শনিবার ২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নিউইয়র্কে ‘ঘুংঘুর সম্মাননা-২০২২’ পেলেন মুক্তিযোদ্ধা-লেখক ড. নূরুন্নবী

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২ | প্রিন্ট  

নিউইয়র্কে ‘ঘুংঘুর সম্মাননা-২০২২’ পেলেন মুক্তিযোদ্ধা-লেখক ড. নূরুন্নবী

ঘুংঘুর এওয়ার্ড নিচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা-লেখক-বিজ্ঞানী নূরুন্নবী। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।

‘যে চেতনা ও দেশপ্রেম নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই চেতনায় আজও লিখে যাচ্ছেন ড. নূরুন্নবী। তিনি একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ার পথিকৃৎ। তাঁকে ‘ঘুংঘুর সম্মাননা-২০২২’ দিতে পেরে লিটল ম্যাগাজিন ‘ঘুংঘুর’ নিজেদের ধন্য মনে করছে।’এমন অনেক অভিব্যক্তিই প্রকাশ করেছেন অনুষ্ঠানের সুধীজন।

নিউইয়র্কে ১ আগস্ট সোমবার দিনটি এভাবেই অংকিত হয় অভিবাসী বাঙালীদের মানসপটে। অনুষ্ঠানটি ছিল জ্যাকসন হাইটসের ‘নবান্ন পার্টি হলে’ ‘ঘুংঘুর’ নিউইয়র্ক বইমেলা সংখ্যা ২০২২ এর প্রকাশনা ও সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে। বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী শিরিন বকুলের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্বে ছিল ‘ঘুংঘুর’ এর মোড়ক উন্মোচন ও তা নিয়ে কথা। আর দ্বিতীয় পর্বে ছিল ‘ঘুংঘুর সম্মাননা ২০২২’ প্রদান অনুষ্ঠান।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঘুংঘুর এর সম্পাদক ও বিশিষ্ট লেখক হুমায়ুন কবির। তিনি ঘুংঘুর এর এই নয় বছরের পথচলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, ‘ঘুংঘুর’ ই একমাত্র লিটল ম্যাগাজিন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংখ্যা প্রকাশ করেছে। আরও করার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, আজ আমরা একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতে পেরে সত্যিই গর্বিত ও আনন্দিত।
এই পর্বে ঘুংঘুর ও লিটল ম্যাগাজিনের পথচলা নিয়ে কথা বলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার। তিনি সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা ও আজকের কর্পোরেট শাসিত সাহিত্যবাজার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। লিটল ম্যাগাজিনের আড়ালে ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে ‘ধান্দাবাজী’ শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, ঘুংঘুর হচ্ছে একমাত্র লিটল ম্যাগাজিন, যেটি বাংলাদেশের বাইরে থেকে প্রকাশিত হলেও, রাজধানী ঢাকা এবং বেশ কটি দেশ থেকে তা নবীন লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে বের হচ্ছে।
ঘুংঘুর নিয়ে আলোকপাত করেন চলতি সংখ্যার অতিথি সম্পাদক বিশিষ্ট লেখক আবেদীন কাদের। তিনি এই সংখ্যায় প্রকাশিত ভালো ও মন্দ লেখাগুলো নিয়ে কথা বলেন।
প্রথম পর্বে সাহিত্য ও চিত্রকলা নিয়ে কথা বলেন নন্দিত টিভি তারকা ও চিত্রশিল্পী বিপাশা হায়াত। তিনি বলেন, আমরা সৃজনে বিশ্বাস করি। আমরা জানার আগ্রহ নিয়ে পড়ি। সেই আলো প্রজন্মের মাঝে ছড়ানোর জন্য কাজ করেই এগোতে চাই।
সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের লেখা ‘বাবা বলতেন’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন, বিশিষ্ট আবৃত্তিকার গোপন সাহা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব যুক্তরাষ্ট্র শাখার আহ্বায়ক কবি মিশুক সেলিম। নিউইয়র্কের সাহিত্যচর্চা ও ‘সাহিত্য একাডেমি’র পথচলা নিয়ে বক্তব্য রাখেন একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেন।
এই সার্বিক আয়োজনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সমাজসেবক-শিল্পপতি ও ৩১তম নিউইয়র্ক বইমেলার আহ্বায়ক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া।
এরপরই শুরু হয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানটি।

