
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ | প্রিন্ট | ৮৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সৈয়দ ফয়সাল হত্যায় জড়িত পুলিশের নাম প্রকাশ এবং বিচার দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ। ছবি-বাংলাদেশ প্রতিদিন।
‘জাস্টিস ফর ফয়সল’, ‘জাস্টিস ফর টাইরে’, ‘জাস্টিস ফর এ্যাভরিওয়ান কিল্ড বাই দ্য পুলিশ’ ইত্যাদি স্লোগানে সোচ্চার ছিলেন বস্টনের লোকজন। টাইরের ঘাতক পুলিশদেরকে চিহ্নিত, বরখাস্ত এবং মামলা দায়ের করা হলেও ফয়সালের ঘাতকদের চিহ্নিত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণের অভিযোগে ২৯ জানুয়ারি অপরাহ্নে বস্টন সিটির পৃথক দুটি স্থানে শতশত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কম্যুনিটির লোকজন বিক্ষোভ করেছেন।
গণসঙ্গীতের মাধ্যমে ঘাতক পুলিশদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পুলিশি আইন সংস্কারের দাবি উচ্চারিত হয় এ সময়। উল্লেখ্য, ৪ জানুয়ারি ভরদুপুরে বস্টনের ক্যাম্ব্রিজ সিটিতে গুলি করে হত্যা করা হয় বাংলাদেশি আমেরিকান এবং ইউ ম্যাসের বস্টন ক্যম্পাসের ছাত্র সৈয়দ ফয়সাল (২০)। ৫ রাউন্ড গুলিতে হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, ফয়সালের হাতে নাকি ধারালো অস্ত্র ছিল এবং তা নিয়ে পুলিশের প্রতি তেড়ে আসছিলেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু পুলিশের এমন দাবিকে মানতে রাজি নন ফয়সালের স্বজন এবং তার সহপাঠিরা। এরপর ক্ষোভে ফেটে পড়া কম্যুনিটি এবং শিক্ষার্থীগণকে আশ্বাস দিয়ে ক্যাম্ব্রিজ সিটির মেয়র (পাকিস্তানি-আমেরিকান) সাম্বুল সিদ্দিকী বলেছেন, সরেজমিনে তদন্ত হচ্ছে। শিগগির প্রকৃত তথ্য জানা যাবে। মেয়রের এমন আশ্বাসের পর অতিবাহিত হলো ২৪ দিন। তদন্তের কোন অগ্রগতি নেই।
এমনকি বিভিন্নভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালাানো হচ্ছে যে, যে এলাকায় পুলিশ ধাওয়া করেছিল ফয়সালকে এবং যেখানে তাকে গুলি করে ভ’পাতিত করা হয়-তার আশপাশে নাকি কোন সিসিটিভি নেই। অর্থাৎ বস্টনের ক্যাম্ব্রিজ এলাকাটি অরুক্ষত নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে। শ্বেতাঙ্গ ডজনখানেক পুলিশের একটি টিমের সামনে ছুরি নিয়ে চড়াও হওয়ার ঘটনাটি কতটা যুক্তিগ্রাহ্য-তা নিয়েও প্রশ্নের অবতারণা করেছেন বিক্ষোভকারিরা। এভাবে কী ফয়সালের ঘাতকেরা পাড় পেয়ে যাবেন? মা-বাবার একমাত্র সন্তান ফয়সাল পড়তেন কম্প্যুটার সায়েন্সে। হাই স্কুলে পড়াবস্থায় ফয়সাল মানব-সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন। আর্টিস্ট হিসেবেও নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন। এমন একজন কোমলমতি মেধাবি তরুণ কর্তৃক পুলিশের প্রতি ধেয়ে যাবার অভিযোগকে আমলে নিচ্ছেন না কেউই। বিক্ষোভে অংশগ্রগণকারি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব নিউ ইংল্যান্ডের সভাপতি পারভিন চৌধুরী বলেন, আমরা যখন ৯১১ এ কল করি, তখোন পুলিশের বুলেট আশা করি না। সহায়তা চাই নিরাপত্তার জন্যে। কেনেডি নামক একজন বলেন, পুলিশের মধ্যে যারা উগ্রপন্থি তাদেরকে নিরস্ত্র দেখতে চাই, বিচারের কাঠগড়ায় নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। ফয়সালের শৈশবের সহপাঠি সারাহ হালাওয়া বলেন, ফয়সাল তরুণ-তরুণীদের কর্মক্ষম করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন হাই স্কুলে পড়াবস্থায়।
