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনেও বাইডেনকে কাবু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিতিয়ে আনতে রাশিয়া তার গোয়েন্দা সংস্থা ও হ্যাকারদের দিয়ে অসংখ্য ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। পরে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে আকর্ষণীয় কনটেন্ট প্রচার করা হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রার্থীকে সমর্থন, অপছন্দের প্রার্থীকে নিয়ে বিতর্কিত বিষয় উপস্থাপন প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। এ ছাড়াও রাশিয়া সে বছর বহু সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ও নিউজ চ্যানেলে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে ঢুকে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব বা হস্তক্ষেপ হয়েছিল অতি সূক্ষ্মভাবে। ফলে এ-সংক্রান্ত তেমন প্রামাণ্য দলিল কারও কাছে নেই। তবে কিছু একটা যে হয়েছে এবং এবারও হতে যাচ্ছে, তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় ২০২৪-এ এসে। প্রখ্যাত উদ্যোক্তা, উপস্থাপক ও লেখক প্যাট্রিক বেট ডেভিডের ‘পিবিডি পডকাস্ট’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে গত ১৭ অক্টোবর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বাধানোর জন্য সরাসরি ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে দায়ী করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জেলেনস্কিকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট সেলসম্যান অন আর্থ’ (বিশ্বসেরা বিক্রেতা) নামে আখ্যায়িত করেন। সামরিক সহায়তার নামে আমেরিকার কয়েক বিলিয়ন ডলার ইউক্রেনকে দেওয়ার সমালোচনাও করেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবারের নির্বাচনে জয়লাভ করলে বৈশ্বিক পরিমণ্ডল ও বিশেষ কিছু দেশের অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি ও সমরনীতিতে কী ঝুঁকি আসতে পারে, সে বিষয়ে গবেষণা করে বিশ্লেষকরা একটি সূচক দাঁড় করিয়েছেন, যার নাম ‘ট্রাম্প রিস্ক ইনডেক্স’ (টিআরআই)। এ সূচক অনুসারে ট্রাম্প জয়ী হলে ইউক্রেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে বলে গবেষণায় উঠে আসে। এমন বহু সমীকরণ প্রমাণ করে, আমেরিকার আসন্ন নির্বাচনে রাশিয়া গোপনে তৎপর থাকার যথেষ্ট কারণ আছে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখে মাইক্রোসফট ব্লগে আমেরিকার নির্বাচনে চীনের প্রভাবের বিষয়টি স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন দলের যেসব নেতা আমেরিকার চীনবিরোধী নীতিকে সমর্থন করেছেন বা করছেন, তাদের নিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হচ্ছে চীনা পৃষ্ঠপোষকতায়। চীনের প্রভাবে এক দল গবেষক এসব প্রার্থীর দুর্বলতা বের করে তা তুলে দিচ্ছেন তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। চীনবিরোধী এসব প্রার্থীর মধ্যে আছেন ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের ব্যারি মোর, সেন মারছা, ব্ল্যাকবার্ন, সেন মার্কো রুবিও প্রমুখ। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র দ্য ইপক টাইমসের মতে, নির্বাচনে চীনের প্রভাব বিস্তারের কৌশল রাশিয়া থেকে আলাদা। চীন তাদের লক্ষ্য বা টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় একশ্রেণির রাজনীতিবিদদের, যাদের চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। এ বিষয়ে জেফ নাইকুইস্ট নামক গবেষকের ধারণা, চীনের উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমে নিজেদের বীজ বপন করা বা পশ্চিমে ঢুকে পড়া। তারপর তাদের এতটাই শক্তিশালী করে তোলা, যে পরবর্তীতে তারা যখন কিছু চায়, প্রশাসন সেখানে আর না করতে না পারে। এভাবেই কৌশলে চীন তাদের পক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় থাকে। ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট এ ব্রায়েন বলেছিলেন, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে চাওয়া দেশগুলোর মধ্যে চীন প্রশাসনের তৎপরতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি থাকে। এবারে নির্বাচনে চীনা প্রভাবে কী হচ্ছে তার আভাস দিয়েছে মাইক্রোসফটের ঝুঁকি বিশ্লেষণ কেন্দ্র। তাদের মতে, চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় আমেরিকায় চলছে ‘তাইজি ফ্লাড’ বা ‘শেমোফ্লাজ’ নামক প্রচারাভিযান, যা চীনবিরোধী প্রার্থীদের হারানো ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিভিন্নভাবে জিতিয়ে আনতে উঠেপড়ে লেগেছে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখে আমেরিকার বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম সিএনএনের একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘মাইক্রোসফট বলেছে, ইরানের হ্যাকাররা ঝুঁকিতে ফেলতে আমেরিকা নির্বাচনি ওয়েবসাইটসমূহে ঢুকে পড়েছে।’ এবিসি নিউজের মতে, ইরান ব্যাপকহারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যন্ত্র (এআই টুলস) ব্যবহার করে প্রার্থীদের বক্তব্য পর্যন্ত পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এবিসি ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী কমলা হ্যারিসের পক্ষে ইরান কাজ করছে বলে দাবি করলেও অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিএনএন বার্তা সংস্থাটির অনুসন্ধান দিয়েছে ভিন্ন চিত্র।

সিএনএন-এর মতে, বহু ইরানি নাগরিক ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে দেখতে চায়। তাদের মতে, কমলা হ্যারিস ক্ষমতায় গেলে বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে স্থিতি অবস্থা দীর্ঘায়িত হবে। আর ট্রাম্প একজন শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট ও নেতা হিসেবে শক্ত হাতে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন।

সার্বিক বিচারে এ মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বিশ্ববাসীর। নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর পরাজিত প্রার্থী নির্বাচনটিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে কী বলেন, তা দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

ইমেইল : directoradmin2007@gmail.com

Facebook Comments Box
আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আবু তাহের
নির্বাহী সম্পাদক
লাবলু আনসার