
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র | বুধবার, ০৩ জুলাই ২০২৪ | প্রিন্ট | ১৮৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চতুর্থ মেয়াদের জন্যে নির্বাচনে অবতীর্ণ জর্জিয়া স্টেটের ফিফথ সিনেট ডিস্ট্রিক্টের সিনেটর (ডেমক্র্যাট) শেখ রহমান আমেরিকান স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রায় নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলেন ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র গ্র্যাজুয়েশন সিরিমনিতে। ২৯ জুন ভার্জিনিয়া স্টেটের আলেক্সান্দ্রিয়ার একটি মিলনায়তনে তথ্য-প্রযুক্তি এবং ব্যবসা-প্রশাসনে গ্র্যাজুয়েট হওয়া শিক্ষার্থীদের সমাবেশের পর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সিনেটর শেখ রহমান আরো জানান, আত্মবিশ্বাসই বহুজাতিক সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অপরিসীম ভূমিকা রাখে। আমি ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। তখোন আমি কলেজে নবীন ছাত্র ছিলাম। সে সময় আমি সেন্ট্রাল পিডমন্ট কম্যুনিটি কলেজ থেকে ড্রপআউট হয়েছিলাম। ফাইন্যালি ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালে আমি ‘ব্যাচেলর অব বিজনেস’ এবং ‘গ্লোবাল স্টাডিজ’ বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশনে সক্ষম হই ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া থেকে। এই দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় আমাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার এবং কঠোর অধ্যাবসায় করতে হয়েছে। আমি যখোন কলেজে প্রথম বর্ষে ছাত্র ছিলাম, সে সময় খরচ নির্বাহের জন্যে রেস্টুরেন্টে ডিশ ওয়াশারের জব নিতে হয়েছে। মজুরি ছিল ঘন্টায় ৩.৩৫ ডলার করে। এবং কাজের মধ্যদিয়ে আমি ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার পর্যন্ত হয়েছিলাম। কত কথা শুনতে হয়েছে। ইংরেজী ঠিকমত বলতে পারি না। উচ্চারণেও ক্রুটি ধরেছেন সুপারভাইজাররা। তবুও আমি থেমে থাকিনি। নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছি। কারণ লক্ষ্য ছিল উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথ সুগম করার।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সন্তান এবং জর্জিয়া স্টেট সিনেটে প্রথম মুসলমান সিনেটর শেখ রহমান বলেন, আমেরিকায় বাংলাদেশীর মালিকানা এবং পরিচালনাধীন প্রথম ও এখোন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে গর্বিত মনে করি। কারণ, বহুজাতিক সমাজে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্যে কী যে কষ্ট তা আমি ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারি। আশা করছি ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিফের এই প্রতিষ্ঠানটি সময়ের পরিক্রমায় অন্যতম একটি সেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সিনেটর শেখ রহমান বলেন, অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশ থেকেও বহু শিক্ষার্থী এখানে এসেছেন-এটি আমাকে অভিভ’ত ও আনন্দিত করছে। আমি এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি এবং একইসাথে যারা গ্র্যাজুয়েট হলেন তাদেরও সুন্দর ভবিষ্যত কামনা করছি।
চলমান মার্কিন রাজনীতি আলোকে সিনেটর শেখ রহমান বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বয়স নিয়ে যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, ডেমক্র্যাট শিবিরের মধ্যেও কোন কোন পর্যায়ে একই আলোচনা শুনছি। এসব অবশ্যই আত্মঘাতির সামিল। ডেমক্র্যাটিক পার্টিতে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু মানুষ অপর পক্ষকে ফায়দা দিতে হয়তো এহেন মতামত দিচ্ছেন। তবে কোনকিছুই বাইডেনকে থামিয়ে দিতে পারবে না। এটা সম্ভবও নয়। বাইডেনই হচ্ছেন আমাদের প্রার্থী এবং তাকে পুনরায় বিজয়ী করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সামনের মাসে শিকাগো সম্মেলনে সে আওয়াজই সমস্বরে উঠবে। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, আসছে ৫ নভেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের সাথেই জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে রিপাবলিকান পার্টি থেকে শেখ রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন লিসা ব্যাবেজ। আরো উল্লেখ্য, এলাকাটি ডেমক্র্যাট হওয়ায় শেখ রহমানের বিজয় ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না যদি শেষ পর্যন্ত ডেমক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধ থাকেন এবং নির্বাচনী তহবিলে যদি সংকট না ঘটে। এজন্যে শেখ রহমানের সমর্থকদেরকে সজাগ থাকতে হবে।
সমাবর্তনে বিশেষ সম্মানীত অতিথির বক্তব্য শেষে মিলনায়তনের আঙ্গিনায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে ভার্জিনিয়ার স্টেট সিনেটর সেলিম সাদ্দাম জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৬ মাসে আমি ২১টি বিল উত্থাপন করেছি। এরমধ্যে ১৪টি ফ্লোরে উঠার পর ৭টি পাশ হয়েছে ইতিমধ্যেই। পাস হওয়া বিলের মধ্যে রয়েছে হাউজিং, শিক্ষা, মেট্রপলিটন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত কারণে বিদ্বেষমূলক হামলা বন্ধের বিধি। সিনেটর সেলিম সাদ্দাম বলেন, অনেকে ছোটখাটো অপরাধের মামলাতেও দোষ স্বীকার করেন। অথচ তারা জানেন না যে, ৩৬৫ দিনের বেশী সাজা ভোগ করলে পরবর্তী সেই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ পাবেন না। অর্থাৎ তার গ্রীণকার্ড বাতিল করে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া, অনেকেই ৫ বছর অপেক্ষা করেও সিটিজেনশিপের আবেদনে সক্ষম হোন না। এমন একটি অমানবিক বিধি রহিত করার বিলটি সিনেটে পাশ হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই হাউজেও পাশ হবে। এরফলে বিরাটসংখ্যক অভিবাসী বড় ধরনের সংশয় থেকে রক্ষা পাবেন। নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণকারী এবং ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় বেড়ে উঠা সেলিম সাদ্দাম আরো বললেন, ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত কাগজপত্রহীন (ওয়ার্ক পারমিটধারী) অভিবাসীরা ড্রাইভিং লাইসেন্স পান, তবে তা দু’বছর অন্তর নবায়ন করতে হয়। এরফলে কঠোর পরিশ্রমী এসব স্বল্প আয়ের মানুষকে নানাবিধ পরিস্থিতির ভিকটিম হতে হচ্ছে। আমি শীঘ্রই আরেকটি বিল উত্থাপনের চেষ্টা করছি, যেখানে নবায়নের সীমা দু’বছর থেকে বাড়িয়ে ৪ বছর অথবা ৫ বছর থাকবে। সিনেটর সাদ্দাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে অনেকে পারবারিক ভিসায় আসছে যারা স্কুল-কলেজের ছাত্র ছিলেন। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পরিচিত থাকেন না। সে সব শিক্ষার্থীর জন্যে বাংলাদেশী মালিকানাধীন এই ভার্সিটির ভূমিকা অপরিসীম। তারা নিজের ভাষায় সমস্ত দিক-নির্দেশনা জানতে সক্ষম হচ্ছেন। সিনেটর সাদ্দাম আরো উল্লেখ করেন, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে যারা আসছেন তারাও চার বছরের কোর্স নিতে সক্ষম হচ্ছেন স্টাইপ্যান্ডের মাধ্যমে।
শুধু আমার দেশের শিক্ষার্থীই নন, অন্য অনেক দেশের শিক্ষার্থীরাও পাচ্ছেন বৃত্তির সুবিধা। ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কল্যাণমূলক একটি প্রকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবো ভার্জিনিয়া স্টেট প্রশাসন থেকে। সিনেটর সাদ্দাম উল্লেখ করেন, সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে আমার দেশের অনেক তরুণ-তরুণী উচ্চ শিক্ষালাভে সক্ষম না হওয়ায় স্বল্প মজুরির কঠোর শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছেন জীবন-জীবিকার তাগিদে। অথচ তারা খন্ডকালিন কাজ করেও এই ভার্সিটিতে উচ্চ শিক্ষা লাভে সক্ষম হচ্ছেন। ইতিমধ্যেই অনেকে ফেডারেল, স্টেট ও সিটি প্রশাসন ছাড়াও আইটি সেক্টরে উচ্চ বেতনে জব পেয়েছেন। ভাগ্য গড়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির দিগন্ত প্রসারি এই সহযোগিতা অনাদিকাল ধরে চলবে বলে আশা করছি।