আর্ট প্রকল্পেও অংশ নেন। কম্যুনিটির প্রায় ইভেন্টেই অনুবাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফয়সাল ছিলেন সমারভিলে কম্যুনিটির সুপরিচিত একজন সদস্য। তিনি কম্যুনিটির অসহায় মানুষের পাশে থাকতেন সব সময়। তার মত একজন মানুষকে গুলি করে হত্যাকে আমরা কখনোই মেনে নেব না। অনেক হয়েছে। পুলিশকে এবার ঢেলে সাজাতে হবে। এ বিক্ষোভে ফয়সালের সাথে টাইরে নিকলসের পোস্টারও দেখা গেছে। পুলিশি বর্বরতার নিন্দা এবং ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সকলেই রাজপথে থাকার অঙ্গিকার করেন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র ম্যাসিয়েল টরেস ক্ষুব্ধচিত্তে বলেন, আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি যেটি নজরদারিতে রয়েছে এবং যে কোন সময় খুন হবার আশংকায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। পুলিশী নির্যাতনের ঘটনা হরদম ঘটছে এবং অসহায় নাগরিকেরা কোন বিচার পাচ্ছে না। টরেস (২৮) উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা, মুক্তি এবং সমাজকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে পুলিশ-প্রশাসনকে মানবিকতায় পরিপূর্ণ থাকতে হবে। সেটি হচ্ছে আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ ঘটছে তার বিপরীত। যারা আমাদের নিরাপত্তা দেবেন, তারাই ঘাতকের আসনে অধিষ্ঠিত। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসেচুসেটস’র বস্টন ক্যাম্পাসের অধ্যাপক কীইথ জোন্স (৪৯) এসেছিলেন তার ৭ ও ৯ বছর বয়সী দুই সন্তানসহ। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে এই কম্যুনিটির শান্তি-সম্প্রীতির প্রশ্নে চলমান আন্দোলনের সাথে একাত্মতা দেখাতে এনেছি। ওরা বড় হয়ে যাতে নিজের অধিকার-মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার থাকে। অধ্যাপক কীইথ উল্লেখ করেন, আর সহ্য হচ্ছে না। অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছি পুলিশের আচরণে। এহেন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র জনগোষ্ঠিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বস্টনের ওয়েস্টফোর্ড একাডেমিতে স্প্যানিশ এবং সাহিত্যের শিক্ষক হোযে আলেমন (৫৯) বলেন, গুলি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। এজন্যে দরকার সম্প্রীতির বন্ধন সংহত করা।
ক্যাম্ব্রিজ পুলিশ স্টেশনের বাইরেও জড়ো হয়েছিলেন শতশত মানুষ। তারা সমস্বরে স্লোগান ধরেন জাস্টিস ফর ফয়সাল, জাস্টিস ফর টাইরে। পুলিশের গুলিতে নিহত সকলের পক্ষ থেকে ন্যায় বিচারের দাবি জানান তারা। উল্লেখ্য, সৈয়দ ফয়সালকে হত্যায় জড়িতদের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে কয়েকজনকে জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সিটি মেয়রের মত সিটি কাউন্সিলও এ নিয়ে কয়েক দফা শুনানীতে মিলিত হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে ক্ষোভের মাত্রা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।



