
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪ | প্রিন্ট | ১১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

নিউইয়র্কে কলম্বিয়া ভার্সিটি মাঠে তাঁবু গেড়ে শিক্ষার্থীদের লাগাতার কর্মসূচি। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
গাজায় যুদ্ধ বিরতি এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবিতে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে শুরু ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা আমেরিকায়। এমনকি তা বিস্তৃত হয়েছে কায়রো, প্যারিস এবং অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাঙ্গনেও। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিক্ষোভ দমনের নানা কৌশল অবলম্বন করেও সুফল পাচ্ছে না। অধিকন্তু ক্রমান্বয়ে তা দাবানলের মতো বিস্তৃত হয়েছে বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ। বিক্ষোভে ঘি ঢেলে দেয়ার মত বক্তব্য/মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন।
তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য বলে অভিহিত করে অবিলম্বে তাকে পদত্যাগের দাবি জানান। এক পর্যায়ে বুধবার অপরাহ্নে কলম্বিয়া ভার্সিটি প্রাঙ্গনে গণমাধ্যমে কথা বলার সময় পরিস্থিতি সামলাতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আহবান উচ্চারণ করেন। এমনকি তিনি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের কথাও বলেছেন বিক্ষোভ দমনে। এরফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতার সংলাপকে নাকচ করে দিয়ে লাগাতার বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে তারা স্লোগান দিচ্ছেন। শিক্ষাঙ্গণের প্রাঙ্গনে তাঁবু গেড়ে চলছে অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ ঠেকাতে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল/স্থগিতের পর অবাসিক হল ত্যাগের নোটিশ জারি করা হয়। আরো শতাধিক বিক্ষোভকারিকে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। এ সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফ্লোরিডা হয়ে ওয়াশিংটন ডিসি-টেক্সাস, শিকাগো-জর্জিয়া-ভার্জিনিয়া-পেনসিলভেনিয়া-নিউজার্সি-রোড আইল্যান্ড-হার্ভার্ড-ইয়েলসহ শতাধিক ভার্সিটির ক্যাম্পাসে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
সর্বত্র মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু কোথাও তা দমাতে সক্ষম হচ্ছে না আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী। সর্বত্র একই স্লোগান, ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধ করো, ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতায় সহযোগিতা করো। অসহায় নারী-শিশু হত্যা বন্ধ করো। ইসরায়েলকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা বন্ধ করো। ইত্যাদি। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে তাঁবু টানিয়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান ধর্মঘট করেছেন। একইভাবে টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন স্থানে তাঁবু গাড়ার চেষ্টা নস্যাৎ করতে পুলিশী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিউইয়র্কে কলম্বিয়া, বস্টনে হার্ভার্ড, কানেকটিকাটে ইয়েল এবং রোড আইল্যান্ডে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির লাগাতার বিক্ষোভে ইহুদি শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন। গাজায় নির্বিচার গণহত্যা বন্ধ এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি তারাও জানাচ্ছেন। এভাবেই গাজায় যুদ্ধ বিরতির দাবি এখন সর্বজনীন একটি দাবিতে পরিণত হলেও রিপাবলিকান পার্টির গুটিকতক রাজনীতিকের সাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেন সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে ইসরায়েলিদের থামাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন। অধিকন্তু গোপনে ও প্রকাশ্যে নগদ অর্থ ও অস্ত্র দেয়া হচ্ছে ইসরায়েলিদের-এমন অভিযোগও উঠেছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভে দাবি জানানো হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে ব্যবসায়িক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার। যুদ্ধ বিরতির দাবিতে বুধবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, কায়রো এবং প্যারিসেও শিক্ষার্থীরাও তুমুল বিক্ষোভ করেছেন এবং তারা কলম্বিয়ার সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। বুধবার সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে টেক্সাসে। অস্টিনে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে’র শত-সহস্রশিক্ষার্থী গাজায় ইসরায়েলিদের গণহত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এপরিস্থিতি সামাল দিতে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেও কোন লাভ হয়নি। গ্রেফতার করা হয় কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে।
একই অবস্থা ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতেও ঘটেছে। বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করেও থামানো সম্ভভ হয়নি বিক্ষোভ। তারাও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ৭ অক্টোবর হামাস বাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র ইসরায়েলিদের কনসার্টে হামলা এবং কয়েকশত তরুণ-তরুণীকে হত্যার পর কয়েক শতজনকে অপহরণের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলী বাহিনী গাজায় নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ হাজারের অধিক শিশু-নারী ও নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং ৭০ হাজারের অধিক মানুষকে আহত করেছে। গাজায় আটকে পড়া ফিলিস্তিনিরা নিদারুণ খাদ্য সংকট ও চিকিৎসা সংকটে পড়া সত্বেও ইসরায়েলিরা জাতিসংঘ সংস্থাকে ত্রাণ তৎপরতা অবাধে চালাতে দিচ্ছে না। মানবিক সংকটের কথা উচ্চারিত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মুখেও। কিন্তু ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিানদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিতে রাজি হচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিতে হতবাক হয়েই কলম্বিয়াসহ শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। উত্তাল বিক্ষোভের ঢেউ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে-সেটি দেখার পালা বিবেকসম্পন্ন মানুষের।
‘দাবি না মানা পর্যন্ত’ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গাজার পক্ষে বিক্ষোভ চলবে বলে বুধবার রাতে ঘোষণা দেয়া হলো। ক্যাম্পাস জুড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ছে এবং বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যাচ্ছে। নানা স্লোগানের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘প্রকৃত আমেরিকানরা গাজার পাশে আছে’। গাজা যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গণ গ্রেপ্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শৃঙ্খলা ভঙের কারণে ব্যবস্থা গ্রহণের পরও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহ থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাজা যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সেখান থেকে শতাধিক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়াও, গত কয়েক দিনে ইয়েল এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙের দায়ে ছাত্রত্ব স্থগিত বা বাতিল করার ভয়ও দেখানো হয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইহুদি শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তবে কিছু শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে ইহুদিবিদ্বেষী আচরণ ও হেনেস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মধ্যরাতের মধ্যে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় বেঁধে দিয়েছিল। যে সময় আরও ৪৮ ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টাও করছে।
কলম্বিয়া প্রেসিডেন্ট ড. নেমাত শফিক এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি কোনো চুক্তি না হয় তবে তিনি ক্যাম্পাস খালি করতে ‘বিকল্প ব্যবস্থার’ কথা ভাববেন। মঙ্গলবার বিকালেও কলম্বিয়া ক্যাম্পাস শান্ত ছিল। যদিও শতাধিক বিক্ষোভকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান করছিল।



