মঙ্গলবার ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাইডেনকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ : জাতিসংঘে পদ্মা সেতু প্রদর্শনী

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট  

বাইডেনকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ : জাতিসংঘে পদ্মা সেতু প্রদর্শনী

জাতিসংঘ সদর দফতরে পদ্মা সেতুর প্রদর্শনীতে শেখ হাসিনা। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।

বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণের। দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে সেই চ্যালেঞ্জের সফল সমাপ্তি ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা। নিজস্ব অর্থে এতবড় একটি স্থাপনা নির্মাণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখন জাতিসংঘেও ধ্বনিত হচ্ছে।

মানবিকতার প্রশ্নে এ এক অনন্য প্রকল্প ছিল-যার সুফল পাবে বাংলাদেশ। ১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে শুরু হওয়া ৬ দিনের এই প্রদর্শনী ২১ সেপ্টেম্বর পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাথে ছিলেন জাতিসংঘের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও। এটি স্বাভাবিক কোন প্রদর্শনী নয়, বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে বাঁচতে জানে, তারই জ্বলন্ত সাক্ষী এই সেতু। প্রদর্শনীতে আগত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও অবাক বিস্ময়ে তা অবলোকন করছেন।

বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও তারা কৌতুহল প্রকাশ করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ যে অবিশ্বাস্য রকমের উন্নয়ন-সাধন করেছে শেখ হাসিনার বিচক্ষণতাপূর্ণ নেতৃত্ব গুণে-এই সেতুর মধ্য দিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়েও তা বিস্তৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি ৭৭তম অধিবেশনে ১৯৩ দেশের ৫০ হাজারেরও অধিক কূটনীতক-সমাজকর্মী-শিক্ষক-অভিনেতা-শিল্পী-সাহিত্যিকরা জড়ো হয়েছেন জাতিসংঘে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত ব্যক্তিরাও সরগরম বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে। তেমনি সরব পরিস্থিতির একটি হচ্ছে পদ্মা সেতুর প্রদর্শনী।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব কে এম সাখাওয়াত মুন গণমাধ্যমকে জানান, বুধবার বিকেলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের লেভেল-১ এর আঁকাবাঁকা দেয়ালে আয়োজিত প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময়ন জাতিসংঘের ইকোসক প্রেসিডেন্ট লাচেজারা স্টোভাসহ কয়েকজন বিদেশী অতিথি সেখানে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশি অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি, কারণ, এটি নির্মাণ করা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনে আমাদের দোষারোপ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়েছে যে কোনো দুর্নীতি হয়নি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এ সময় সেখানে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের
জন্য নিউইর্য়কে আসা রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণের সম্মানে প্রেসিডেন্ট ও তার পত্নী আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। রাতে হোটেল লোটে প্যালেসে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে, ছবি হয়েছে। দুই জনই, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বাইডেন, উনারা উনাকে (শেখ হাসিনা) সাদরে স্বাগত জানান। তারপরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেন।”

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সে ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। শুধু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে বাইডেনকে আমন্ত্রণ জানান। ব্যালেন্স কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশেষ এক অবস্থানে রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধজনিত পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে অনন্য অবস্থানে উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর ‘কারো সাথে বৈরিতা নয়-সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতিকে সমুন্নত রেখে শেখ হাসিনা বিশেষ কোন দেশের কাছে মাথানত করেননি। যুদ্ধের অসহায় ভিকটমিদের প্রতি সর্বাত্মত সহানুভূতি দেখিয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিরত হবার উদাত্ত আহবান জানিয়ে আসছে। তারই প্রকাশ ঘটলো ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের একটি অধিবেশনেও। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, এ যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত করেছে এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা ও এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের এই রক্তক্ষয়ী ও বিপর্যয়কর সংকটের অবসানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞা বিশ্বজুড়ে মানুষকে গভীরভাবে আঘাত করছে, বিশেষ করে সরাসরি সংঘাতের সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বিশ্বের মানুষকে বেশি আঘাত করছে।’

প্রধানমন্ত্রী জিসিআরজি (গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ) চ্যাম্পিয়নদের সাথে বুধবার মহাসচিব আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপনকালে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধের অব্যাহত ও প্রসারণশীল প্রভাব এবং যুগপৎ অন্যান্য সংকট আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে এটি উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং আমাদের কোভিড পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা ও এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত করেছে।

বিশ্বের নানা সঙ্কট থেকে উত্তরণের দিশা খুঁজতে ৩২ দেশের প্ল্যাটফর্ম জিসিআরজিতে ছয়টি দেশের রাষ্ট্রনেতা ‘চ্যাম্পিয়ন্স’ হিসেবে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বান বাস্তবায়নে কাজ করেন, তাদের একজন হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
ইউক্রেইন সঙ্কটের অবসানে জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এই রক্তপাত, বিপর্যয়কর পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। “নিষেধাজ্ঞা আর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা সারাবিশ্বের মানুষকে নিদারুণ আঘাত সইতে হচ্ছে। সংঘাতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত দেশগুলোর মানুষকেই শুধু ভুগতে হচ্ছে না, ভুগতে হচ্ছে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত বিশ্বের বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমাজ ও অর্থনীতিতে যে গভীর দাগ ফেলেছে, তা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। “এটি আমাদের কোভিড পুনদ্ধারের প্রচেষ্টা এবং এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করেছে।”
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তবু কোনো একক দেশ একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বৈশ্বিক সংহতি। আমি এ বিষয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট চিন্তা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।’

তাঁর প্রথম প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে বৈশ্বিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘জি-৭, জি-২০, ওইসিডি, আইএফআই ও এমডিবি’কে এখন তাৎক্ষণিক উদ্বেগগুলো মোকাবেলা করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এসডিজি অর্থায়নের অভাব, সীমিত আর্থিক সংস্থান, ক্রমহ্রাসমান ওডিএ এবং ঋণ পরিষেবা।’
তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত মহাসচিব ব্ল্যাকসি গ্রেইন উদ্যোগ গ্রহন করার ক্ষেত্রে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য আমরা আপনাকে সাধুবাদ জানাই। আমরা সংঘাতের সময় খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ক্ষতির হাত থেকে দূরে রাখার জন্য ভবিষ্যতের যে কোনো উদ্যোগকে সমর্থন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তৃতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সাহসী ও ব্যাপক পদক্ষেপের প্রয়োজন এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও রপ্তানি আয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী তার চতুর্থ প্রস্তাবে বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং কার্যকর খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে প্রযুক্তি সহায়তা, বর্ধিত ওডিএ এবং রেয়াতি অর্থায়নের লক্ষ্যে আমাদের আরও জি২জি ও বি২বি সহযোগিতার প্রয়োজন।’
পঞ্চমত, তিনি বলেন, জলবায়ু সহযোগিতার জন্য বৈশ্বিক কাঠামোকে আরও কার্যকর এবং ন্যায্য করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আসন্ন কপ-২৭ এর সুযোগটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর উদ্বেগ নিরসনে কাজে লাগানো উচিত। আমরা আমাদের অংশীদারদের সাথে কাজ করতে চাই যাতে সার্বিক উপায়ে জ্বালানি নিরাপত্তার সমস্যা মোকাবেলায় প্রয়েজনীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করা যায়।’
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে তার নিরন্তর প্রচেষ্টার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, তার প্রচেষ্টায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগির এ ব্যাপারে একটি পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছা যাবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা সে লক্ষ্যে আপনার প্রচেষ্টা জোরদার করতে আপনার নির্দেশনার ওপর আস্থা অব্যাহত রাখব।’
প্রধানমন্ত্রী সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘের ব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সামনে উত্থাপিত তিনটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্দেশনা প্রদান করে এবং আমরা এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সঠিক নীতি বিকল্পগুলো সামনে আনতে অন্য অংশীদারদের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছি।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিগুলো বহুগুণে স¤প্রসারিত করা হয়েছে। কৃষি, এমএসএমই এবং অন্যান্য দুর্বল খাতগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আমরা আমাদের জ্বালানি উৎসসমূহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছি।’ ২৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুরে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে বাংলাদেশের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। এটি হবে তার ১৯তম ভাষণ। সবকটি বাংলায় দিয়েছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে প্রবাসীদের সমাবেশে ভার্চুয়ালে ভাষণ দেবেন শেখ হাসিনা।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

nypratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর...

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

Editor : Naem Nizam

Executive Editor : Lovlu Ansar