
বিশেষ সংবাদদাতা | সোমবার, ১৩ জুন ২০২২ | প্রিন্ট | ৩০৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

নিউইয়র্কে ১২ জুন সন্ধ্যায় এক আলোচনা সভায় বক্তব্যকালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জনগণকে সংগঠিত করাটা খুবই জরুরি। দিন শেষে সেটি সুফল বয়ে আনে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ আগে যেমন একটি অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতো, অনেক দিন কিন্তু আমরা শহরে মিছিলেরই আওয়াজ শুনি না। এই মিছিলটা, প্রতিবাদের ভাষাটা আস্তে আস্তে দমন করে ফেলা হয়েছে। মিছিল যে হারিয়ে গেছে তা নয়, দমন করে ফেলা হয়েছে। খুবই বুদ্ধিমত্তার সাথে এটাকে আস্তে আস্তে দমন করা হয়েছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘তবে দমন নীতি যতোই সংগঠিত হউক না কেন মানুষের মনে তো নিজের দেশ নিয়ে একটা এ্যাস্টিমেশন থাকে। থাকে বলেই এত হাজার মাইল দূর থেকে বেনের ব্যানারে আপনারা চিন্তুা করছেন দেশের জন্যে কিছু করার।’
‘আমার মত ইংরেজি জানা একজন আইনজীবীর ফি গরিব বাঙালিরা দিতে পারবেন না। এজন্য আমি বিদেশিদের টাকায় আইনগত লড়াই চালাচ্ছি’ উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা উল্লেখ করেন, ‘আমার কাছে টাকা কোথা থেকে এলো সেটি জরুরী কথা নয়। জন্ম হউক যথা তথা, কর্ম হউক ভালো। আমি কিন্তু বিদেশী দাতা সংস্থার টাকায় চলি। কেউ যদি আমাকে বলতে পারে যে তোমার স্বাধীন কণ্ঠ রুদ্ধ করতে দেখেছি কেউ সফল হয়েছে, আমি মনে করি যে সে বাজিতে সে হেরে যাবে। আমার টাকাটা যেখান থেকেই আসুক না কেন, আমি কতটা ভালো কাজে ব্যবহার করলাম সেটা হচ্ছে খুবই জরুরি। আমি টাকা নিচ্ছি যা ১৬ কোটি মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে যায়-সেটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
আন্তর্জাতিক সূচকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের অবতারণা করে সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২। ৩ বছর আগে ১৭৯ ছিল। হঠাৎ করে রাতারাতি ১৬২ হয়ে গেল? ওরা যে টিক মারে না সেখানেই হয়তো একটা মারপ্যাচ আছে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে দুষিত বাতাসে দিনাতিপাত করছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, যখন একটা পরিসংখ্যান বলে যে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৫ থেকে ৭ বছর কমে যাচ্ছে বায়ু দূষণের কারণে। সে সময় আমাকে বুঝতে হবে যে, আমার বাচ্চার জীবন, আমার মায়ের জীবন কমে যাচ্ছে। আপনি ৭ দিন টাকা ছাড়া থাকতে
পারবেন কিন্তু এক মুহূর্ত কি বাতাস ছাড়া থাকতে পারবেন?’
সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, ‘আইনের শাসনের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫। খুব সম্ভবত ১৩৬ দেশের মধ্যে ১১৫; ওয়ার্ল্ড জাস্টিসের প্যারামিটারেও বাংলাদেশের অবস্থা ভালো না। এটা যে ভালো না তা আমরা জানি। তা কাউকে গবেষণা করে বলতে হবে না। ঢাকা হচ্ছে অবসবাসযোগ্য নগরী-এটা কী বিদেশিদের গবেষণায় জানতে হবে? আমি তো ঢাকা শহরেই থাকি, আমি তো জানি যে এটা বসবাসের যোগ্য নয়। তাই আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো অনেক গভীরে। একটা দেশের সবকিছু ঠিকমত চলে, শুধু পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারটি ঠিকমত চলে না। আমরা একটা উপসর্গ নিয়ে কাজ করছি। সেটি যারা সৃষ্টি করেছে তার মূলে হচ্ছে আমাদের নেতিবাচক রাজনীতি। যে রাজনীতিতে জবাবদিহিতা নেই, জনগণের অংশগ্রহণ নেই এবং যে রাজনীতিতে জনগণের সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বও নেই। আপনি যদি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইস্তেহার দেখেন মনে হবে যে, তা আমরা লিখে দিয়েছি। এত সুন্দর ইলেকশন মেনিফেস্টো। দেশ কিন্তু সে লাইনে আসলে যায় না। এহেন অবস্থায় ক্রমাগতভাবে মানুষের বিবেক জাগিয়ে রাখা হচ্ছে আমাদের কাজ।’
‘বাংলাদেশের পরিবেশ : সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনা সমাবেশে বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অন্যতম আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক’ তথা বেনের এ আলোচনার সূচনা করেন ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেশাজীবী প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠিত ‘বেন’র কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনার পাশাপাশি তা সমস্যার সমাধানে পথ বাতলে দেয়ার ক্ষেত্রে এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সমস্যার গভীরতা নীতি-নির্ধারকদের টেবিলে উপস্থাপনেও বেন সিদ্ধহস্ত। বেনের মাধ্যমে মার্কিন মুল্লুকে বসবাসরত প্রবাসীরাই শুধু বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সরব নেই, একইসাথে আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টিতেও তারা প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন। আমি বেনের নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আরো বক্তব্য দেন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, বেনের নিউইয়র্ক-নিউজার্সি এবং কানেকটিকাট শাখার উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। বেনের প্রতিষ্ঠাতা জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা টিমের লিডার ড. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ আলোচনার প্রেক্ষাপট উপস্থাপনকালে বেন প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরের কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করেন সংস্থাটির বৈশ্বিক সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান।
পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ট্রাই স্টেট (নিউইয়র্ক-নিউজার্সি এবং কানেকটিকাট) বেনের সমন্বয়কারী রানা ফেরদৌস চৌধুরী। শুরুতে অতিথি বক্তাগণকে এবং নতুন তিন সমন্বয়কারীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। গত বছর ১২ জুন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন বেনের সমন্বয়কারী মোহাম্মদ হারুন। তার স্মৃতি তুলে ধরেন বেনের কর্মকর্তা সুব্রত বিশ্বাস।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে রবার্ট এফ জুনিয়র প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়াটারকিপার্স এলায়েন্স’র ৫ দিনব্যাপী ( ৮-১২ জুন) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের জন্যে রিজওয়ানা হাসান, বাপার সেক্রেটারি শরীফ জামিল, বাপার হবিগঞ্জ শাখার সেক্রেটারি তোফাজ্জল হোসেন এবং সিলেটের সেক্রেটারি আব্দুল করিম কিম যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এসেছিলেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)’র এই অনুষ্ঠানে বক্তব্যের কয়েক ঘন্টা পরই সোমবার ঢাকার উদ্দেশ্যে জেএফকে ত্যাগ করেন তারা।