প্রথমেই সূচনা বক্তব্য দেন ‘ঘুংঘুর’ সম্পাদনা পরিষদের সদস্য বিশিষ্ট কবি ফকির ইলিয়াস। ফকির ইলিয়াস তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই মহান জীবনে ড. নূরুন্নবীর পথচলাকে আমি তিনটি পর্বে যদি ভাগ করি তবে তা হচ্ছে, তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, রাষ্ট্র মানুষ ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর লেখালেখি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই উত্তর আমেরিকায় আসার পরেও তিনি বাংলাদেশের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিলের বিরুদ্ধে, ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে অনুষ্ঠিত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রথম সারিতে ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই টমাস কিটিং নামে একজন মার্কিন আইনজীবিকে গণআদালতের মঞ্চে ঢাকায় আমরা পাঠিয়েছিলাম।
ফকির ইলিয়াস উল্লেখ করেন, তাঁর ধ্যান ও চেতনা থেকে অনেক তাত্ত্বিক কথাই আমরা পেয়েছি, যা আমাদের সংগ্রামকে শাণিত করেছে।
কবি ফকির ইলিয়াস ড. নূরুন্নবীর সহধর্মিনী ড. জিনাত নবীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই সাহসী নারী ছায়ার মতো পাশে থেকে তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েই চলেছেন।
ডঃ নবীর পরিচিতি উপস্থাপনকালে সাপ্তাহিক বাঙালী’র সম্পাদক কৌশিক আহমেদ বলেন, ড. নবী আজীবনের মুক্তিযোদ্ধা।

তিনি এই সংগ্রাম আজও করেই যাচ্ছেন তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে। তাঁর এ পর্যন্ত ১৭টি বই বেরিয়েছে। এগুলো ইংরেজীতেও অনূদিত হয়েছে। তা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বুক হিসেবে পঠিত হচ্ছে। তিনি প্রজন্মের কাছে সত্য ও আলোকিত কথাগুলোই জানিয়ে যাচ্ছেন লেখনীর মাধ্যমে। উত্তর প্রজন্ম জানতে পারছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক না’জানা কথা।
অনুষ্ঠানে ড. নবী’র সংগ্রামী জীবন ও সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন বিশিষ্ট ছড়াকার ও লেখক লুৎফর রহমান রিটন।
গতবছর ঘুংঘুর সম্মাননা প্রাপ্ত বিশিষ্ট শিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম বক্তব্য রাখেন ড. নবীর জীবন ও আদর্শ নিয়ে। তিনি বলেন, এই গুণী ও ত্যাগী মানুষটির কাছে আমরা সবাই ঋণী। এই সমাজ ও প্রজন্ম বিনির্মাণে ড. নবী যে ত্যাগ ও চেতনা বিলিয়ে গিয়েছেন-তা কালে কালে স্মরণ করা হবে, এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিশিষ্ট চিন্তক বেলাল বেগ।
এরপরেই শুরু হয় সম্মাননা প্রদান পর্ব। গীতিকার ও শব্দজন ইশতিয়াক রুপু ফুলের তোড়া তুলে দেন ড. নূরুন্নবীর হাতে। তার পরেই বেলাল বেগ,তাজুল ইমাম,লুৎফর রহমান রিটন সহ অন্য অতিথিরা সম্মাননা পদক তুলে দেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও লেখক মুক্তিযোদ্ধা ডঃ নূরুন্নবীর হাতে। এই সময় এক আবেগ ঘন আবহ তৈরি হয়।
সংবর্ধনা ও সম্মানায় অনুভ’তিব্যক্তকালে ড. নবী বলেন, আমার পিতা আমাকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছিলেন। ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার সাহস দিয়েছিলেন। আমি সেই আলোকেই জীবন পরিচালিত করেছি। তিনি ড. জিনাত নবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি তাঁর কাছে বিশেষভাবে ঋণী। তাঁর সমর্থন ও সাহায্য ছাড়া আমার এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমি আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আপনারা সকলে এবং ‘ঘুংঘুর’ আমাকে যে সম্মান দিল- তা আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন হয়েই থাকবে।
পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত লেখক সাহিত্যিক, জার্মানী ও ঢাকা থেকে আগত লেখক-প্রকাশক সহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন এই আয়োজনে।
উল্লেখ্য, এর আগে ‘ঘুংঘুর সম্মাননা’ পেয়েছেন বিশিষ্ট চিন্তক বেলাল বেগ, লেখক-সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস ও শিল্পী তাজুল ইমাম। আরো উল্লেখ্য, ড. নবী এর আগে একুশে পদক পেয়েছেন এবং তিনি মার্কিন মূলধারার রাজনীতির একজন হিসেবে নিউজার্সির প্লেইন্সবরো সিটির কাউন্সিল নির্বাচিত হয়ে পঞ্চম মেয়াদের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
নৈশভোজের মাধ্যমে তিন ঘন্টাব্যাপি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ে ছিলেন শব্দজন খালেদ সরফুদ্দীন, লেখক আবু সাঈদ রতন, কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি, কবি সৈয়দ মামুনুর রশীদ, কবি আহমেদ ছহুল, কবি মাসুম আহমদ প্রমুখ। বিশিষ্টজনদের মধ্যে আরো ছিলেন সমাজসেবক-সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্টপোষক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, অভিনেতা-চলচ্চিত্র নির্মাতা তৌকির আহমেদ, বিজ্ঞানী ড. জিনাত নবী, শহীদ সন্তান ফাহিম রেজা নূর, অঙ্কুর প্রকাশনীর মেজবাহউদ্দিন প্রমুখ।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar