বৃহস্পতিবার ২৩শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ছোট ভাই টুটুলের মৃত্যু ও গণস্বাস্থ্য মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের শপথ

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম   |   বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২ | প্রিন্ট  

ছোট ভাই টুটুলের মৃত্যু ও গণস্বাস্থ্য মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের শপথ

মুসলিম জাহানের সব থেকে মর্মন্তুদ হৃদয়বিদারক ঘটনা কারবালায় ইমাম হোসেনের হত্যা। মাবিয়া পুত্র এজিদ দামেস্ক থেকে মুসলিম জাহানের খবরদারি করতে চেয়েছিলেন। হজরত আলী (রা.)-এর পুত্র ইমাম হাসান-হোসেন থাকতে হজরত মাবিয়ার পুত্র এজিদের মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব করার তেমন সুযোগ ছিল না। তাই এজিদ পরিকল্পনা করেছিলেন ইমাম হাসান-হোসেনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে নিষ্কণ্টক হওয়ার। ইমাম হাসানকে হত্যা করা হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে। আর ইমাম হোসেনকে প্রতারণা করে মদিনা থেকে সরিয়ে কারবালার প্রান্তরে পানি বন্ধ করে দিয়ে তার বংশের প্রায় সবকজন পুরুষকে তিলে তিলে মেরেছিলেন। সর্বশেষ সীমারের হাতে ইমাম হোসেনের ছিন্ন মস্তক দামেস্কে নিয়েছিলেন উল্লাস করার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাবিয়া পুত্র এজিদের সে সাদ পূরণ হয়নি। প্রবল বিক্রমে হজরত আবু হানিফা মুসলিম জাহানের অন্য সেনাপতিদের নিয়ে এজিদের বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ বলেছেন, কবি সাহিত্যিকদের বর্ণনা, ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ।’ মানে ঘোরতর আঘাতপ্রাপ্ত হলে বিপদে পতিত হলে ইসলামের জাগরণ সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর বহুক্ষেত্রে এমনই দেখা যায়। চরম পরম আঘাতের পর অনেক ক্ষেত্রে অনেক জাতি মুক্তির নেশায় রুখে দাঁড়ায়। আল্লাহকে হাজার শুকরিয়া পবিত্র ১০ মহররমে আমার পর্ব পড়েছে। দয়াময় আল্লাহ সারা পৃথিবীকে হেফাজত করুন, মানব জাহানকে হেফাজত করুন। বিশেষ করে মুসলিম জাহানকে তাওহিদি তাকত দান করুন আমরা যেন ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে শান্তির নীড় স্থাপন করতে পারি।

গত ৫ আগস্ট শুক্রবার আমার বড় চাচা আবদুল বারী সিদ্দিকীর একমাত্র ছেলে মাহবুবুল সিদ্দিকী টুটুল ব্রেনস্ট্রোক করে মারা গেছে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বড় চাচা বারী সিদ্দিকীই আমাকে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দিয়েছিলেন। আমার দুই দাদি। আমার বাবার মা মাহতাবুন নেছা তাকে দুই বছরের রেখে মারা যান। বাবার দাদি করিমন নেছা তাকে লালন-পালন করে বড় করেন, মানুষ করেন। আমার দাদি মারা গেলে দাদু আলাউদ্দিন সিদ্দিকী আবার তার চাচাতো বোন আতামন নেছাকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে চার ছেলে, দুই মেয়ে- আবদুল বারী সিদ্দিকী, মোতাহার সিদ্দিকী, বুদ্দু সিদ্দিকী, আবদুল ওয়াদুদ সিদ্দিকী, আল বোলা সিদ্দিকী ওরফে আমিনা খাতুন, আসুদা সিদ্দিকী ওরফে আছিয়া খাতুন। দুই ছেলে আগেই মারা গিয়েছিল। আবদুল বারী সিদ্দিকী বাবার থেকে ৮-১০ বছরের ছোট। একেবারে ছোট ছেলে আবদুল ওয়াদুদ সিদ্দিকী। সেই আবদুল বারী সিদ্দিকীর একমাত্র ছেলে মাহবুবুল আলম সিদ্দিকী টুটুল হঠাৎই মারা যাওয়ায় দেহমনে খুবই প্রভাব পড়েছে। আমার থেকে প্রায় ৩০ বছরের ছোট। ভাইটি খুবই ভালো ছিল। দুটি ছোট্ট ছোট্ট মেয়ে রেখে চলে গেছে। কোথায় কী রেখে গেছে কেউ কিছুই জানে না। হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে অধ্যাপক দীন মোহাম্মদের অধীনে ভর্তি করা হয়েছিল। অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ একজন অসাধারণ মানুষ। ডাক্তারি শাস্ত্রে খুবই সুনাম অর্জন করেছেন। এক সময় উভয় বাংলার চিকিৎসা জগতের দিকপাল বিধান চন্দ্র রায়ের মতো দীন মোহাম্মদকে অনেকেই ভরসা করেন, আমিও করি। তার সঙ্গেই হাসপাতালের আইসিইউ-তে ছোট ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম। অনেকটাই অচেতন পড়েছিল। নিউরোসায়েন্সের পরিপাটি নতুন আইসিইউ দেখে বেশ ভালো লেগেছে। জ্ঞান ফিরায় বৃহস্পতিবার তাকে ছুটি দিয়েছিল। উত্তরার দক্ষিণখানের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিনই সে মারা যায়। মৃত্যু অবধারিত, আল্লাহর ইচ্ছে। এখানে বান্দার কোনো হাত নেই, কোনো মানুষের হাত নেই। মৃত্যুর জন্যে কারও মন খারাপ করার সুযোগ নেই। তবু কেন যেন বুক ফেটে যায়। কিছুই করার থাকে না। পরম দয়ালু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন আমার এই ভাইটিকে ক্ষমা করে বেহেশতবাসী করেন। আর তার পরিবার পরিজনকে, টুটুলের মা সাইদা বারী সিদ্দিকী, স্ত্রী- শারমিন আক্তার আঁখী, বাচ্চা মেয়ে- আলফী সিদ্দিকী তোবা ও আনিফা সিদ্দিকী তাহানীকে এই শোক সইবার শক্তি দান করেন। ২ আগস্ট গিয়েছিলাম সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বর্ষ শুরুর শপথ অনুষ্ঠানে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ইচ্ছে মেডিকেলের ২৭তম ব্যাচের সূচনা হবে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শপথ অনুষ্ঠান এবং মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তারা আমাকে নির্বাচন করেছিলেন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে মতের অনেক অমিল থাকলেও তাকে আমি প্রচ- ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি। তার আহ্বান কখনো ফেলতে পারিনি, খুব একটা ফেলিও না। তাই রাজি হয়েছিলাম। পয়লা আগস্ট ছিলাম টাঙ্গাইলে। তাই টাঙ্গাইল থেকে সাভারের দিকে সকাল সকাল রওনা দিয়েছিলাম। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ১১টায়। অনেক সময় রাস্তায় যানজট থাকে সেই চিন্তা মাথায় নিয়ে সাড়ে ৮-পৌনে ৯টায় রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন কোনো যানজট ছিল না। এক ঘণ্টা ১০-১৫ মিনিটে সাভার পৌঁছে গিয়েছিলাম। ১১টায় অনুষ্ঠান, ১০টায় পৌঁছলে কেমন হয়। তাই স্মৃতিসৌধের সামনে পর্যটন করপোরেশনের জয় রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম। পদ্মা সেতু হওয়ার পর সাভার পর্যটন করপোরেশনের রেস্টুরেন্টের বেচাকিনা নাকি অনেকটাই কমে গেছে। সেখানে সাজানো গোছানো একটা চমৎকার ভিআইপি রুমও আছে। গিয়ে বসতেই, ‘কী চাই, কী খাবেন?’ চা-কফি ছাড়া কিছুই খাবার ইচ্ছে ছিল না। বললে তারা বিস্কুটের প্যাকেটসহ চা এনে দেয়। আমার সঙ্গী আলমগীর। প্রথম প্রথম সে চা খেতে চায়নি। পরে সেও এক কাপ চা খেয়েছে। একটু পরে রেস্টুরেন্টের প্রায় সবাই এলেন, ছবি তুললেন। ম্যানেজার ছিলেন না। সহকারী ম্যানেজার আমিনুল হক ছিলেন। সহকারী ম্যানেজার অনেকক্ষণ আলাপ করেছেন। সঙ্গে রেস্টুরেন্টের সেপ গফরগাঁওয়ের শফিকুল ইসলাম। আলতাফ গোলন্দাজ, তার ছেলে বাবেলসহ আমাদের সবাইকে জানেন, চিনেন। কথা বলতে বলতে আলাপ করতে করতে অনেক সময় কেটে যায়। ১০টা ৪৫ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ছিলাম। দরজায় বহু মানুষ। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ছবি তুলতে তুলতে ৫-৭ মিনিট কেটে যায়। ১১টা ৩ মিনিটে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের গেটে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে কেউ ছিল না। বাগানের পাশে এমনিই বসেছিলাম। রংপুরের একজন মহিলা নিরাপত্তাকর্মী শ্রীমতী পুরবী উঁকিঝুঁকি মারছিলেন। তাই তাকে পাশে বসিয়ে ছবি তুলেছিলাম। এ সময় কলেজের দু-একজন আসেন। তারপর আরও বেশ কয়েকজন। তারা ওই গেটে নয়, আরও পূর্ব-দক্ষিণে প্রথম গেটে অপেক্ষা করছিলেন। যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে ৫০০-৬০০ গজ হবে। হেঁটেই মেডিকেল কলেজের আঙিনায় গিয়েছিলাম। প্রিন্সিপাল ডা. মুহিবুল্লাহ তার ঘরে বসিয়ে ছিলেন। কথাবার্তা হচ্ছিল। এ সময় কোথা থেকে ডাক্তার হান্নান এসে হাজির। ডাক্তার হান্নান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার। গিয়াসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই হিসেবে ’৯০ থেকে হান্নানকে চিনি জানি। খুবই ভালো মানুষ। আমার জন্য একেবারে দিওয়ানা। হান্নানকে এখানে কেন জিজ্ঞেস করতেই বলল, আমি এখন গণস্বাস্থ্যে কাজ করি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভালো মানুষকেই নিয়োগ করেছেন। এর একটু পর হালকা পাতলা চমৎকার দেখতে একজন এসে বললেন, আমি পিটিআই ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেন্ডেন্ট আবদুল মতিনের ছেলে আবদুল মাসুম। আমি অবাক বিস্মিত হলাম। যখন আমি খুব দস্যি ছিলাম আর একমাত্র পিটিআইয়ের প্রাইমারিতে একনাগাড়ে ৩-৪ বছর পড়েছি, তাও আবার ৪-৫ স্কুলে ঘোরাঘুরি শেষে। হাইস্কুলেও তেমনি ৫-৬ স্কুলে লেখাপড়া করে প্রাইভেট দিয়ে মেট্রিক পাস করেছিলাম। প্রাইভেটে মেট্রিক দেওয়ার কারণ আমি ’৬৫-এর শুরুর দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ’৬৭-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চলে এসেছিলাম। তাই হঠাৎই সুপারিনটেন্ডেন্ট স্যারের ছেলেকে দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছিল। স্যার আমাকে খুব মারধর করতেন, গালাগাল করতেন। অপদার্থ ছাড়া কিছুই ভাবতেন না। আমি যখন নির্বাসনে বর্ধমানে ছিলাম তখন সেই স্যার আমার বর্ধমানের বাসায় গিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদে তার আদি বাড়ি। যেখান থেকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর মুর্শিদাবাদে যাতায়াত করতেন। সেবার তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বড় উদ্বিগ্ন হয়ে আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাবার ছোট্ট একটা চিঠি ছিল তার হাতে। তাতে কড়া হুকুম, পত্র বাহককে সব রকমের সহযোগিতা করবে। কারণ সুপারিনটেন্ডেন্ট স্যার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্যারকে বলেছিলাম, পাসপোর্ট রেখে যান। যেদিন ইচ্ছে বনগাঁ বর্ডারে আপনার পাসপোর্ট পাবেন। ভিসার জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না। আর যারা বললে হবে তারা মুর্শিদাবাদে বলে দিবে ভিসার মেয়াদের জন্য যেন আপনাকে কেউ বিরক্ত না করে। আমার কথায় স্যার তেমন আশ্বস্ত হয়েছিলেন কিনা জানি না। তবে আরও এক মাস কাটিয়ে আবার বর্ধমানে এসেছিলেন। প্রথমবার যেমন একরাত ছিলেন, সেবারও একরাত ছিলেন। সীমান্তে যার কাছে পাসপোর্ট তাকে বলে দিয়েছিলাম পাসপোর্টধারী আমার গুরু, আমার শিক্ষক। তারা তাকে খুব যত্ন করে সিল ছাপ্পর মেরে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশের কাস্টমস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। বর্ডারে দারুণ সমাদর পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। টাঙ্গাইল ফিরে বাবার কাছে সে যে কী প্রশংসা, ‘যাকে সব সময় অপদার্থ ভেবেছি আজ দেখছি সেই পদার্থ হয়েছে। কত নাম, যেখানেই গেছি সেখানেই টাইগার সিদ্দিকী। আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন।’

গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কড়কড়া রোদে সাভার স্মৃতিসৌধে শপথ গ্রহণের পর কলেজ প্রাঙ্গণে আলোচনা সভায় আমি একমাত্র বক্তা। প্রিয় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নানাভাবে আমাকে তুলে ধরে কথা বলতে দিয়েছিলেন। সব সময় যেভাবে বলি সেভাবেই বলেছিলাম। ছাত্রছাত্রীদের আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি বলেছিলাম, যৌবনে বাংলার সব ছেলেমেয়ে কবিতা লিখে, গান গায়, প্রেম করে। আমি এক দুর্ভাগা বাঙালি যে যৌবনে প্রেম করিনি, কবিতা লিখিনি, গান গাইনি। আমি ভালোবেসেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে। আর বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছিলাম বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর মাধ্যমে। তিনি রাজনীতি করতেন। তিনি বক্তৃতা করে যখন মাঠঘাট কাঁপিয়ে তুলতেন শ্রোতারা হাততালি দিতেন। কেন যেন আমিও তালি দিতাম আর ভাবতাম, আমি কত গর্দভ, আমার মায়ের পেটের ভাই তার কথায় মানুষ নেচে ওঠে, আমার কথা কেউ শুনে না। বড় ভাইকে দেখে আস্তে আস্তে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম, রাজনীতিতে এসে বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে দেশ ও দেশমাতৃকাকে চিনেছিলাম, ভালোবেসে ছিলাম। সেই ভালোবাসা নারীর প্রেমের চাইতে শক্ত, পোক্ত অম্লান হয়েছিল। যা আজও আছে। আমি যেমন মাকে ভালোবাসি, তেমনি মাতৃভূমিকে ভালোবাসি। আমি যেমন স্ত্রী-সন্তান সন্ততিদের ভালোবাসি, মা-মাটি-মানুষকে তেমনি করেই ভালোবাসি। মেডিকেলের পাঠদানের সূচনায় শপথ শেষে আলোচনায় বলতে গিয়ে বলেছিলাম, ছোট বয়সে তোমাদের কারও স্কুলে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করতাম, বড় হয়ে কী হবে। একজনও উত্তর করেনি। বক্তৃতা শেষে কয়েকজন এটা ওটা প্রশ্ন করেছিল। আমি দুঃখ করে বলেছিলাম, উকিল-মোক্তার-জজ-ব্যারিস্টার-চাকরিজীবী সবাই হতে চায়। কিন্তু প্রকৃত মানুষ হওয়ার চিন্তা কেউ করে না। সর্বশেষ একটি মেয়ে বলেছিল, ‘আমি লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়ে জনসেবা করে মানুষের মতো মানুষ হব- এই ছিল আমার আজীবনের কামনা বাসনা।’ মেয়েটির কথায় মনটা ভরে গিয়েছিল। মেয়েটির কথাবার্তা আরও অনেক সাজানো গোছানো ছিল। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে বলেছিলাম, আমি বঙ্গবন্ধুকে যেমন করে ভালোবাসি, রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষকে যেমন ভালোবাসি, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে অনেকটা তেমন করে ভালোবাসি। গণস্বাস্থ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে ছিলাম। ডানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বামে খেতে বসেছিল ফিরোজ কবীর। এক সময় সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যার পর জার্মানে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। সেই ফিরোজ কবীর থাকতেও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিজমা নিরাপদ নয়। বারবার ভাবছিলাম, হায় আল্লাহ জাফরুল্লাহকে পিতা দিলেন ৩৫ একর, আমি ১ লাখ ৪ হাজার অস্ত্র দিলাম আমাকে বাবর রোডে দিয়েছিলেন ৫ কাঠার বাড়ি যা আজও বৈধ হলো না, অবৈধই থেকে গেল। তাই মাঝে মাঝে যেন কেমন লাগে। দুপুরের খাবার আমার খুবই ভালো লেগেছে। খাবারে ছিল চিংড়ি মাছ দিয়ে করলা, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, একেবারে ময়মসলা ছাড়া ঢেঁড়সের তরকারি। চিংড়ি মাছে আমার দারুণ এলার্জি বলে আমি খাইনি। বাকি তিনটা পদ হয়েছিল অসাধারণ। বেগুন ভর্তায় দারুণ ঝাল ছিল। তবে ঝালের মতো স্বাদও হয়েছিল। ডা. জাফরুল্লাহ কয়েকবার তাড়া দিচ্ছিলেন- মাছ, মাংস কই। একেবারে শেষ পর্যায়ে ডিম এনে দিয়েছিল। দারুণ সুস্বাদু। খাবার শেষে চলে আসার সময় যারা খাওয়াচ্ছিলেন তাদের ঘরে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বুঝলাম মাছ, মাংসের রান্না শেষ হয়নি। এক চমৎকার স্মৃতি নিয়ে, ভালো লাগা নিয়ে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ফিরেছিলাম।

দেশের সবচাইতে বেশি আলোচিত তর্কিত বিতর্কিত বিষয় পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়ানো। যখন সারা দুনিয়ায় ১৭০ ডলার হয়েছিল প্রতি ব্যারেল তখন বাড়ানো হয়নি। এখন ৮৮-৯০ ডলার প্রতি ব্যারেল। কদিনে আরও কমবে। এর মধ্যে আবার প্রিয় বোন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, অকটেন পেট্রোল দেশেই উৎপাদন হয়। ঠিক এমনি এক সময় হঠাৎ করে তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি অকল্পনীয়। প্রিয় বোনকে বিনয়ের সঙ্গে বলব, আপনাকে ডুবানোর জন্যে আপনার কাছে শত্রুরা আশ্রয় নেয়নি তো? যে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোল জাতীয় পণ্যের দাম নিম্নমুখী ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি আপনার বিরুদ্ধে একটা গোপন ষড়যন্ত্র নয় তো। অকটেন পেট্রোলের দাম বাড়ানো কিছুটা মেনে নেওয়া গেলেও ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানো কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এতে দেশের অর্থনীতির ওপর, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ওপর প্রচ- চাপ পড়বে এবং বিরোধী আন্দোলন বেগবান হতে সহায়তা করবে।

বুঝতে পারছি না, রাস্তাঘাট থেকে তুলে এনে যাদের বড় বড় পদ দিয়েছেন তারা আপনার সর্বনাশ চায় কিনা। এই সেদিন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন হুট করেই বলেছেন, ‘রেল তো আর কাউকে ধাক্কা মারে না। রেলকে কেউ ধাক্কা মারলে আমরা কী করতে পারি।’ কথাটা ভেবে বলেননি, সময় বিবেচনা করেননি। এ রকম উত্তেজনাকর সময় তার ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত। রেল দুর্ঘটনার কারণে ভারতের রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। তার বন্ধুরা বলেছিলেন, ‘আপনি তো আর রেল চালান না, দুর্ঘটনার জন্য পদত্যাগ করবেন কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রেল চালাই না সত্য, কিন্তু যারা রেল চালায় আমি তাদের চালনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমি তাদের ভালোভাবে চালাতে পারিনি বলেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর জন্য আমিও দায়ী। তাই পদত্যাগ করছি।’ মনে হয় অমন নীতিবান নুরুল ইসলাম সুজন নন। তাই তিনি পদত্যাগ করবেন না। করলে তাকে পদচ্যুত করতে হবে।

লেখক : রাজনীতিক।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar