
বিশেষ সংবাদদাতা | বুধবার, ০৫ জুলাই ২০২৩ | প্রিন্ট | ২৪৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

তসলিমা নাসরিন। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
নিউজার্সি স্টেটের আটলান্টিক সিটিতে দুই জুলাই রবিবার সমাপ্ত তিন দিনের ৪৩তম বঙ্গ সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ১ জুলাই শনিবার ও ২ জুলাই রবিবার দু’দিনের অনুষ্ঠানেই তিনি কবিতা পাঠ করেছেন, শ্রোতা ও ভক্তকূলের সাথে মতবিনিময় করেছেন, বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।
তসলিমা নাসরিনের কবিতা পাঠের সময় তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রেমের সুখানুভূতি, বিরহের জ্বালা,নির্বাসিত জীবনের মর্মবেদনা। তাঁর পঠিত কবিতায় যখন তিনি উচ্চারণ করেন, “এমনই অপরাধী, মানবতার এমনই শত্রু আমি, এমনই কি দেশদ্রোহী যে, দেশ বলে কিছু থাকতে নেই আমার.’’, তখন হল ভর্তি শ্রোতাদের অনেককেই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা যায়, যারা সুদূর প্রবাসে থেকে একজন নির্বাসিত কবির মর্মবেদনা উপলব্ধি করার জন্য হলরুমে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। কবিতা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উওর দেন। প্রাসঙ্গিক ক্রমে দ বলেন, লেখার জন্য কেন দেশ ছাড়তে হলো তা তিনি জানেন না। তিনি তসলিমা বলেন যে, বাংলাদেশে ফেরার অধিকার আদায়ের জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছাড়া পশ্চিম বাংলায়ও আমার ঠাঁই হয়নি।’ পরবর্তীতে মতবিনিময়কালে শ্রোতার সাঁড়িতে উপবিষ্ট লেখক-সাংবাদিক (বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিউজার্সি প্রতিনিধি) সুব্রত চৌধুরী এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলেন, ‘যদি দুই বাংলা আপনাকে স্থান না দেয়, তাহলে আমরা অভিবাসী বাঙালিরা আপনাকে স্থান দেবো। কারণ আপনার অবস্থান যে আমাদের মনের মণিকোঠায়।’ তখন হল ভর্তি শ্রোতাকূলের করতালিতে পুরো হলঘর গম গম করে ওঠে।
বঙ্গ সম্মেলনের তিনদিনই তসলিমা নাসরিন তাঁর অগনিত পাঠক, ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। ভক্তদের ভালোবাসার প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, “যখন আমার পায়ে শেকল, পদে পদে প্রতিবন্ধকতা, যখন বারবার কট্টরপন্থীদের ঘৃণার সামনে পড়ছি, মৃত্যুকে দাঁতকপাটি মেলে হাসতে দেখছি, তখন সম্মেলনে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্নেহে সিক্ত হয়েছি প্রতিদিন। এ কম পাওয়া নয়।”
এদিকে, আটলান্টিক সিটি থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি জানান, চরম অব্যবস্থাপনা ও বিশৃংখলার মধ্যদিয়ে ২ জুলাই রোববার মধ্যরাতে সমাপ্ত হয় ‘৪৩তম নর্থ আমেরিকান বেঙ্গলি কনফারেন্স ‘ যা ‘বঙ্গ সম্মেলন’ নামে সমধিক পরিচিত। ৩০ জুন শুক্রবার জিম হুইলান বোর্ডওয়াক হলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এই ক্যাসিনো সিটি থেকে এগারো মাইল দূরে ওশান ভিউ হোটেলে স্বল্পপরিসরে আয়োজিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান । বঙ্গ সম্মেলনের বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে ছিল সেমিনার, যাত্রাপালা, রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত, আধুনিক গান, নৃত্যানুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ব্যান্ড সংগীত, শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন পরিবেশনা সহ হরেক রকমের আয়োজন।
বঙ্গ সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী বাঙালিরা ঘুরে ঘুরে নিজেদের পছন্দ মতো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। কিন্তু সূচীর সাথে অনুষ্ঠানের মিল না থাকায় অনেকেই পছন্দের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জিম হুইলান বোর্ডওয়াক হলের বিশাল চত্বর জুড়ে হরেক রকমের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিল দেশের ও প্রবাসের স্বনামধন্য ব্যবসায়ীরা। এসবের মাঝে বই বিপনী প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্কের ‘মুক্তধারা’র স্টলও ছিল।
বঙ্গ সম্মেলনে ঘুংঘুর, বাংলাদেশ একাডেমী অফ ফাইন আর্টস সহ কয়েকটি সংগঠনের কয়েক ডজন প্রবাসী বাংলাদেশীর উপস্থিতি ছিল। তবে তারা সকলেই হতাশ হয়েছেন ৩৩ বছরের পুরনো এই সম্মেলনের আয়োজকদের অব্যবস্থাপনায়। এমনি অবস্থায়ও দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী ও নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন ছিলেন সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ।
সম্মেলনে পদ্মভূষণ অজয় চক্রবর্তী, পন্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার, পন্ডিত আনিন্দ চ্যাটার্জি, কবি সুবোধ সরকার, কন্ঠশিল্পী সোনু নিগম, জাভেদ আলী , বাংলা ব্যান্ড ক্যাকটাস, দুলাল লাহিড়ী, সুমিত্রা মিত্র, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তি ও সংগঠন অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহন করেন।
সম্মেলনের রেজিস্ট্রেশন, আবাসিক ব্যবস্থাপনা, অনুষ্ঠানসূচি, উপহার সামগ্রী বিতরণ সহ সর্বত্রই ছিল চরম অপেশাদারিত্ব। সম্মেলনে আগতদের মধ্যে নগদ অর্থের বিনিময়ে পরিবেশিত খাবারের মান নিয়ে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
একদিনের জন্য মূল মিলনায়তন বাতিল হওয়ায় বহু অনুষ্ঠান বাদ দিতে হয়েছে। আমন্ত্রণ পেয়েও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মঞ্চে অনুষ্ঠান করতে পারেননি। সম্মেলনে পুলিশের হস্তক্ষেপও দেখা গেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য।
এবারের মেলায় হোটেল নিয়েও আয়োজকরা চরম মিথ্যাচারিতা করেছেন। হলিডে ইন’র ৪২ হাজার ডলারের চেক বাউন্স হওয়ায় ৩০ জুন রাতেই পুলিশ ডাকে হোটেল কর্তৃপক্ষ। পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে। পরে ঐ ৪২ হাজার ডলার পরিশোধ করে কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। আগাম খাবারের কূপন বিক্রি করা হয়েছিল অনলাইনে। অনেকেই অনলাইনে খাবারের মূল্য আগ্রিম পরিশোধ করেও খাবার পাননি। শনিবার দুপুরে যে সস্তা খাবার দেয়া হয়, সেটাই পরিবেশন করা হয় রাতের ডিনারেও। বাসি খাবার খেয়ে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শনিবার রাতে একটি হলে যখন পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গান চলছিল, তখনই ২০/২৫ জনের উঠতি যুবক এসে মঞ্চে জোর জরবদস্তি ও অশোভন ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। অজয় চক্রবর্তী পরিবেশনা বন্ধ করে দেন। এই সময় কয়েকজন দর্শক ঐ হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে তারা মারমুখি হয়ে বলে, সেখানে তাদের শিশুদের অনুষ্ঠান হওয়ার সূচি দেয়া হয়েছিল। হট্টগোলের কয়েকমিনিটের মাঝেই আটলান্টিক সিটি পুলিশের বিশেষ ট্রুপস ওদের ঘিরে ফেলে। তাদের গান পয়েন্টে নিয়ে যায়। যা একটি সম্মেলনের জন্য ছিল খুবই লজ্জাজনক।



